ঢাকা মেইল ডেস্ক
১৫ মে ২০২৬, ০৬:২৪ পিএম
সাম্প্রতিককালে বিভিন্ন দল থেকে অনেককেই যুক্ত হতে দেখা যাচ্ছে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান থেকে গড়ে ওঠা দল জাতীয় নাগরিক পাটি-এনসিপিতে। কেউ এসেছেন বিএনপি থেকে, কেউ জাতীয় পার্টি, আবার জামায়াত ঘরানার সংগঠন থেকেও কেউ কেউ ঘটা করে যোগ দিয়েছেন এনসিপিতে। গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে ঢাকা তো বটেই, ঢাকার বাইরেও রীতিমতো আয়োজন করে এসব 'যোগদান অনুষ্ঠান' করেছে এনসিপি। এরমাধ্যমে দলকে 'বড় করে তোলার' একটা চেষ্টা আছে এনসিপির মধ্যে।
যদিও ভিন্ন ভিন্ন দল থেকে লোক যুক্ত করলে সেটা আদর্শিকভাবে দলটিকে টানাপোড়েনের মধ্যে ফেলতে পারে এমন আশঙ্কাও আছে। এরমধ্যেই এগার দলীয় জোটে থাকা এবং সাবেক শিবির নেতাদের অনেকের এনসিপিতে যুক্ত হওয়ার প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠেছে, এনসিপি কি আদর্শিকভাবে ডানপন্থার দিকে ঝুঁকছে কি-না। কেউ কেউ এনসিপিকে এমনকি 'জামায়াতের বি-টিম' হিসেবেও অভিযোগ করছেন।
এনসিপি যখন ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে গঠিত হয়, তখন দলটির নেতারা বলেছিলেন এনসিপি হবে একটি 'গণতান্ত্রিক এবং মধ্যপন্থি' রাজনৈতিক দল। ‘আমরা একটা মধ্যমপন্থি রাজনীতির কথা বলছি। এটাই আমাদের আদর্শ হবে। আমরা বাম-ডান এমন যে বিভাজন আছে, সেগুলোতে ঢুকতে চাই না। আমরা বাংলাদেশ প্রশ্নে এক থাকতে চাই। ইসলাম ফোবিয়ার রাজনীতি অথবা উগ্র ইসলামপন্থি বা উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির মধ্যেও আমরা নেই।’ দল গঠনের কয়েক দিন আগে তখনকার নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব আখতার হোসেন বিবিসি বাংলাকে এভাবেই বলেছিলেন। একইসঙ্গে এনসিপির একটি বড় দল হয়ে ওঠার সম্ভাবনার কথাও বলেছিলেন তিনি।
‘আমরা জনগণের কাছে গিয়ে যে ধারণা পেয়েছি এবং বিভিন্ন জরিপেও দেখবেন একটা নতুন দলের আকাঙ্ক্ষা আছে জনগণের মধ্যে। বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি দীর্ঘসময় ধরে ক্ষমতায় ছিল। তাদেরকে মানুষ দেখেছে। কিন্তু এর বাইরে গিয়ে জনগণের একটা বিশাল অংশ আছে, যারা নতুন একটি রাজনৈতিক শক্তির আবির্ভাব দেখতে চায়। সে জায়গা থেকে আমরা মনে করি আমাদের দল গঠিত হলে সেটা জনসমর্থন পাবে। ধীরে ধীরে আমরা একটা বড় দল হতে পারবো,’ বলেন আখতার হোসেন।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত এনসিপি গঠন হওয়ার এক বছরেরও বেশি সময় পরে এখন অনেকেই বলছেন, এনসিপি বড় দল হয়ে ওঠার পরিবর্তে বরং ‘জামায়াতের ছায়ায় ঢাকা পড়ছে।’ একইসঙ্গে ডানপন্থি রাজনীতির দিকে এনসিপি ঝুঁকে পড়েছে, এমন কথাও বলছেন রাজনীতি বিশ্লেষকদের কেউ কেউ।
‘শুরুর সেই ধারণাটা এখন আর নেই। জামায়াতের সঙ্গে জোট করা থেকে শুরু করে বিভিন্ন কারণে এনসিপিকে মধ্যপন্থি দল বলার সুযোগ দেখছি না। এমনকি একটা দলের যে মেনিফেস্টো থাকে, তারা এতোদিনেও সেটা দিতে পারেনি। ফলে তাদের আদর্শ নিয়ে একটা দোলাচল আছেই।’ বলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও রাজনীতি বিশ্লেষক জোবাইদা নাসরীন।
দলটির ভেতরে আদর্শিক দ্বন্দ্ব এবং অবিশ্বাস থেকে একপর্যায়ে বাম ঘরানার অনেকেই দল ছেড়ে যান। নির্বাচনের আগমুহূর্তে জামায়াতসহ ইসলামপন্থি দলগুলোর সঙ্গে জোট ইস্যুতে আরেক দফায় দলত্যাগ করেন নারী নেতাদের কেউ। অনেকে নিস্ক্রিয় হয়ে যান দলীয় কার্যক্রম থেকে।
সেসময় এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব মীর আরশাদুল হক দল থেকে পদত্যাগ করে বিএনপিতে যোগ দেন। বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, তার এনসিপি ছাড়ার পেছনে অন্য অনেক কারণের মধ্যে জামায়াত ইস্যু ছিল উল্লেখযোগ্য।
‘এখানে কিন্তু টপ লেয়ারের নেতাদেরও একটা অংশ সাবেক শিবির বা শিবির থেকে বের হয়ে গেছে বা কোনো একটা কারণে এখন আর জামায়াত করবে না -এরকম নেতাদের দেখবেন। তো তাদের সংখ্যা যখন সবখানে থাকে তখন দলটি তো ইতোমধ্যেই ডানপন্থায় চলে গেছে।’ বলেন মীর আরশাদুল হক।
এনসিপির সঙ্গে জামায়াতঘেঁষা অভিযোগ অবশ্য শুরু থেকেই। তারও আগে বলা হচ্ছিল, দলটি মূলত ক্ষমতার ছত্রছায়ায় থেকে রাজনৈতিক দল হয়ে ওঠার চেষ্টা করছে।
এনসিপি গঠিত হয় ২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি। পরবর্তী নির্বাচনের আগে দল গোছানোর জন্য এনসিপি যে সময় পায়, বাংলাদেশের বাস্তবতায় সেটা ছিল বেশ কঠিন। বাস্তবে ঘটেছেও তাই। এনসিপি অল্প কয়েক মাসে ৬৪টি জেলায় সংগঠনকে বিস্তৃত করা এবং সাংগঠনিক কাঠামো তৈরি করতে পারেনি।
অনেকেই মনে করেছিলেন, এনসিপির নেতারা অভ্যুত্থানের মুখ হওয়ায় সেই ইমেজ ব্যবহার করে তৃণমূলে দ্রুত পৌঁছাতে পারবে। কিন্তু বাস্তবে সেটা হয়নি।
এরমধ্যেই ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে গোপালগঞ্জ সফরে গিয়ে 'হামলার মুখে পড়েন' এনসিপির শীর্ষ নেতারা। শেষ পর্যন্ত সেনাপ্রহরায় গোপালগঞ্জ থেকে বেরিয়ে আসতে হয় এনসিপি নেতাদের। সেসময় বিষয়টি ব্যাপক আলোচনার খোরাক যোগায়।
তবে এতোসবের মধ্যেও এনসিপি নেতারা এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কথা বলছিলেন। নির্বাচনের আগমুহূর্তে দেখা যায়, এনসিপি জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটে যুক্ত হচ্ছে। নির্বাচনে জোটবদ্ধ হয়ে এনসিপি ছয়টি আসনে জয় লাভ করে।
কিন্তু দেখা যাচ্ছে, নির্বাচনি জোট হলেও নির্বাচনের পরে এসে সেই জোট এখন অনেকটাই রাজনৈতিক জোটে রূপ নেওয়ার অপেক্ষায়। জোটের পক্ষ থেকে যৌথ কর্মসূচিও ঘোষণা করা হয়েছে। সবমিলিয়ে অভিযোগ জোরালো হয়েছে যে, এনসিপি ডানপন্থার রাজনীতির দিকে স্থায়ীভাবে ঝুঁকে পড়ছে কি না।
তবে এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম অবশ্য বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, এনসিপির ডানপন্থার দিকে ঝুঁকে যাওয়ার সুযোগ নেই। ‘আমরা দেখেছি, বিএনপিও কিন্তু জামায়াতের সঙ্গে প্রায় ২৯ বছর ধরে জোটে ছিল। এখানে কিন্তু বিএনপি জামায়াতের সঙ্গে বিলীন হয়ে যায়নি। কিংবা জামায়াতও বিএনপির সঙ্গে বিলীন হয়নি। বরং জামায়াত ধীরে ধীরে একটা বড় রাজনৈতিক দল হয়ে উঠেছে। এনসিপি কখনও জামায়াতের বি-টিম হওয়ার সুযোগ কম। কারণ মূল পার্থক্যটা আদর্শগত জায়গায়।’
সারজিস বলেন, ‘জামায়াত ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল করে, ডানপন্থার রাজনীতি করে। আমরা এখানে মধ্যপন্থার রাজনীতি করি। বরং জামায়াতের সঙ্গে কিংবা ডানপন্থার সঙ্গে আমাদের রাজনীতির পার্থক্যটা স্পষ্ট হয়েছে।’
সারজিস আলম আরও বলেন, ‘সংসদে যখন জামুকা বিল পাস হয় তখন এনসিপি স্পষ্টভাবেই সেখানে সমর্থন দিয়েছে। জামায়াত কী ভাববে সেটা বিবেচনা করেনি।’
এনসিপি এখন বিভিন্ন দল থেকে বিভিন্ন মতাদর্শের লোককে যুক্ত করছে। এমনকি শর্তসাপেক্ষে ছাত্রলীগের লোকদেরও দলে ঢোকার সুযোগ আছে বলে জানাচ্ছেন দলটির নেতাদের কেউ কেউ। সব পন্থাকে একই প্ল্যাটফর্মে জায়গা দিতে গিয়ে দলটি আবারও জোরে শোরে মধ্যপন্থার কথা বলছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, ইসলামি দলগুলোর সঙ্গে জোটে থেকে মধ্যপন্থি হওয়া কীভাবে সম্ভব? তারচেয়ে বড় কথা এই জোটে গিয়ে এনসিপি কী অর্জন করলো?
এমন প্রশ্নে দলটির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম বিবিসি বাংলাকে বলেন, জোটগত নির্বাচনের কারণে সংসদে দলটির ছয় জন এমপি হয়েছেন। এটা দলটিকে রাজনীতির মাঠে এগিয়ে দেবে। তিনি বলেন, ‘আমরা যদি এককভাবে নির্বাচন করতাম, আমাদের আসন পাওয়ার সম্ভাবনা শূন্যও হতে পারত। মানে আমরা এক/দুইটা আসন পাবো-এমন আত্মবিশ্বাস দল গঠনের মাত্র এক বছর বা ছয় মাসের মধ্যে তৈরি করা খুবই টাফ। আর এনসিপি গঠনের আমাদের বড় নেতারা কেন্দ্রীয় কমিটিগুলো ঠিক করতে করতেই নির্বাচন এসে গেছে। তারা তো তখনও এলাকায় ঠিকভাবে সময় দিতে পারেনি। ফলে পরিস্থিতি কঠিন ছিলো। সে জায়গায় ছয়টা আসন পাওয়া দলের জন্য প্লাস পয়েন্ট।’
কিন্তু সংসদে প্রতিনিধিত্ব থাকলে সেটা দলকে কীভাবে এগিয়ে দেবে, এমন প্রশ্নে তার উত্তর হচ্ছে, ‘সংসদে যদি প্রতিনিধিত্ব না থাকে তাহলে সংগঠন বড় করা, সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করা এটা একটু কঠিন। এটা বাংলাদেশের মানুষের রাজনৈতিক মনস্তাত্ত্বিক একটা বাস্তবতা। এখন দেখেন সংসদে আমাদের প্রতিনিধিরা প্রশংসিত হয়েছেন। আপনি যদি শীর্ষ আলোচিত পাঁচজন সংসদ সদস্যের লিস্ট করেন, সেখানে এনসিপিরই পাবেন অন্ততঃ তিনজন। জনগণের ওপর এগুলোর তো প্রভাব আছে। দেখা যাচ্ছে, রাজনৈতিক শক্তি অর্জনের স্বার্থেই এনসিপি ডান বলয়ের জোটে যুক্ত হয়ে সংসদে যাওয়ার কৌশল নিয়েছে।’
রাজনীতি বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন আবার সেই কৌশলেই গলদ দেখছেন। ‘যখন একটা দল নিজেকে গোছানোর আগে, রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি করার আগেই একটা ক্ষমতার দিকে ঝুঁকে যায়, তখন দল হিসেবে বেশি জায়গা তারা পাবে না। কারণ এখন পর্যন্ত দেখেন মানুষ এটা ধরেই নিয়েছে যে, এনসিপির যারা এমপি হয়েছেন তারা জামায়াতের সমর্থনেই হয়েছেন। অর্থাৎ জামায়াত ছাড়া তাদের ভোট খুব একটা নেই।’ বলেন জোবাইদা নাসরীন।
তার মতে, এখন যদি জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির সম্পর্ক দীর্ঘ হতে থাকে, তাহলে সেটা এনসিপিকে আরও দুর্বল করবে এবং 'আলাদা একটি রাজনৈতিক দল হয়ে ওঠার যে সম্ভাবনা সেটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সূত্র: বিবিসি বাংলা
জেবি