নিজস্ব প্রতিবেদক
১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০২:২৬ পিএম
প্রায় ১৫ বছর ধরে দেশের অন্যতম বৃহৎ দল বিএনপির মহাসচিবের পদ সামলাচ্ছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। দলের চরম দুর্দিনে এবং প্রধান দুই নেতার অনুপস্থিতিতে শত বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন প্রবীণ এই নেতা। প্রায় দুই দশক পর দল এবার ক্ষমতায় এসেছে। মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রীর দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। এর মধ্যেই দলের কাউন্সিলের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। কয়েক মাসের মধ্যে কাউন্সিল হতে পারে বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। আর এই কাউন্সিলে বিএনপির মহাসচিব পদে পরিবর্তনের আলোচনা চলছে জোরেশোরে।
বিএনপির মহাসচিব পদে নতুন মুখ আসতে পারে সেই ইঙ্গিত দিয়েছেন খোদ মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি জানিয়েছেন, বয়স হয়েছে, এজন্য রাজনীতি থেকে অবসর নিতে চান। আর তিনি অবসর নিলে দল মহাসচিব পদে নতুন কাউকে বেছে নেবে-এটাই স্বাভাবিক।
একটি বেসরকারি টেলিভিশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ফখরুল রাজনীতি থেকে অবসরের ইঙ্গিত দেন। তিনি বলেন, আমি খুবই ক্লান্ত। আগামী কাউন্সিল পর্যন্ত থাকতে হচ্ছে। কাউন্সিলের পর অবসর নিতে চাই। আমার অনেক বয়স হয়ে গেছে। অসুস্থ হয়ে যাচ্ছি।
রাজনীতি থেকে অবসর নিলে বিএনপির দুর্দিনের কান্ডারি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি হতে পারেন-এমন একটা আলোচনা আছে। এ প্রসঙ্গে বর্ষীয়ান এই নেতা বলেন, এ ধরনের প্রত্যাশা আমার কখনোই ছিল না। আমি এ পর্যন্ত যেখানে এসেছি, সেটা আমার ভাগ্য নিয়ে এসেছে। আমার কাজটা ছিল, কিন্তু আমার আকাঙ্ক্ষা এখানে নিয়ে এসেছে বলে মনে করি না।
বিএনপির সবশেষ কাউন্সিল হয়েছিল ২০১৬ সালে। সেই কাউন্সিলে মহাসচিব নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। অবশ্য তিনি ২০১১ সাল থেকেই মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করছেন। খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের ইন্তেকালের পর তিনি এই দায়িত্ব পান। তাঁর দায়িত্বের পুরোটা সময়ই দল সংকটে ছিল। একদিকে বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাগারে অন্যদিকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডনে। ফলে দেশে কার্যত বিএনপির প্রধান হিসেবে নেতৃত্ব দেন মির্জা ফখরুল। বার্ধক্যজনিত নানা সমস্যার মধ্যেও তাকে বারবার কারাগারে যেতে হয়েছে। পড়তে হয়েছে নানা চাপের মুখে। দলের ঐক্য ধরে রেখে দুর্দিনে একজন সত্যিকারের নেতার পরিচয় তিনি প্রশংসা কুড়িয়েছেন সব মহলের।
১৯৬০-এর দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ছাত্র থাকাকালীন মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক যাত্রা শুরু। সেই সময় তিনি পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্র সংগঠন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নে (ইপিএসইউ) যোগদান করেন। তিনি সংগঠনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এসএম হল ইউনিটের মহাসচিব নির্বাচিত হন।
মির্জা ফখরুল পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের বিভিন্ন স্তরের মধ্য দিয়ে উঠে আসেন এবং ১৯৬৯ সালে রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানের তুঙ্গে ওঠার সময় সংগঠনের মর্যাদাপূর্ণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিটের সভাপতি নির্বাচিত হন। রাজনৈতিক কারণে তাকে গ্রেফতার করা হয় এবং কারাগারে পাঠানো হয়।
শিক্ষাজীবন শেষ করার পর মির্জা ফখরুল ১৯৭২ সালে ঢাকা কলেজে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের (শিক্ষা ক্যাডারের) সদস্য হিসেবে প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। তিনি বেশ কয়েকটি সরকারি কলেজে একজন সফল শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অন্যান্য সরকারি দায়িত্বের মধ্যে তিনি বাংলাদেশ সরকারের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরে উপ-পরিচালক এবং ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনে কাজ করেন। তিনি ১৯৭৯ সালের শেষের দিকে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রশাসনে তৎকালীন উপ-প্রধানমন্ত্রী এস.এ. বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবেও কাজ করেন এবং ১৯৮২ সালে এস.এ. বারী পদত্যাগ করার পূর্ব পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৮৬ সালে তিনি সরকারি চাকরি থেকে পদত্যাগ করেন এবং সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দেন। ১৯৮৮ সালে তিনি নিরপেক্ষ প্রার্থী হিসেবে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৯০-এর দশকের গোড়ার দিকে দেশব্যাপী এরশাদবিরোধী আন্দোলনের মধ্যে তিনি বিএনপিতে যোগদান করেন। ১৯৯২ সালে মির্জা ফখরুলকে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি করা হয়। ২০০১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করলে তিনি হন কৃষি প্রতিমন্ত্রী। ২০০৯ সালের কাউন্সিলে তিনি বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব নির্বাচিত হন।
এদিকে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে কাউন্সিল হতে পারে বলে আলোচনা চলছে বিএনপিতে। পরবর্তী মহাসচিব কে হবেন সেই আলোচনায় আছেন বেশ কয়েকজন নেতা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত নাম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। আছে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর নামও। এছাড়াও মহাসচিব পদে আসতে পারেন অন্য কোনো নেতাও।
জেবি