মোস্তফা ইমরুল কায়েস
২২ মার্চ ২০২৬, ১২:০৫ পিএম
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারানোর পর দেড় বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। এখনো ঘুরে দাঁড়ানোর কোনো আভাস নেই দেশের অন্যতম বৃহৎ দল আওয়ামী লীগের সামনে। টানা প্রায় সাড়ে ১৫ বছর দোর্দণ্ড প্রতাপের সঙ্গে সরকার পরিচালনার পর গত দেড় বছর ধরে দলটির নেতাকর্মীরা অনেকটা ছন্নছাড়া অবস্থায় দিনাতিপাত করছেন। ব্যতিক্রম হয়নি এবারের ঈদেও। টানা তৃতীয়বারের মতো দেশে-বিদেশে পালিয়ে ও গা ঢাকা দিয়ে ঈদ করতে হলো আওয়ামী লীগের বেশির ভাগ নেতাকর্মীকে।
আওয়ামী লীগের পতনের পর ক্ষমতাসীন হয় ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। জুলাই চেতনা ধারণ করা এই সরকারের সময়েই আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো দেড় বছরে অনেক চেষ্টা করেও আওয়ামী লীগ ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। এমনকি দলীয় প্রধানের ফাঁসির রায়ের পরও উল্লেখযোগ্য কোনো তৎপরতা চোখে পড়েনি। দলটি আশা করেছিল, নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় এলে তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ দেবে। এজন্য আওয়ামী লীগের অনেক ভোটার এবার বিএনপিকে ভোট দিয়েছে বলে জনশ্রুতি আছে। এমনকি বিএনপির এত বিশাল জয়ের পেছনে আওয়ামী লীগ নিয়ামকের ভূমিকা রেখেছে বলেও মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
তবে বিএনপি সরকারের আসার এক মাস পেরিয়ে গেলেও আওয়ামী লীগের ঘুরে দাঁড়ানোর কোনো আভাস নেই। বিএনপির তৃণমূলের বিরুদ্ধে কোথাও কোথাও আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের অভিযোগ উঠলেও কেন্দ্রীয়ভাবে বিএনপি তাদের অনড় অবস্থান ধরে রেখেছে। আওয়ামী লীগকে ছাড় দেওয়া হবে না বলেই ইঙ্গিত দিয়েছে বিএনপি। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্প্রতি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার কোনো ভাবনা আপাতত তাদের নেই।
বিদেশে অবস্থান করা আওয়ামী লীগ নেতাদের অনেকেই দেশের রাজনীতিতে কীভাবে ঘুরে দাঁড়ানো যায় সেই চেষ্টা করছেন। তবে কোথাও সুবিধা করতে পারছেন না বলে সূত্রে জানা গেছে। দলটির সবশেষ ভরসা ছিল ভারতের ওপর। তবে ভারত আওয়ামী লীগের দলীয় প্রধানসহ অনেক নেতাকে আশ্রয় দিলেও বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাদের পুনর্বাসন প্রশ্নে তেমন সাড়া দিচ্ছে না। বরং বিএনপি সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের বার্তা দিচ্ছে এবং দিন দিন ঘনিষ্ঠতা বাড়ছে। এই অবস্থায় আওয়ামী লীগের মধ্যে হতাশার ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল বৈঠকে বিএনপির ওপরও ক্ষোভ প্রকাশ করতে শোনা যায়।
জানা গেছে, ৫ আগস্টের পর পলাতক ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার মন্ত্রিসভার সাবেক মন্ত্রী ও দলবাজ কর্মকর্তাদের বড় একটি অংশ ভারতে অবস্থান করছেন। বাকিরা দুবাই, কাতার, কম্বোডিয়া, মালয়েশিয়া, যুক্তরাজ্য, বেলজিয়াম, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ডসহ কয়েকটি দেশে গা ঢাকা দিয়ে আছেন। তারা সেখানেই ঈদ করেছেন।
এবার দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা ছাড়াও ভারতে ঈদ করেছেন আওয়ামী লীগের নেতাদের একটি বড় অংশ। তাদের মধ্যে রয়েছেন ওবায়দুল কাদের, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, আসাদুজ্জামান খান কামাল, জাহাঙ্গীর কবির নানক, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, আলাউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী নাসিম, শফিউল আলম চৌধুরী, সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম, শেখ হাসিনার নিরাপত্তা উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিক, শেখ হেলাল ও তার ভাই শেখ সালাহ উদ্দিন এবং ছেলে তন্ময়, শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল মুজিব।
অন্যদিকে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ বেলজিয়ামে, সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মুহাম্মদ এ আরাফাত যুক্তরাষ্ট্রে, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য আবদুর রহমান, সাবেক নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, সিলেটের সাবেক মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী, সাবেক প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী শফিকুর রহমান চৌধুরী, বিপ্লব বড়ুয়া, আমিনুল ইসলাম যুক্তরাজ্যে, সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু কম্বোডিয়ায়, আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাহবুল-উল আলম হানিফ কানাডায়, ঢাকা দক্ষিণ সিটির সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস লন্ডনে, তার বড় ভাই যুবলীগ চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ সস্ত্রীক কানাডায়, নারায়ণগঞ্জের শামীম ওসমান যুক্তরাষ্ট্রে, শেখ হাসিনার অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল দুবাইয়ে, সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা হারুন-অর-রশিদ যুক্তরাষ্ট্রে, পুলিশের সাবেক আইজি বেনজীর আহমেদ স্পেনের আরাগনে, শেখ হাসিনার আত্মীয় নিক্সন চৌধুরী (মুজিবুর রহমান) ব্যাংককে, সাবেক সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল সাইফুল মালয়েশিয়ায় ও সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) আজিজ আহমেদ ইস্তান্বুলে ঈদ করেছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের নেতাদের একটি বড় অংশ বিদেশে গা ঢাকা দিয়েছেন। তাদের কেউ কেউ মাঝে মাঝে প্রকাশ্যে আসেন। তবে তারা তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তেমন কোনো যোগাযোগ রক্ষা করছেন না। ফলে তৃণমূলে তাদের ব্যাপারে ক্ষোভ বিরাজ করছে।
জানা গেছে, দলটির সাবেক এমপি, উপদেষ্টা, আমলা, কেন্দ্রীয় নেতা, ছাত্র ও বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের নেতারা বিদেশেই ঈদ করেছেন। তাদের আর দেশে আসার সম্ভাবনাও আপাতত নেই। তারা দেশে ফিরবেন কি না তাও স্পষ্ট করছেন না।
দলটির নেতাকর্মীরা কেন্দ্রীয় নেতাদের এমন আচরণে ক্ষুব্ধ। দেশে যারা রয়েছেন তাদের ঈদ ভীষণ কষ্টে কেটেছে। ইতোমধ্যে দলটির কয়েক লাখ নেতাকর্মী মামলার আসামি হয়েছেন। কারাগারে গেছেন হাজার। যারা বাইরে আছেন তারাও আতঙ্কে দিন পার করছেন। তারা নিজেদের বাড়িতে থাকতে পারছেন না। ফলে গত দুই ঈদের মতো অনেকটা ছন্নছাড়া অবস্থায় তাদের ঈদ কেটেছে।
আওয়ামী লীগের হয়ে নেতাদের কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে সম্মত হননি। তবে দলের জেলা পর্যায়ের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর আমরা অনেকটা আশাবাদী হয়েছিলাম। দলীয় সভানেত্রী বিদেশে থাকা নেতাদের দেশে ফেরার নির্দেশও দিয়েছিলেন। তবে সেই নির্দেশ মান্য করেননি নেতারা। বড় নেতাদের কেউই দেশে ফিরেননি। আমরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নেবে দল।
হাসিনা সরকারের পতনের পর প্রায় ২০ মাস হতে চলেছে। তখন থেকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের আর কেউ কোনো খোঁজখবর নিচ্ছেন না। এমনি যারা ৫ আগস্টের পর মামলা ও হামলার শিকার হয়েছেন তাদের পাশেও কেউ দাঁড়াচ্ছেন না। বাগেরহাট উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেনের স্ত্রী হতাশায় আত্মহত্যা করেন। পরে বিষয়টি আলোচনায় এলেও পরিবারটির পাশে দাঁড়ায়নি আওয়ামী লীগ।
একটি পরিসংখ্যান বলছে, এই মুহূর্তে আওয়ামী লীগের কয়েক হাজার নেতাকর্মী কারাগারে রয়েছেন। তাদের ছাড়াতে আওয়ামী লীগের কোনো আইনজীবীও আদালতে দাঁড়াচ্ছেন না। টাকার অভাবে এসব নেতাকর্মীর অনেকের পরিবার কষ্টে দিনাতিপাত করছেন।
জানা গেছে, আওয়ামী লীগের সক্রিয় কর্মী ও নেতাদের অনেকেই ঢাকা শহরে গা ঢাকা দিয়ে আছেন। এমনকি জীবন বাঁচাতে কেউ কেউ অ্যাপে মোটরসাইকেল চালানোসহ নানা পেশায় নিয়োজিত রয়েছেন।
আওয়ামী লীগের তৃণমূলের এমন কয়েকজন কর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের মধ্যে হতাশা কাজ করছে। দল কবে ঘুরে দাঁড়াবে কিংবা আদৌ দাঁড়াতে পারবে কি না সেটা নিয়ে তারা সন্দিহান। অনেক রাজনীতি থেকে বিদায় নেওয়ার ইচ্ছা করেছেন। আবার কেউ কেউ অন্য দলে ভেড়ার চেষ্টাও করছেন।
এমআইকে/জেবি