images

রাজনীতি

স্বস্তির ঈদেও বিএনপিতে বিষাদের ছায়া

বোরহান উদ্দিন

২০ মার্চ ২০২৬, ১১:০২ এএম

  • খালেদা জিয়াকে ছাড়া প্রথম ঈদ
  • আঁধার কাটেনি গুম হওয়া পরিবারে
  • দেড় যুগ পর ভয়ডরহীন পরিবেশ
  • ফেরারিদের ঘরে ফেরায় স্বস্তির হাওয়া

প্রায় দেড় যুগের রাজনৈতিক নির্বাসন, রাজপথের লড়াই আর জেল-জুলুম পেছনে ফেলে এবছর ঈদুল ফিতর বিএনপির নেতাকর্মীদের জন্য নিয়ে এসেছে স্বস্তির হাওয়া। ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর চলতি বছরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পাওয়ায় এবারের ঈদ দলটির কাছে কেবল ধর্মীয় উৎসব নয়, দীর্ঘ সংগ্রামের পর বিজয়ের আনন্দ ভাগাভাগির উৎসব। তবে এমন অনুকূল পরিবেশ আর প্রাপ্তির মাঝেও নেতাকর্মীদের মনে একধরনের চাপা কষ্ট বিরাজ করছে। কারণ এবছর তাদের রাজনৈতিক অভিভাবক বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে ছাড়া কাটাতে হবে ঈদ।

নেতাকর্মীরা বলছেন, কারাবন্দি থাকাবস্থায় কিংবা মুক্তির পর অসুস্থতার কারণে ঈদের দিনে অতীতের মতো নেতাকর্মীদের সঙ্গে খালেদা জিয়া শুভেচ্ছা বিনিময় করতে পারতেন না। তারপরও তাঁর জীবিত থাকাবস্থায় সবাই সাহস পেতেন। কিন্তু এবার তিনি পরপারে পাড়ি জমানোর ফলে সবার মধ্যে এক ধরনের শূন্যতা বিরাজ করছে।
অন্যদিকে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের পতনের পর দলীয় প্রধান তারেক রহমানসহ অনেক নেতাকর্মীর দেশে ফিরে আসায় দলে স্বস্তি ফিরেছে। বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী কারামুক্ত হয়েছেন। তবে বিগত সরকারের সময়ে ইলিয়াস আলীসহ গুম হওয়া অনেক নেতাকর্মীর এখনো সন্ধান না মেলায় সেসব পরিবারে ঈদেও বিরাজ করছে বিষাদের ছায়া।

মানসিক কারামুক্তির ঈদ

বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আওয়ামী লীগের তিন মেয়াদে বেশির ভাগ সময় আন্দোলন-কর্মসূচিতে কেটেছে বিএনপিকে। ফলে লম্বা এই সময়ে বিপুল পরিমাণ নেতাকর্মীকে গ্রেফতার, কারাবন্দি অবস্থায় ঈদ কাটাতে হয়েছে। অনেকে মামলা থাকায় পালিয়েও বেড়িয়েছেন। পরিবারের সঙ্গে তাদের ঈদ করার সুযোগ হয়নি। ঈদে পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ, সন্তানদের নতুন জামা কিনে দেওয়ার সাধারণ আনন্দটুকুও কারও কারও কাছে ছিল অলিক কল্পনা। ২০২৬ সালের এই ঈদ তাই সেই দীর্ঘ ট্রমা থেকে মুক্তি পাওয়ার প্রথম বড় ধাপ।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও বর্তমান অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবারের ঈদকে দেখছেন একটু ভিন্ন আঙ্গিকে। তার মতে, গত ১৬-১৭ বছরের দুঃসহ সময় পেরিয়ে এই ঈদ উদযাপন হচ্ছে এক ধরনের মানসিক কারামুক্তির মধ্যে।

হুলিয়া নেই, আছে বুক ফুলিয়ে ফেরার স্বস্তি

পুলিশি আতঙ্কে ঈদ কাটানো বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের জন্য এবার নতুন দৃশ্যপট ধরা দিয়েছে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর দল রাষ্ট্রক্ষমতায় আসায় ভয়ডরহীন চলার সুযোগ পেয়েছেন।

আওয়ামী লীগ আমলে বিএনপি নেতাকর্মীদের ঈদ কাটানোর কথা তুলে ধরে মহিলা দলের কেন্দ্রীয় ক্রীড়া সম্পাদক নিলুফার ইয়াসমীন নিলু ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘১৬ বছর ঈদ উদযাপন তো দূরে থাক, এলাকায় চোরের মতো পালিয়ে বেড়াতে হতো। বাড়িতে এসে পরিবারের সঙ্গে সেমাই খাওয়া, ঈদের দিনে বাবা-মায়ের সঙ্গেও অনেকে সাক্ষাৎ করতে পারতেন না। এবার আর আতঙ্ক নেই, আত্মীয়-স্বজনদের নিয়ে ঈদ করছে সবাই। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া। তবে এই দৃশ্য ম্যাডাম দেখে যেতে পারলে সবচেয়ে বেশি খুশি হতেন।’

ফিরে না আসা প্রিয়জনদের দীর্ঘশ্বাস

এত আনন্দের মাঝেও বিএনপির ঈদ বিষাদে রূপ নিয়েছে ‘গুম’ হওয়া নেতাকর্মীদের পরিবারগুলোতে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও গুম হওয়া প্রিয়জনরা আর ফিরে আসেননি। সিলেটের এম ইলিয়াস আলী, ঢাকার আলোচিত কাউন্সিলর চৌধুরী আলমের পরিবারের মতো আরও অনেক পরিবার আজও পথ চেয়ে বসে আছে।

ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরুল ইসলাম স্বপন ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘ঈদ মানে উৎসব হলেও বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের লাখ লাখ নেতাকর্মীর আওয়ামী লীগের পুরো সময়ে নিরানন্দ কেটেছে। গ্রেফতার এড়াতে পরিবার-পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন থেকেছেন অনেকে। কারাগারে মাসের পর মাস দিন কেটেছে, মুক্তি পেলে জেল গেটে আবার গ্রেফতার করা হয়েছে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর ধীরে ধীরে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে। এবার জনগণের ভোটে বিএনপি ক্ষমতায় আসায় সবার মধ্যে স্বস্তি থাকলেও আমাদের অভিভাবক বেগম খালেদা জিয়া নেই, এটাই আমাদের সবচেয়ে বেশি কষ্টের।’

বিইউ/জেবি