বিশেষ প্রতিনিধি
১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১১:১৯ এএম
বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনের ভোটে ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসালামীর অভূতপূর্ব শক্তিবৃদ্ধি ভারতকে আপাতত উদ্বেগমুক্ত হতে দেবে না বলেই মনে করছেন দিল্লির রাজনীতিক এবং কূটনীতিকরা।
তাদের মতে, ক্ষমতা দখল করতে না পারলেও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসন জয়ের নতুন নজির গড়েছে জামায়াত। এর আগে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে সর্বোচ্চ ১৮টি আসনে জিতেছিলেন দাঁড়িপাল্লার প্রার্থীরা।
এবার তার অন্তত চারগুণেরও বেশি আসন তাদের ঝুলিতে আসতে চলেছে। বাংলাদেশ এবং ভারতের রাজনীতিতে যার প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে।
তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে, পশ্চিমবঙ্গ সীমান্ত লাগোয়া জেলাগুলিতেই জামায়াতের জয়ের হার বেশি। দক্ষিণবঙ্গ লাগোয়া সাতক্ষীরা, চুয়াডাঙা, ঝিনাইদহের ‘পুরনো ঘাঁটি’র পাশাপাশি মধ্যবঙ্গ ঘেঁষা মেহেরপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা এমনকি, উত্তরবঙ্গ লাগোয়া রংপুর বিভাগেও ভালো ফল করেছে জামায়াত ও তার সহযোগীরা।
পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জমানায় যুদ্ধাপরাধে অভিযোগ এনে একাধিক নেতার ফাঁসির পর জামায়াত নেতৃত্ব হাঁপ ছেড়েছিলেন ২০২৪ সালের ক্ষমতার পালাবদলের পরে।
এবারের ভোটের ফল মূলস্রোতের রাজনীতিতে প্রথমবার বড় শক্তি হিসাবে আত্মপ্রকাশের সুযোগ করে দিয়েছে তাদের। অতীতে খালেদা জিয়া, এমনকি শেখ হাসিনার জমানাতেও ভারতবিরোধী কট্টরপন্থী সংগঠনগুলিকে মদত দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল জামায়াতের বিরুদ্ধে। ফলে নয়াদিল্লির কাছে জামায়াতের উত্থানের বিষয়টি উদ্বেগেরই হওয়ার কথা।
এবারের ভোটে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলের জোটের অংশ ছিল ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের ছাত্রনেতাদের একাংশের গড়া দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মতো ইসলামপন্থী দলগুলি।
ভোটের পরে কেন্দ্রওয়াড়ি বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, অন্তত তিন ডজন কেন্দ্রে জয়ী বিএনপি প্রার্থীর সঙ্গে কড়া টক্কর দিয়েছে এই জোট। আসনরফা নিয়ে জামায়াতের সঙ্গে মতবিরোধের জেরে ‘বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ইসলামপন্থী দল’ হিসাবে পরিচিত ‘ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশ’-এর প্রধান সৈয়দ রেজাউল করিম (‘চরমোনাই পীর’ নামে পরিচিত) আলাদা ভাবে আড়াইশোর বেশি আসনে প্রার্থী না দিলে বিএনপি এবার আরও চাপে পড়ত বলে অনেকের ধারণা।
অথচ মাত্র আট বছর আগে ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই জামায়াত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল বিএনপির ‘ধানের শিষ’ প্রতীকে! বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে সে সময় নির্বাচন কমিশন যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত জামায়াতের ‘রাজনৈতিক দল’ হিসাবে স্বীকৃতি বাতিল করায় তৎকালীন বিএনপি প্রধান তথা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ২২টি আসন ছেড়েছিলেন জামায়াতকে। সেই আসনগুলিতে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম মুখ জেনারেল জিয়াউর রহমান প্রতিষ্ঠিত বিএনপির প্রতীকে লড়েছিলেন জামায়াতের প্রার্থীরা।
এবারের ভোটের ফল দেখে অনেকে মনে করছেন, ‘নিষিদ্ধ’ আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের একাংশের ভোট জামায়াতের দিকে গিয়েছে।
বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবার ছিল একেবারে ভিন্ন। ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ থেকে জন্ম নেওয়া গণবিক্ষোভের জেরে ২০২৪ সালের ৫ অগস্ট শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী পদে ইস্তফা দিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন।
আরও পড়ুন:
ছাত্র-যুবকদের সেই আন্দোলনের মূল কারিগর ছিল জামায়াত। এর পরে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বতী সরকারের জমানায় নির্বিচারে আক্রমণ হয়েছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর। পাশাপাশি, লীগের অনেক নেতাকে গ্রেফতারও করা হয়।
ড. ইউনূসের অন্তবর্তী সরকারের আমলে নিষেধাজ্ঞার কবল থেকে মুক্তি পাওয়ার পরে গত এক বছর ধরে ধীরে ধীরে প্রভাব বেড়েছিল জামায়াতের। ইউনূস সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টার সাহায্যে জামাতের প্রভাববৃদ্ধি নিয়ে বিএনপি, বিভিন্ন বামপন্থী শক্তি এবং অন্য ইসলামি দলগুলিও বিভিন্ন সময়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও ঢাকা, জাহাঙ্গিরনগর, চট্টগ্রাম, রাজশাহি-সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে বিএনপির ছাত্র সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলকে পর্যুদস্ত করে জয়ী হয়েছে জামায়াতের ছাত্র শাখা ইসলামি ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল।
যার নেপথ্যে ছিলেন জুলাই আন্দোলনের ছাত্রনেতাদের একাংশও। যুবসমাজের বড় অংশ যে এবার জামায়াতের পাশে, বিভিন্ন জনমত সমীক্ষাতেও তা উঠে এসেছিল। ফলে ‘চাপ’ বাড়ছিল নয়াদিল্লির ওপর।
যদিও ভোটের তারিখ ঘোষণার আগে থেকেই জামায়াত ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্কের ওপর জোর দিয়েছিল। তাদের নির্বাচনী ইস্তাহারে ফলাও করে নয়াদিল্লি-ঢাকা সহযোগিতা নিবিড় করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও ইসলামাবাদের কোনও উল্লেখ ছিল না।
জামায়াতের আমির শফিকুর যথাযোগ্য মর্যাদায় স্বাধীনতা দিবস পালনের জন্য সংগঠনের সব শাখা এবং দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন।
জাতীয় সংসদের ভোটে পরাস্ত হলেও উল্লেখযোগ্য শক্তিবৃদ্ধি হয়েছে জামায়াতের। পাশাপাশি, ইউনূস সরকারের বদান্যতায় জুলাই সনদে ঠাঁই পাওয়া তাদের একাধিক প্রস্তাব ‘হ্যাঁ’ হয়ে গিয়েছে গণভোটে। ফলে জামায়াতের আগামী দিনের কার্যকলাপ নিয়ে তাই এখন থেকেই জল্পনা তৈরি হয়েছে।
-এমএমএস