জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৭:৩৪ পিএম
আওয়ামী লীগ আমলে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের যেসব নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে বেশি সংখ্যক মামলা হয়েছে এবং গ্রেপ্তার হয়ে কারাবন্দি থাকতে হয়েছে, তাদের মধ্যে পুরান ঢাকার ইসহাক সরকার অন্যতম। ছাত্রদলের তৃণমূল থেকে রাজনীতিতে হাতেখড়ি হওয়া ইসহাক সরকার ছিলেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক। পরবর্তীতে তিনি যুবদলেও কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বিগত সময়ে রেকর্ডসংখ্যক ৩৬৫টি মামলার আসামি হয়ে দীর্ঘ সময় কারাগারে ও আত্মগোপনে কাটিয়েছেন তিনি। এবার ঢাকা-৭ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন ইসহাক সরকার।
ঢাকা-৭ আসনে বিএনপির সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় দল থেকে বহিষ্কারের পরদিন বৃহস্পতিবার নেতাকর্মীদের সামনে বক্তব্য দিতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। বহিষ্কারের কারণে দলের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করলেও নিজের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতা, ত্যাগ, নির্যাতন ও বঞ্চনার কথা তুলে ধরেন ইসহাক সরকার। জানা গেছে, ১১টি ভিন্ন মামলায় তাকে বিভিন্ন মেয়াদে মোট প্রায় সাড়ে ২২ বছরের সাজা দেওয়া হয়েছে। প্রায় দশ মিনিটের বক্তব্যে এসব প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি অভিযোগ করেন, দলের সিদ্ধান্তের বাইরে প্রার্থী হওয়ায় বহিষ্কার করা হলেও তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়নি। এমনকি প্রার্থিতা প্রত্যাহারের জন্য দলের পক্ষ থেকে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ডাকা হয়নি।

তবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত না হলেও এলাকার মানুষের জন্য কাজ করার কথা জানিয়েছেন এই তরুণ রাজনীতিক।
বুধবার (৫ ফেব্রুয়ারি) রাতে বিএনপির পক্ষ থেকে ইসহাক সরকারকে বহিষ্কার করা হয়। ঢাকা-৭ আসনে বিএনপির প্রার্থী হামিদুর রহমান হামিদ। আর ইসহাক সরকার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ফুটবল প্রতীক নিয়ে।
মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে যে স্থানে নারকীয়ভাবে ভাঙারি ব্যবসায়ী সোহাগকে হত্যা করা হয়, সেখানে দাঁড়িয়ে বক্তব্য দেন ইসহাক সরকার। কথা বলার সময় একাধিকবার কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। এ সময় উপস্থিত নেতাকর্মীরা তাকে সান্ত্বনা দেন।
আরও পড়ুন: স্বতন্ত্র নির্বাচন করায় বিএনপি থেকে ইসহাক সরকারকে বহিষ্কার
ইসহাক সরকার জানান, ৫০ বছরের জীবনের প্রায় তিন দশক তিনি জাতীয়তাবাদী দলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তার ভাষায়, সততার সঙ্গে রাজনীতি করেছেন এবং দলের সুনাম ক্ষুণ্ন হয়—এমন কোনো কর্মকাণ্ডে কখনো জড়াননি। বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত তিনি প্রথমে জানতে পারেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। পরে একটি চিঠির কথা জানতে পারলেও তা আনুষ্ঠানিকভাবে পাননি বলে দাবি করেন তিনি।
বক্তব্যে তিনি বলেন, তার রাজনৈতিক লড়াইয়ের প্রভাব শুধু নিজের ওপর নয়, পুরো পরিবারের ওপর পড়েছে। স্বৈরাচারী শাসনামলে পরিবারের একাধিক সদস্য নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত না থাকা ছোট ভাইকে বছরের পর বছর কারাভোগ করতে হয়েছে। বড় ভাই ইয়াকুব সরকারকেও বহিষ্কার ও নির্যাতনের মুখোমুখি হতে হয়েছে। স্ত্রী-সন্তানসহ পরিবারের অন্য সদস্যদেরও নানা চাপ ও ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে।
ইসহাক সরকার বলেন, ৫০ বছরের জীবনের ৩০ বছর তিনি দলের পতাকাতলে কাটিয়েছেন। সততার সঙ্গে রাজনীতি করেছেন। এখন থেকে তিনি আর দলের পরিচয় দিতে পারবেন না, কারণ তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, যে চিঠির মাধ্যমে তাকে বহিষ্কারের কথা বলা হচ্ছে, সেটি তিনি কখনো হাতে পাননি এবং বিষয়টি ফেসবুকের মাধ্যমেই জেনেছেন।

তিনি আরও বলেন, জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়গুলো দলের জন্য ব্যয় করেছেন। শুধু তিনি নন, স্বৈরাচারের সময়ে তার পরিবারের প্রতিটি সদস্য নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত না থাকা ছোট ভাইকেও বছরের পর বছর কারাবন্দি থাকতে হয়েছে। বড় ভাই ইয়াকুব সরকারকে বহিষ্কার করে দীর্ঘদিন ডান্ডাবেড়ি পরিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে। স্ত্রী-সন্তান, ভাই-বোন—কেউই নিস্তার পাননি। তিনি অভিযোগ করেন, দলের সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়ার কারণে তাকে বহিষ্কার করা হলেও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়নি। দলের সঙ্গে কথা বলার বা নিজের বক্তব্য জানানোর সুযোগও পাননি তিনি। বাবার মৃত্যুর সময় প্যারোলে মুক্তি নিয়ে শেষবারের মতো তাকে দেখার কথাও উল্লেখ করেন ইসহাক সরকার।
তিনি বলেন, দলের প্রতি তার কোনো অভিযোগ, রাগ বা ক্ষোভ নেই। দল সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তিনি তা মেনে নিয়েছেন। তবে দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে দলের জন্য লড়াই করেছেন, কষ্ট সহ্য করেছেন। বহু নেতাকর্মী গুম ও হত্যার শিকার হয়েছেন। তার ভাতিজা ১৩ বছর ধরে নিখোঁজ রয়েছেন। বংশাল থানার সাতজন নেতা গুম হয়েছিলেন। নিজেও গুমের শিকার হয়েছিলেন বলে দাবি করেন তিনি। কিন্তু কোনো ইনসাফ পাননি বলে হতাশা প্রকাশ করেন।
ইসহাক সরকার বলেন, তিনি নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন দলের বিরুদ্ধে নয়, বরং দল যাদের মনোনয়ন দিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এ বিষয়ে দলের পক্ষ থেকে তার সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি। তিনি বলেন, যে স্থানে দাঁড়িয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন, সেটি একটি ঐতিহাসিক স্থান, যেখানে সোহাগ নামে এক ব্যক্তিকে পৈশাচিকভাবে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছিল। ওই মামলায় তাকে জড়ানোর চেষ্টা করা হলেও তিনি এর প্রতিবাদ করেছেন। আল্লাহর রহমত ও প্রশাসনের নিরপেক্ষতার কারণে তিনি বেঁচে গেছেন বলে মন্তব্য করেন।
উপস্থিত নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, তিনি কখনো দলের নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজি করেননি এবং তার কারণে দলের সুনাম ক্ষুণ্ন হয়নি। এরপরও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তিনি বিষয়টি আল্লাহর কাছে সোপর্দ করেছেন এবং ইনসাফ পাবেন বলে আশা প্রকাশ করেন। এলাকার মানুষ তাকে ছেড়ে যায়নি বলেও দাবি করেন তিনি। জয়-পরাজয় যাই হোক, মানুষের পাশে থাকার অঙ্গীকার করেন ইসহাক সরকার।

বহিষ্কারের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, আজ থেকে তিনি পরিচয়বিহীন। আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। ভোটে জয়-পরাজয় যাই হোক, এলাকার মানুষের কাছে তার দায় শোধ করা সম্ভব হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, যারা দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল তারা পুরস্কৃত হচ্ছে, আর তিনি তিরস্কৃত হয়েছেন। এতে তার কোনো কষ্ট নেই। জীবনে পাওয়া সব কষ্ট তিনি দেশবাসীর জন্য উৎসর্গ করেছেন। নিজে ও তার পরিবারের সদস্যরা দেশবাসীর জন্য এই ত্যাগ স্বীকার করেছেন বলে জানান তিনি। দলের বিপর্যয় হয়—এমন কোনো কাজ তিনি কখনো করেননি বলেও দাবি করেন। এমপি হওয়াই তার একমাত্র লক্ষ্য নয়, জনগণের সেবক হিসেবে কাজ করাই তার উদ্দেশ্য বলে উল্লেখ করেন তিনি।
ইসহাক সরকার বলেন, তাকে এখন হুমকি দেওয়া হচ্ছে। তার স্ত্রীকে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তবে জন্ম-মৃত্যু আল্লাহর হাতে উল্লেখ করে বলেন, নীতি, আদর্শ ও অবস্থান থেকে তিনি একবিন্দুও সরে যাবেন না। ভোট দিক বা না দিক, জনগণের পাশে থাকার আহ্বান জানান তিনি। ৩৬৫টি মামলার কথা উল্লেখ করে বলেন, এত নির্যাতনের পরও তিনি কখনো আপোষ করেননি। উপস্থিতদের কাছে দোয়া কামনা করেন তিনি।
বিইউ/এআর