জেলা প্রতিনিধি
০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৯:০৫ পিএম
চব্বিশের গণবিপ্লব বেকার ভাতার জন্য নয়, মেধা ও যোগ্যতার স্বীকৃতির জন্য হয়েছিল। তাই যুবক-যুবতীদের হাতে বেকার ভাতা তুলে দিয়ে আমরা তাদের অপমান করব না। আমরা তাদের শিক্ষা দিয়ে, প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের হাতে কাজ তুলে দেব। তখন তারাই গড়বে বাংলাদেশ। আর গর্ব করে বলবে, আমিই বাংলাদেশ।
সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে চট্টগ্রাম মহানগর, সীতাকুন্ড ও লোহাগাড়া উপজেলায় অনুষ্ঠিত নির্বাচনি জনসভায় এসব কথা বলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। বেকার ভাতা নেবে না-কি কাজ করবে, সমবেত যুবকদের কাছে জানতে চান জামায়াতের আমির। এসময় সমস্বরে স্লোগান উঠে সমবেতদের মাঝে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে শফিকুর রহমান বলেন, ‘চব্বিশের বিপ্লব সফল করতে মা-বোনদের অবদান অপরিসীম। যেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বোনদের গায়ের ওপর হাত তোলা হল, সেদিন সারা বাংলাদেশে যেন আগুন জ্বলে উঠল। পরদিন সারাদেশে ছয়জন বীর শহিদ হল। রংপুরে আবু সাঈদ বুক পেতে দিয়ে বলল, বুকের ভেতর দারুণ ঝড়- বুক পেতেছি গুলি কর। বীরেরা কখনও পালায় না। বীরেরা হয় বিজয়ী হয়, নয়তো গুলি খেয়ে শাহাদাত বরণ করে।’
আরও পড়ুন: ঢাকা-৯ আসনে ভোটযুদ্ধে ত্রিমুখী সমীকরণ
চব্বিশ না হলে ছাব্বিশ হতো না। যারা চব্বিশকে স্বীকার করে তাদের জন্যই ছাব্বিশ এসেছে। আর যারা চব্বিশকে স্বীকার করে না, তাদের জন্য ইনশাল্লাহ লালকার্ড। ডাকসু (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ) দিয়ে শুরু, জকসুতে (জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ) এসে থেমেছে আপাতত। আগামী ১২ তারিখ ইতিহাস সৃষ্টি হবে।
আমরা বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের মানুষ সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করবে না। যে যুবকদের নেতৃত্বে আমরা চব্বিশের বিপ্লবের মধ্য দিয়ে নতুন বাংলাদেশ পেয়েছি, সেই তরুণরাই বাংলাদেশকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ডাকসু থেকে শুরু, জকসুতে এসে আপাতত থেমেছে। সব জায়গায় একই চিত্র।
আমির বলেন, আমরা চাই দালালমুক্ত বাংলাদেশ, আমরা চাই চাঁদাবাজমুক্ত বাংলাদেশ। আমরা দুর্নীতিবাজমুক্ত বাংলাদেশ। আমরা চাই মামলাবাজমুক্ত বাংলাদেশ। আমরা চাই ব্যাংক ডাকাতমুক্ত বাংলাদেশ। আমরা চাই ঋণখেলাপিমুক্ত বাংলাদেশ। আমরা একটা মানবিক বাংলাদেশ চাই। তারা রায় অলরেডি দিয়ে দিয়েছে, ১২ তারিখ ইনশাল্লাহ তা-ই হবে।
কোনো দলের নাম উল্লেখ না করে মূল প্রতিদ্বন্দ্বীদের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘এটা দেখে অনেকের মাথা গরম। এখন চৈত্র মাস নাকি বৈশাখ মাস? মাঘ মাস, তো ভাই মাঘ মাসে মাথা এতো গরম হলে চৈত্র মাসে কি হবে? ভাই একটু ঠান্ডা রাখ মাথা। যেদিকে যাও সেদিকে মাথা গরমের লক্ষণ ফুটে ওঠে। মানুষ যখন হতাশ হয়, মানুষ যখন নিজের ব্যর্থতার গ্লানি চোখের সামনে দেখতে পায়, তখন চোখের মধ্যে সর্ষে ফুল দেখে। তখন অনেকসময় নিজের স্ত্রীকেও মা বলে সম্বোধন করে ফেলে। আমরা বাংলাদেশে এখন তাই দেখতে পাচ্ছি।’
জনসভায় সভাপতিত্ব করেন চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা জামায়াতের আমির আনোয়ারুল আলম চৌধুরী। বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় জামায়েতের অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি মাওলানা মোহাম্মদ শাহজাহান, মঞ্চে ১১ দলীয় জোটের শরিক দল লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি অলি আহমদ, চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আসনের জামায়াতের প্রার্থী শাহজাহান চৌধুরী, উত্তর জেলা জামায়াতের সাবেক আমির অধ্যক্ষ আমিরুজ্জামান, অধ্যাপক নুরুল আমিন চৌধুরী, উত্তর জেলা শ্রমিক সভাপতি ইউসুফ বিন আবু বকর, চট্টগ্রাম-১ আসনের প্রার্থী অ্যাডভোকেট ছাইফুর রহমান, চট্টগ্রাম-২ আসনের প্রার্থী অধ্যক্ষ নুরুল আমিন, চট্টগ্রাম-৪ আসনের প্রার্থী আনোয়ার সিদ্দিক চৌধুরী, চট্টগ্রাম-৫ আসনের প্রার্থী নাসির উদ্দিন মনির, চট্টগ্রাম-৬ আসনের প্রার্থী শাহজাহান মঞ্জু, চট্টগ্রাম-৭ আসনের প্রার্থী ডা. এটিএম রেজাউল করিম, সনাতন প্রতিনিধি দোলন দেব, কেন্দ্রীয় তত্ত্বাবধায়ক ইব্রাহিম, ডাকসু জিএস এসএম ফরহাদ, চবি শিবির সভাপতি ও চাকসু ভিপি ইব্রাহিম রনি প্রমুখ।
এদিকে নির্বাচনকে সামনে রেখে চট্টগ্রাম মহানগর, সীতাকুন্ড ও লোহাগাড়ার পদুয়ায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর জনসভায় যোগ দিতে নেতাকর্মী ও সমর্থকদের ঢল নামে। মহেশখালী ও কক্সবাজারে জনসভা শেষে জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমানের আগমনকে কেন্দ্র করে পুরো এলাকায় উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) বেলা ১১টার দিকে লোহাগাড়া উপজেলার পদুয়া এসিএম উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আনুষ্ঠানিকভাবে জনসভার কার্যক্রম শুরু হয়। তবে দুপুর আড়াইটার দিকে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেওয়ার কথা থাকায় দুপুর গড়িয়ে গেলেও মাঠজুড়ে ছিল আমিরে জামায়াতের অপেক্ষা। এ সময় নেতাকর্মীরা দলীয় সংগীত ও স্লোগান মুখর করে রাখেন পুরো মাঠ।
লোহাগাড়া ছাড়াও সাতকানিয়া, চন্দনাইশসহ আশপাশের বিভিন্ন উপজেলা, থানা ও ইউনিয়ন থেকে মিছিল নিয়ে নেতাকর্মীরা জনসভাস্থলে যোগ দেন। এতে অল্প সময়ের মধ্যেই মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে। দাঁড়িপাল্লা প্রতীক, ব্যানার ও ফেস্টুন হাতে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীর উপস্থিতি জনসভাকে বড় আকার দেয়। একইভাবে সীতাকুন্ড ও চট্টগ্রাম মহানগর এলাকার বন্দর মাঠেও জনতার ঢল নামে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা জামায়াতের আমির আনোয়ারুল আলম চৌধুরী বলেন, ‘লোহাগাড়ার পদুয়ার জনসভা দক্ষিণ চট্টগ্রামের ইতিহাসে স্মরণকালের বড় জনসভা হয়েছে। প্রথমবার আমিরে জামায়াত এখানে এসেছেন, তাই নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা তৈরি হয়।’
তিনি বলেন, ‘তিনটি জনসভায় চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের সমস্যা ও সম্ভাবনার বিষয়ে দিকনির্দেশনা দিয়ে গেছেন জামায়াত আমির। এই সফরের মাধ্যমে নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা, মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গঠনের রূপরেখা আরও স্পষ্টভাবে জনগণের সামনে তুলে ধরেছেন তিনি। পাশাপাশি চট্টগ্রাম-কক্সবাজার অঞ্চলের উন্নয়ন, বন্দর ব্যবস্থাপনা, কর্মসংস্থান ও অবকাঠামোগত সমস্যা সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেন তিনি। চট্টগ্রাম মহানগরীর জনসভা শেষ করে তিনি ঢাকায় ফিরবেন।’
প্রতিনিধি/এমআই