images

রাজনীতি

পরিবহন ও নগর পরিকল্পনায় রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতি রয়েছে: মাহদী আমিন

নিজস্ব প্রতিবেদক

১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ০৩:২৫ পিএম

দেশে পরিবহন ব্যবস্থা ও নগর পরিকল্পনায় সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকলেও তা বাস্তবায়নে রাজনৈতিক সদিচ্ছার বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করছেন বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র মাহদী আমিন।

তিনি বলেছেন, ‘পরিকল্পনার অভাবে রিকশা, সিএনজি, মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহনকে কার্যকর কাঠামোর আওতায় আনা যাচ্ছে না, একই সঙ্গে বিকেন্দ্রীকরণ না হওয়ায় রাজধানীর ওপর চাপ দিন দিন বাড়ছে।’

রোববার (১৮ জানুয়ারি) গুলশানের সিক্স সিজনস হোটেলে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)-এর উদ্যোগে রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের অংশগ্রহণে ‘রাজনৈতিক চর্চায় পরিকল্পিত নগরায়ন’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।

মাহদী আমিন বলেন, ‘দেশের পরিবহন ব্যবস্থাকে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব করতে মাল্টিমোড পরিবহন ব্যবস্থাকে সংযুক্ত করার ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। বিএনপি ইতোমধ্যে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে এবং এ নিয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করবে।’

তিনি বলেন, ‘ইলেকট্রিক যানবাহন কীভাবে দেশে আনা যায়, পরিবেশবান্ধব যানবাহনের ব্যবহার কীভাবে বাড়ানো যায়- এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিগত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।’

বিএনপির এই নেতা বলেন, ‘ঢাকাসহ দেশের প্রায় প্রতিটি শহরে রিকশা ও সিএনজির সংখ্যা কম নয়। কিন্তু এসব যানবাহনকে একটি কার্যকর ফ্রেমওয়ার্কের আওতায় আনা যায়নি। বহু রিকশার নিবন্ধন নেই, নির্দিষ্ট রুট নেই, চালকদের অধিকারও সুরক্ষিত নয়। একইভাবে সিএনজি ও মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রেও আলাদা আলাদা নীতিগত হস্তক্ষেপ দরকার। প্রতিটি পরিবহন মাধ্যমের জন্য পৃথক ও বাস্তবসম্মত নীতিমালা না থাকায় নগর ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ঢাকার আশপাশের শিল্পাঞ্চল যেমন নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, গাজীপুর ও নরসিংদীর সঙ্গে রাজধানীর কার্যকর আন্তঃসংযোগ গড়ে তোলা জরুরি।

‘বিশ্বের সব বড় শহরের সঙ্গে পার্শ্ববর্তী নগরগুলোর শক্তিশালী কানেক্টিভিটি থাকে। কিন্তু আমাদের দেশে ঢাকায় কাজ করতে এসে মানুষ ঢাকাতেই থেকে যায়। যদি ঢাকার বাইরে বসবাসের সুযোগ, অবকাঠামো ও সেবা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই রাজধানীর ওপর চাপ কমবে। এটাই প্রকৃত বিকেন্দ্রীকরণ’, বলেন মাহদী আমিন।

তিনি আরও বলেন, ‘কুমিল্লা পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলকে পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন করা গেলে শিল্প স্থানান্তর সম্ভব। ঢাকার খুব কাছেই ট্যানারির জন্য আলাদা শিল্পাঞ্চল করা হলেও এখনও ঢাকার ভেতরে ট্যানারি ও গার্মেন্টসসহ বহু কারখানা রয়েছে। সঠিক পরিকল্পনা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে এসব শিল্পকে বিকেন্দ্রীকরণ করা সম্ভব।’

এসময় পার্ক ও খেলার মাঠ সংকটের কথাও তুলে ধরেন বিএনপির এই নেতা। তিনি বলেন, ‘কাগজে-কলমে প্রতিটি ওয়ার্ডে খেলার মাঠ ও গ্রিনফিল্ড থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে তার কোনো বাস্তবায়ন নেই। এর অর্থ হলো নীতিমালা আছে, কিন্তু বাস্তবায়নের ঘাটতি রয়েছে। জমি দখল, খাল ও নদী দখল পুনরুদ্ধার করতে পারলে অনেক সমস্যার সমাধান সম্ভব। তবে এখানে সবচেয়ে বড় সংকট রাজনৈতিক অঙ্গীকারের অভাব।’

তিনি জানান, বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে ওয়ার্ড পর্যায়ে অন্তত একটি খেলার মাঠ নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পাবে।

‘থানা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে গ্রিনফিল্ড নিশ্চিত করে শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। খেলাধুলার জায়গা না থাকায় মাদক ও সামাজিক অবক্ষয় বাড়ছে। ঢাকা শহরে বর্তমানে সবচেয়ে বড় বিনোদন হয়ে উঠেছে রেস্টুরেন্টে খেতে যাওয়া, যা একটি বড় শহরের জন্য লজ্জাজনক। রাষ্ট্রের দায়িত্ব পরিবারবান্ধব বিনোদন অবকাঠামো গড়ে তোলা’, যোগ করেন তিনি।

মেগা প্রকল্পের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘অতীতে উন্নয়ন মানেই ছিল মেগা প্রকল্প ও মেগা দুর্নীতি। হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে ব্যাপক দুর্নীতি ও পরিবেশগত ক্ষতি হয়েছে। রূপপুর, রামপাল, বাঁশখালীর মতো প্রকল্পে জনগণের ক্ষমতায়নের বদলে একটি অলিগার্ক শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষা করা হয়েছে। এই সংস্কৃতি পরিবর্তন না করলে বাংলাদেশ এগোতে পারবে না।’

বিএনপির এই নেতা বলেন, ‘বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ‘আই হ্যাভ প্ল্যান’ শুধু একটি স্লোগান নয়। পরিকল্পনার সূচনা হয়েছিল ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকারের সময়, যখন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমবারের মতো আরবান প্ল্যানিং চালু হয়। দেশের পরিকল্পনায় দেশীয় বিশেষজ্ঞ ও পেশাজীবীদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। বিদেশি পরামর্শকের ওপর অতিনির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব মেধা ও দক্ষতা ব্যবহার করাই হবে স্বনির্ভর বাংলাদেশের পথ।’

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত বিকেন্দ্রীকরণের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বিএনপির লক্ষ্য এমন ব্যবস্থা গড়ে তোলা যাতে শিক্ষা বা চিকিৎসার জন্য কাউকে ঢাকায় আসতে না হয়। প্রতিটি স্কুলশিক্ষকের হাতে একটি করে ট্যাবলেট পৌঁছে দিয়ে সেরা কারিকুলাম ও প্রশিক্ষণ গ্রাম পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া হবে। স্বাস্থ্য খাতে ইউনিয়ন পর্যায় থেকে শুরু করে উপজেলা হাসপাতালগুলোকে পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর করতে হবে, যেখানে ডাক্তার, নার্স, ওষুধ, টেকনিশিয়ান ও যন্ত্রপাতি- সবকিছুর সমন্বয় থাকবে।’

নাগরিকের সমান অধিকার ও স্বাধীনতা নিয়ে মাহদী আমিন বলেন, ‘বিএনপি ইনক্লুসিভ ডেভেলপমেন্টে বিশ্বাস করে। উন্নয়ন হবে মানুষের দক্ষতা, যোগ্যতা ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করার জন্য। দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রত্যেক নাগরিকের সমান অধিকার ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করাই বিএনপির রাজনীতি। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে প্রয়োজন স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও নির্বাচিত সরকার। জনগণের ভোটই হবে রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকার একমাত্র উৎস। গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ একটি স্বর্ণালি সুযোগের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। আসন্ন নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হলে তারেক রহমানের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে পরিকল্পনাবিদ ও পেশাজীবীদের সামনে রেখে সবাই মিলে কাজ করা হবে।’

এএইচ/এএম