কাজী মুস্তাফিজ
০৯ জানুয়ারি ২০২৬, ০৫:৫৮ পিএম
প্রায় আট বছর ধরে বিএনপির ‘ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান’ হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন দলটির প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমান। ২০১৮ সাল থেকে দলীয় সিদ্ধান্তে তাকে এ দায়িত্বে আনা হয়। অবশেষে ‘ভারমুক্ত’ হয়ে দলের চেয়ারম্যান হতে যাচ্ছেন তিনি।
আজ শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) দলের স্থায়ী কমিটির ‘জরুরি বৈঠক’ ডাকা হয়েছে। রাত সাড়ে ৯টায় রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে বৈঠকটি হবে। সেখান থেকে আসতে পারে তারেক রহমানের চেয়ারম্যান পদের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা।
গত ৪ জানুয়ারি সিলেটে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, দুয়েক দিনের মধ্যেই তারেক রহমানকে বিএনপির চেয়ারম্যান নির্বাচিত করা হবে।
তারেক রহমান ১৭ বছরের বেশি সময় লন্ডনে রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকার পর শেষ পর্যন্ত গত ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন। এর মাধ্যমে তার দেশে ফেরাকে ঘিরে দলের ভেতরে ও বাইরে তৈরি হওয়া উদ্বেগের অবসান হয়।
দীর্ঘদিন নানা জটিল রোগে ভুগে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া গত ৩০ ডিসেম্বর ভোর ৬টায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুতে দলের ‘চেয়ারপারসন’ পদটি শূন্য হয়।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। তফসিল ঘোষণার আগে থেকেই বিএনপির অনেক প্রার্থী নির্বাচনি ব্যানার, ফেস্টুন, বিলবোর্ড, প্রচারপত্র তৈরি করেছেন। অনেকে ডিজিটাল পোস্টার-ব্যানার বানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করেছেন। এতে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ছবি রয়েছে। কিন্তু খালেদা জিয়ার মৃত্যুর কারণে বাস্তবতা পাল্টে গেছে।
সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা-২০২৫–এর বিধি ৭(চ) অনুযায়ী, ‘কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী কোনো নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল কর্তৃক মনোনীত হলে সে ক্ষেত্রে তিনি শুধু নিজের বর্তমান দলীয় প্রধানের ছবি ব্যানার, লিফলেট বা হ্যান্ড বিল ও ফেস্টুনে ছাপাতে পারবেন। ছবি পোর্ট্রেট আকারে হতে হবে এবং তা কোনো অনুষ্ঠান ও জনসভায় নেতৃত্বদান বা প্রার্থনারত অবস্থায় বা ভঙ্গিমায় ছাপানো যাবে না।’
বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্বয়ংক্রিয়ভাবে চেয়ারম্যানের দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছেন। যদিও দলের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি, আবার এই পদ ব্যবহারও করা হচ্ছে না। এ অবস্থায় দলীয় প্রার্থীর প্রচারের ব্যানার-ফেস্টুনে কার ছবি ব্যবহার করা যাবে, সেটা এখনো মীমাংসিত হয়নি।
বিএনপির এক নেতা বলেন, বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর দলের ভেতরে এখন সবচেয়ে সংবেদনশীল প্রশ্ন—নির্বাচনি প্রচারের ব্যানার, ফেস্টুন, বিলবোর্ড, প্রচারপত্রে এবং ডিজিটাল পোস্টারে কার ছবি যাবে। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সঙ্গে আলোচনা করে এ বিষয়ে দ্রুত সমাধানে আসতে হবে বিএনপি নেতৃত্বকে।
এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ সম্প্রতি গণমাধ্যমে বলেন, নির্বাচনি পোস্টারে দলীয় প্রধানের ছবি ছাপানোর বিষয় আছে। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা নিতে হবে, আমরা শিগগির কমিশনে যাব।
দেশের প্রথম সামরিক শাসক ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বড় সন্তান তারেক রহমান ১৯৬৫ সালের ২০ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন।
ঢাকার বিএএফ শাহীন কলেজে প্রাথমিক পড়াশোনা শেষে করে আশির দশকে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে ভর্তি হন বলে তার দলের ওয়েবসাইটে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু তিনি সেখানে পড়াশোনা শেষ করেছিলেন কি-না সেই সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
বিএনপির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মুক্তিযুদ্ধের সময় আরও অনেক সামরিক কর্মকর্তা পরিবারের সঙ্গে জিয়াউর রহমানের পরিবারকেও বন্দি করা হয়েছিল। তখন তাদের দুই ছেলে তারেক রহমান ও প্রয়াত আরাফাত রহমানও বন্দি ছিলেন।
দলের ওয়েবসাইটে থাকা তথ্য অনুযায়ী, সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সময় তারেক রহমানও তার মায়ের সঙ্গে রাজপথের আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন এবং ওই সময় ১৯৮৮ সালে বগুড়া জেলা বিএনপির গাবতলী উপজেলা ইউনিটের সদস্য হিসেবে তিনি আনুষ্ঠানিক বিএনপিতে সক্রিয় হন।
যদিও দলের কয়েকজন শীর্ষনেতা জানিয়েছেন, তারেক রহমানের দলীয় রাজনীতির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছিলো ১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে এবং সেই সময় খালেদা জিয়া যে পাঁচটি আসনে নির্বাচন করেছিলেন তিনি সেগুলোর দেখভাল করেছিলেন। তবে দলের রাজনীতিতে তার শক্ত প্রভাব শুরু হয়ে ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে। ওই নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোট দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ বলছেন, ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে হাওয়া ভবন নেওয়া হয়েছিল নির্বাচনি অফিস হিসেবে ব্যবহার করে প্রচার প্রচারণা চালানো ও নির্বাচনি কৌশল নিয়ে কাজ করার জন্য, যাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন তারেক রহমান।
মাহবুব উল্লাহ বলেন, ‘নির্বাচনে জয়লাভের পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার হলো। কিন্তু হাওয়া ভবন থেকে গেলো এবং এ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হলো। এরপর ওয়ান ইলেভেনের পর গ্রেফতার, নির্যাতন ও কারাভোগ শেষে তাকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হলো।’
তবে মূলত ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনের সময়ই দলের ভেতরে সক্রিয় হয়ে উঠতে থাকেন তারেক রহমান। পরে ২০০২ সালের ২২ জুন দলের মধ্যে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব পদ তৈরি করে তাকে ওই পদে অধিষ্ঠিত করা হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘এটাই ছিলো দলের রাজনীতিতে তার বড় উল্লম্ফন। জিয়া পরিবারের সদস্য হিসেবেই এটা তিনি পেয়েছেন। তাকে ঘিরে পরে দলের মধ্যে একটি প্যারালাল নেতৃত্ব বলয় তৈরি হয়েছিল।’
এরপর ২০০৯ সালে দলের সম্মেলনে তারেক রহমানকে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান করা হয়। সেই ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সালে দুর্নীতির মামলায় খালেদা জিয়া জেলে যাওয়ার পরপরই তাকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা করে বিএনপি।
ক.ম/