Dhaka Mail Logo

মতামত

মতের অমিল মানেই বিরোধিতা নয়

০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০৬:২৪ এএম

বাংলাদেশ ক্যাটারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএ) ১৯তম অ্যাওয়ার্ডস ও গালা ডিনার অনুষ্ঠানে চ্যানেল এস-এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান মাহি ফেরদৌস জলিল কয়েকটি অনলাইন মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সাংবাদিকদের সম্পর্কে কিছু মন্তব্য করেন। 

তার বক্তব্যের কিছু শব্দচয়নকে অনেকে অনুপযুক্ত ও অবমাননাকর হিসেবে বিবেচনা করেছেন। বিষয়টি যুক্তরাজ্যের ব্রিটিশ-বাংলাদেশি সাংবাদিক মহলে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দেয়। পরবর্তী সময়ে লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাব এক বিবৃতিতে তার মন্তব্যের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানায়।

একই সময়ে তার বক্তব্যকে কেন্দ্র করে যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন কমিউনিটি ও ব্যবসায়িক অ্যাওয়ার্ডের স্বচ্ছতা, নির্বাচনপ্রক্রিয়া এবং ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিকীকরণ নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। আমার মতে, তিনি যেসব উদ্বেগের কথা তুলে ধরেছেন, সেগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তবে সেই উদ্বেগ প্রকাশের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত ভাষাও সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়।

মাহি ফেরদৌস জলিলকে আমি বরাবরই যুক্তরাজ্যের ব্রিটিশ-বাংলাদেশি কমিউনিটির একজন স্পষ্টভাষী ও স্বাধীনচেতা ব্যক্তি হিসেবে দেখে আসছি। তার কথা বলার ধরন এবং যুক্তি উপস্থাপনের ভঙ্গি অন্যদের তুলনায় কিছুটা ব্যতিক্রম। তার সাম্প্রতিক বক্তব্যের পেছনের প্রেক্ষাপট জানার বিষয়ে আমার বিশেষ আগ্রহ ছিল। তাই আমি সরাসরি তার সঙ্গে কথা বলেছি।

আমাদের আলাপকালে তিনি জানান, পার্ক প্লাজায় অনুষ্ঠিত বিসিএ অ্যাওয়ার্ডসে দেওয়া বক্তব্যটি পরবর্তী সময়ে পুনর্বিবেচনা করে তিনি নিজের শব্দচয়নে কিছু ভুল খুঁজে পেয়েছেন। কাউকে ব্যক্তিগতভাবে কষ্ট দেওয়া বা আঘাত করা তার উদ্দেশ্য ছিল না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েকজন কনটেন্ট ক্রিয়েটরের কাছ থেকে বারবার উত্তেজক প্রশ্ন আসায় তিনি কিছুটা বিরক্ত ও উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলেন। বাংলা ও ইংরেজি মিলিয়ে কথা বলতে গিয়ে বক্তব্যের ধারাবাহিকতা হারিয়ে ফেলেন এবং যথাযথ শব্দচয়ন করতে পারেননি।

তিনি আরও স্পষ্ট করেন, তার সমালোচনা পেশাদার সাংবাদিক বা রিপোর্টারদের উদ্দেশে ছিল না। বরং যাদের তিনি 'তথাকথিত কনটেন্ট ক্রিয়েটর' বলে উল্লেখ করেছেন, তাদের উদ্দেশ্য ছিল, পেশাগত মান বজায় রাখার পরিবর্তে মূলত লাইক, শেয়ার ও দর্শকসংখ্যা বাড়ানো।

তিনি নিজের ভুল স্বীকার করে দুঃখ প্রকাশ করেছেন—এ বিষয়টিকে আমি ইতিবাচকভাবে দেখি। অনুপযুক্ত শব্দচয়নের দায় স্বীকার করার মানসিকতা ব্যক্তিত্ব ও পরিপক্বতার পরিচয় বহন করে।

বিসিএ অ্যাওয়ার্ডস ও স্বচ্ছতার প্রশ্ন, আমি বিসিএর প্রেসিডেন্ট অলি খান ওবিইর সঙ্গেও কথা বলেছি। তিনি অনুষ্ঠানটির আয়োজন ও সামগ্রিক সাফল্য নিয়ে আশাবাদী ও আত্মবিশ্বাসী বলে জানিয়েছেন। আমি তাকে সরাসরি প্রশ্ন করেছিলাম, অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে কি সব সাংবাদিককে আমন্ত্রণ জানানো বা অন্তর্ভুক্ত করার কোনো বাধ্যবাধকতা রয়েছে?

তার বক্তব্যের সারমর্ম ছিল, আয়োজকেরা পেশাদার সম্পাদক ও সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের আমন্ত্রণ জানানোর চেষ্টা করেন। তবে এ ক্ষেত্রে বাস্তব কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে।

একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের কাছ থেকেও আমি জানতে পেরেছি, তাদের পক্ষ থেকে আমন্ত্রণের জন্য কয়েকজনের নাম পাঠানো হয়েছিল। বিভিন্ন ব্যক্তির প্রত্যাশা পূরণ করা এবং আমন্ত্রণসংক্রান্ত অনুরোধ সামলানো আয়োজকদের জন্য নিঃসন্দেহে একটি চ্যালেঞ্জ।

তবে আমার বিশ্বাস, আমন্ত্রণনীতি ও নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা দেওয়া হলে অপ্রয়োজনীয় ভুল-বোঝাবুঝি অনেকটাই কমে আসবে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ব্রিটিশ-বাংলাদেশি কমিউনিটিতে গত কয়েক বছরে বিভিন্ন কমিউনিটি ও ব্যবসায়িক অ্যাওয়ার্ডের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর পাশাপাশি এসব আয়োজনের স্বচ্ছতা ও বাণিজ্যিক স্বার্থের প্রভাব নিয়ে যৌক্তিক প্রশ্নও উঠেছে।

যোগ্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া অবশ্যই প্রশংসনীয়। তবে একটি গ্রহণযোগ্য অ্যাওয়ার্ড আয়োজনের ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় থাকা জরুরি:

১. মনোনয়ন ও মূল্যায়নের সুস্পষ্ট এবং প্রকাশ্য মানদণ্ড।
২. স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও যোগ্য বিচারক প্যানেল।
৩. নির্বাচনপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও যথাযথ জবাবদিহি।

এগুলো আয়োজকদের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়; বরং কমিউনিটির প্রতিষ্ঠানগুলোর গ্রহণযোগ্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ানোর জন্য যুক্তিসংগত প্রত্যাশা। পার্ক প্লাজায় আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা। সেদিন আমি পার্ক প্লাজায় উপস্থিত ছিলাম এবং মাহি ফেরদৌস জলিলকে ঘিরে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, তা প্রত্যক্ষ করেছি।

আমার পর্যবেক্ষণে, কয়েকজন কনটেন্ট ক্রিয়েটর তাকে বারবার প্রশ্ন করছিলেন। শুরুতে তিনি তাদের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলেন। কিন্তু একপর্যায়ে তার মতামত তাদের প্রত্যাশার সঙ্গে না মেলায় পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে এবং আলোচনার পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

আমি আরও লক্ষ্য করেছি, তিনি কয়েকবার আলোচনা শেষ করে সেখান থেকে চলে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কয়েকজন কনটেন্ট ক্রিয়েটর তাকে অনুসরণ করে প্রশ্ন করতে থাকেন।

বিষয়টি আমার কাছে অত্যন্ত হতাশাজনক মনে হয়েছে। কারও সঙ্গে মতের অমিল থাকলেই তাকে অস্বস্তিকর বা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলা সমর্থনযোগ্য নয়। অন্যরা একমত না হলেও প্রত্যেকের নিজের মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকা প্রয়োজন।

সাংবাদিকতায় প্রশ্ন ও সমালোচনা অপরিহার্য। তবে এর সঙ্গে পেশাগত সৌজন্য ও পারস্পরিক সম্মানও বজায় রাখতে হবে। মতবিরোধের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত আলোচনা ও যুক্তির মাধ্যমে বিষয়টি পরিষ্কার করা, শত্রুতা তৈরি করা নয়।

সাংবাদিকতা ও কনটেন্ট ক্রিয়েশন এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। কনটেন্ট ক্রিয়েশন ও পেশাদার সাংবাদিকতা সব ক্ষেত্রে এক বিষয় নয়। কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের ভিডিও তৈরি ও নিজেদের মতামত প্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে। তবে পেশাদার সাংবাদিকতার দায়িত্ব আরও বিস্তৃত। তথ্য যাচাই, ঘটনার প্রেক্ষাপট বোঝা, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নেওয়া এবং তথ্যের নির্ভুলতা বজায় রাখা পেশাদার সাংবাদিকতার মৌলিক দায়িত্ব।

একইভাবে, সব কনটেন্ট ক্রিয়েটর অপেশাদার নন। আবার সাংবাদিক পরিচয় থাকলেই কেউ স্বয়ংক্রিয়ভাবে পেশাগত মানদণ্ড পূরণ করেন না।

দুঃখজনক হলেও সত্য, কিছু ব্যক্তির দায়িত্বহীন আচরণ প্রকৃত পেশাদার সাংবাদিক ও রিপোর্টারদের সামগ্রিক ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। লাইক, শেয়ার ও দর্শকসংখ্যা বাড়ানোর প্রতিযোগিতা কখনোই তথ্যের নির্ভুলতা, ন্যায্যতা ও দায়িত্বশীলতার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে না। আমার বিশ্বাস, একজন ব্যক্তির পেশাদারত্ব তার পরিচয়ের চেয়ে কাজের মান, তথ্যের নির্ভুলতা ও আচরণের মাধ্যমে বিচার করা উচিত।

ভুল স্বীকার করা দায়িত্বশীলতার পরিচয়। মানুষ মাত্রই ভুল করতে পারে। বিরক্তি, উত্তেজনা কিংবা আবেগের মুহূর্তে কেউ অনিচ্ছাকৃতভাবে এমন কিছু শব্দ ব্যবহার করতে পারেন, যা তার প্রকৃত উদ্দেশ্য বা বক্তব্যকে যথাযথভাবে প্রকাশ করে না। অনেক সময় এটিকে 'স্লিপ অব টাং' বা অনিচ্ছাকৃত শব্দচয়ন বলা হয়। তবে এর অর্থ এই নয় যে, কেউ নিজের বক্তব্যের দায় এড়িয়ে যেতে পারেন। একই সঙ্গে ভুলের প্রেক্ষাপট এবং পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আচরণও বিবেচনা করা উচিত।

মাহি ফেরদৌস জলিলের সঙ্গে আমার আলাপকালে তিনি নিজের শব্দচয়নের ভুল স্বীকার করেছেন এবং দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তিনি পুনরায় উল্লেখ করেছেন যে, কাউকে ব্যক্তিগতভাবে আঘাত করা তার উদ্দেশ্য ছিল না।

আমার মতে, কেউ নিজের ভুল উপলব্ধি করে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করলে সেই ক্ষমা প্রার্থনাকে উদারতার সঙ্গে গ্রহণ করার মানসিকতা আমাদের থাকা উচিত।

ক্ষমা চাওয়া মানেই সমালোচনার অধিকার শেষ হয়ে যাওয়া নয়। তবে স্বীকার করা একটি ভুলকে অনন্তকাল বিতর্কের বিষয় বানিয়ে রাখাও সমীচীন নয়। ক্ষমা, সহনশীলতা ও পারস্পরিক বোঝাপড়াও একটি পরিণত কমিউনিটির গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।

অন্ধ আনুগত্য নয়, প্রয়োজন আত্মসমালোচনা। আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস, রাজনীতি, সমাজনীতি কিংবা কমিউনিটি সংগঠন—কোনো ক্ষেত্রেই অন্ধ আনুগত্য সুস্থ পরিবেশ তৈরি করতে পারে না।

কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। ভালো কাজের প্রশংসা করতে হবে, আবার ভুল হলে তা স্বীকার করে সংশোধনের উদ্যোগও নিতে হবে। সমালোচনা হওয়া উচিত গঠনমূলক, ন্যায়সংগত ও যথাযথ পদ্ধতিতে। এর উদ্দেশ্য কাউকে ব্যক্তিগতভাবে অপমান করা নয়; বরং সংশোধন ও উন্নতির সুযোগ তৈরি করা।

দুঃখজনকভাবে, আমাদের কমিউনিটির অনেক মানুষ ব্যক্তিগত সম্পর্ক, সামাজিক চাপ কিংবা বিতর্কের আশঙ্কায় প্রকাশ্যে কথা বলতে দ্বিধা করেন। ফলে গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয় যথাযথ গুরুত্ব পায় না। আমাদের সত্য কথা বলার সাহস যেমন প্রয়োজন, তেমনি অন্যের অস্বস্তিকর বা ভিন্নমতের বক্তব্য শোনার মানসিকতাও প্রয়োজন।

শেষ কথা, মাহি ফেরদৌস জলিলের সব বক্তব্যের সঙ্গে আমি একমত নই। তার কিছু শব্দচয়ন অবশ্যই সমালোচনার দাবি রাখে। তবে অ্যাওয়ার্ড আয়োজন, পেশাদার মানদণ্ড ও স্বচ্ছতা নিয়ে তিনি যেসব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন, সেগুলোকে শুধু তার বক্তব্য ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কের কারণে উপেক্ষা করা উচিত নয়। আমি পার্ক প্লাজার সেদিনের ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছি, তার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলেছি এবং তার ব্যাখ্যা শুনেছি। তাই আমার এই অবস্থান নিজের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ও তার সঙ্গে সরাসরি আলাপের ভিত্তিতে তৈরি।

আমি কাউকে অন্ধভাবে সমর্থন করতে চাই না। একইভাবে, একজন ব্যক্তির একটি ভুলের কারণে তার সব যুক্তি বা যৌক্তিক প্রশ্নকে বাতিল করে দেওয়াও সমর্থন করি না।

সাংবাদিকতা যেন শুধু লাইক, শেয়ার ও দর্শকসংখ্যা বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় পরিণত না হয়। অ্যাওয়ার্ড যেন ব্যক্তিগত সম্পর্ক কিংবা বাণিজ্যিক স্বার্থের পরিবর্তে প্রকৃত যোগ্যতা ও অবদানকে স্বীকৃতি দেয়। সর্বোপরি, আমাদের কমিউনিটিকে ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শিখতে হবে।

আমার কাছে প্রকৃত সততার অর্থ হলো সত্যকে সত্য বলার সাহস রাখা, ভুলকে ভুল হিসেবে স্বীকার করা এবং নিজের পছন্দের মানুষের ভুল হলেও তা মেনে নেওয়ার নৈতিক শক্তি থাকা। আত্মসমালোচনা দুর্বলতা নয়; বরং উন্নতির ভিত্তি। সততা, জবাবদিহি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার মাধ্যমেই একটি শক্তিশালী, সুস্থ ও দায়িত্বশীল কমিউনিটি গড়ে তোলা সম্ভব।

এআরএম