বাংলাদেশের আজকের রাজনীতির দিকে তাকালে এই প্রবাদটি অনেকটাই প্রাসঙ্গিক বলে মনে হয়। দেশের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, স্বাধীনতার চেতনা, গণতন্ত্রের মূল্য—এই পরিষ্কার পানির কথা সবাই বলেন, সবাই এর অংশীদার হতে চান। কিন্তু সেই পানি পান করার সময়ই যেন অনেকে সেটিকে ঘোলা করে ফেলেন।
যারা ক্ষমতায় আসেন, তারা জনকল্যাণ, ন্যায়বিচার ও দেশের উন্নতির কথা বলেন। জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেন। অর্থাৎ তারা যেন পরিষ্কার ঝরনার পানি পান করার সুযোগ পান।
কিন্তু ক্ষমতার কাছে যাওয়ার পরই অনেক সময় সেই পানিতে মাটি মিশে যায়। নিজেদের স্বার্থ, পরিবার ও অনুগামীদের প্রভাব বাড়ানো, ক্ষমতাকে ধরে রাখার চেষ্টা—এসবের কারণে নীতি ও আদর্শও অনেক সময় প্রশ্নের মুখে পড়ে।
কেউ গণতন্ত্রের কথা বলেন, অথচ ভিন্নমতের স্বাধীনতা সংকুচিত হয়। কেউ সমতার কথা বলেন, কিন্তু নিজের শ্রেণি বা ঘনিষ্ঠদের জন্য আলাদা সুবিধা তৈরি হয়। কেউ উন্নয়নের গল্প শোনান, কিন্তু সেই উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় কতটা পৌঁছেছে, সেটিও প্রশ্নের বিষয়।
সবচেয়ে দুঃখজনক হলো—এক পক্ষ অন্য পক্ষের ভুল দেখাতে ব্যস্ত, কিন্তু নিজের হাতে ঘোলা করা পানির কথা স্বীকার করতে চায় না। অথচ পানি তো একই। দেশও একই। জনগণও একই।
তাই প্রশ্ন ওঠে—যারা এই পানি থেকেই পান করবেন, তারা কেন সেটিকে নিজেরাই নষ্ট করবেন?
আমাদের মনে রাখতে হবে, এই রাষ্ট্র কারও একার নয়। এটি জনগণের, এবং আগামী প্রজন্মেরও। আজ রাজনৈতিক সুবিধার জন্য যে পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে, তার প্রভাব শুধু আজকের মানুষ নয়, আগামী দিনের বাংলাদেশকেও বহন করতে হবে।
আমাদের প্রয়োজন এমন নেতৃত্ব, যারা পানি পান করবেন, কিন্তু ঘোলা করবেন না। যারা দেশ থেকে নেবেন, তার চেয়ে বেশি ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবেন। যাদের কাছে ক্ষমতার চেয়ে জনগণের স্বার্থ বড় হবে, ব্যক্তিগত স্বার্থ নয়। যারা ভিন্নমতকে শত্রুতা হিসেবে দেখবেন না এবং রাষ্ট্রকে দলীয় বা ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে রাখতে পারবেন।
কারণ পরিষ্কার পানি থাকলে সবাই পান করতে পারে। আর পানি ঘোলা করলে শেষ পর্যন্ত কেউই নিরাপদ থাকে না।
আরও পড়ুন: সংকটে বাংলাদেশ: পথ ও প্রত্যাশা
আমার এই উষ্মা প্রকাশ বাংলাদেশের সামগ্রিক রাজনীতির বাস্তব প্রেক্ষাপট ও আমার দীর্ঘশ্বাস। ইহা কোন একক রাজনৈতিক দলের মাধ্যমে সংঘটিত হয়নি, ইহা সংগঠিত হয়েছে সকল রাজনৈতিক দলের অপরাধনীতির মাধ্যমে।যখন কোনো যৌথ সামগ্রিক সার্বজনীন পরিস্থিতি, সামাজিক রাজনৈতিক অসঙ্গতি বা পারিপার্শ্বিক অন্যায় নিয়ে আমরা ক্ষুব্ধ হই, তখন সেই অনুভূতিটা আসলে অনেকেরই প্রতিনিধিত্ব করে। আমি হয়তো একা প্রকাশ করেছি, কিন্তু পেছনে রয়েছে আরও অনেকের না বলা কথা।
বাংলাদেশের রাজনীতির সামনে আজ তাই একটি সহজ প্রশ্ন—আমরা কি পরিষ্কার পানি পান করার পাশাপাশি সেটিকে পরিষ্কার রাখার দায়িত্বটুকুও নিতে পারব?
ফ্রিল্যান্স জার্নালিস্ট, চিপ এডিটর thesylhetpost.com ভাইস প্রেসিডেন্ট- বাংলাদেশ হিউম্যান রাইট কমিশন ইংল্যান্ড।
এআরএম




