ঢাকা মেইল ডেস্ক
০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০৩:৪১ পিএম
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) আবাসিক প্লট বরাদ্দের ক্ষেত্রে বিদ্যমান বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশাভিত্তিক কোটা পদ্ধতি নতুন করে পর্যালোচনা করা জরুরি। রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে নাগরিকদের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করে বিশেষ শ্রেণির জন্য অতিরিক্ত সুবিধার ব্যবস্থা কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। সংবিধান যখন নাগরিকের আইনি সমতা ও সুযোগের সমতার নীতি স্বীকার করেছে, তখন সরকারি পদমর্যাদা, পেশাগত পরিচয় কিংবা রাজনৈতিক প্রভাবের ভিত্তিতে বিশেষ আবাসন সুবিধা দেওয়ার যৌক্তিকতা কী—সেটি বিবেচনা করা প্রয়োজন।
রাজউকের প্লট সাধারণ কোনো উপহার নয়। এগুলো রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বাধীন সীমিত জমি, যা পরিকল্পিত নগরায়ণ ও আবাসনব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হওয়ার কথা। এসব প্লট বরাদ্দের ক্ষেত্রে ন্যায্যতা, স্বচ্ছতা ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। অথচ বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার নামে প্লট সংরক্ষণের ব্যবস্থা সাধারণ নাগরিকদের জন্য উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার সুযোগ সংকুচিত করছে।
বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী। ১৯(১) অনুচ্ছেদে নাগরিকদের জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। একই অনুচ্ছেদের ২ নম্বর দফায় সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করা এবং নাগরিকদের মধ্যে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করার রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের কথা উল্লেখ রয়েছে। অন্যদিকে ২৮(১) অনুচ্ছেদে ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের ভিত্তিতে বৈষম্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
তবে সাংবিধানিক সমতার অর্থ সব ক্ষেত্রে সবাইকে একই ধরনের সুবিধা দেওয়া নয়। সংবিধানের ২৮(৪) অনুচ্ছেদে নারী, শিশু ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর অগ্রগতির জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ রাখা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য প্রকৃত বঞ্চনা ও বৈষম্য দূর করে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে সমান সুযোগের পর্যায়ে নিয়ে আসা।
সুতরাং প্রকৃত অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জন্য যুক্তিসংগত বিশেষ ব্যবস্থা এবং সরকারি কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, বিচারক, পেশাজীবী কিংবা বিত্তশালী শ্রেণির জন্য পেশা ও পদমর্যাদাভিত্তিক বিশেষ সুবিধা এক বিষয় নয়। প্রথমটির পেছনে সামাজিক ন্যায়বিচার ও বৈষম্য দূর করার সাংবিধানিক উদ্দেশ্য রয়েছে। কিন্তু দ্বিতীয়টির ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধার যৌক্তিকতা, প্রয়োজনীয়তা ও জনস্বার্থের ভিত্তি স্পষ্ট হওয়া জরুরি।
একজন সরকারি কর্মকর্তা বা জনপ্রতিনিধি রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর জন্য সরকারি বেতন, ভাতা, পেনশনসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা রয়েছে। একইভাবে একজন শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, ব্যবসায়ী কিংবা বেসরকারি চাকরিজীবী নিজ নিজ ক্ষেত্রে অবদান রাখেন। কিন্তু তাদের পেশাগত পরিচয় কেন রাষ্ট্রীয় জমি পাওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ অধিকার তৈরি করবে?
রাষ্ট্রীয় সম্পদে নাগরিকের অধিকার নির্ধারিত হওয়া উচিত স্বচ্ছ, অভিন্ন ও যুক্তিসংগত যোগ্যতার ভিত্তিতে; পদমর্যাদা কিংবা প্রভাবের ভিত্তিতে নয়।
২০২৪ সালের ২৮ এপ্রিল প্রকাশিত ‘রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (ভূমি, প্লট, স্পেস ও ফ্ল্যাট বরাদ্দ) বিধিমালা, ২০২৪’-এ বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার জন্য নির্দিষ্টসংখ্যক আবাসিক প্লট সংরক্ষণের সুযোগ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা, প্রতিবন্ধী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, সংখ্যালঘু, বিচারপতি, সংসদ সদস্য, সামরিক ও বেসামরিক সরকারি কর্মচারী, সাংবাদিক, শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, আইনজীবী, শিল্পী, সাহিত্যিক ও ক্রীড়াবিদসহ বহু শ্রেণির নাম রয়েছে। একই সঙ্গে রাজউক ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের জন্যও নির্দিষ্ট হারে কোটা সংরক্ষণের বিধান রয়েছে।
এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে—এসব শ্রেণির মধ্যে কারা প্রকৃতপক্ষে বিশেষ সহায়তার প্রয়োজন রাখেন? একজন অসচ্ছল, প্রতিবন্ধী ও আবাসনবঞ্চিত নাগরিকের প্রয়োজনের সঙ্গে একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা কিংবা আর্থিকভাবে সচ্ছল ব্যবসায়ীর আবাসন চাহিদা নিশ্চয়ই এক নয়।
মুক্তিযোদ্ধা, প্রতিবন্ধী কিংবা প্রকৃত অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ সহায়তার বিষয়টি সামাজিক ন্যায়বিচারের আলোকে বিবেচনা করা যেতে পারে। কিন্তু কেবল পেশাগত পরিচয়ের কারণে একজন ব্যক্তি রাষ্ট্রীয় জমি পাওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণ নাগরিকের চেয়ে অগ্রাধিকার পাবেন—এমন নীতির পক্ষে শক্তিশালী জনস্বার্থভিত্তিক যুক্তি থাকা প্রয়োজন।
রাষ্ট্রীয় আবাসন সুবিধা যদি সামাজিক ন্যায়বিচারের উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়, তাহলে তা আর্থিক সক্ষমতা, আবাসন পরিস্থিতি, প্রকৃত প্রয়োজন ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নির্ধারিত হওয়া উচিত। পেশাগত পরিচয়কে বিশেষ সুবিধার প্রধান ভিত্তি করা উচিত নয়।
রাজউকের প্লট বরাদ্দ নিয়ে অতীতে বিভিন্ন সময়ে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে ২০২৫ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫-এর একটি রায় রাষ্ট্রীয় জমি বরাদ্দের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্নে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে প্লট বরাদ্দসংক্রান্ত তিনটি দুর্নীতি মামলার রায় ঘোষণার সময় বিচারক মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন রাজউক ও গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দপ্রক্রিয়া নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দেন।
২৭ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে প্রকাশিত দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে আদালতের পর্যবেক্ষণের ইংরেজি ভাষ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, রাজউক সরকারি জমি বরাদ্দের ক্ষেত্রে আইন ও বিধিবিধান ধারাবাহিকভাবে এবং ইচ্ছাকৃতভাবে লঙ্ঘন করেছে। চেয়ারম্যান ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বাধ্যতামূলক শর্ত উপেক্ষা করে এবং প্রক্রিয়াগত সুরক্ষা অনুসরণ না করে বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের অনুকূলে আবেদন প্রক্রিয়াকরণ করেছেন।
আদালতের পর্যবেক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যের বাংলা ভাবানুবাদ হলো—আইনগত বাধ্যবাধকতাকে এভাবে উপেক্ষা করা সংবিধানকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, আইনের শাসনকে ব্যাহত করে এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদকে ব্যক্তিগত সুবিধা ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার উপকরণে পরিণত করে।
আদালত বিশেষ শ্রেণির বরাদ্দের অপব্যবহারের বিষয়টিও উল্লেখ করেন। আইনে কিছু সীমিত ব্যতিক্রমের সুযোগ থাকলেও যথাযথ নথিপত্র, যাচাই-বাছাই এবং যোগ্যতার শর্ত অনুসরণ না করে বরাদ্দ দেওয়াকে ক্ষমতার গুরুতর অপব্যবহার হিসেবে পর্যবেক্ষণে তুলে ধরা হয়।
গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা নিয়েও আদালত প্রশ্ন তোলেন। মন্ত্রণালয় রাজউকের কার্যক্রম যথাযথভাবে তদারকি করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং বিশেষ শ্রেণির বরাদ্দের ক্ষেত্রে সুপারিশের মাধ্যমে রাজউকের বিধিবদ্ধ প্রক্রিয়ায় অনুচিত প্রভাব বিস্তার করেছে বলে পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়।
আদালতের নির্দেশনার মধ্যে ছিল—
১. বেআইনিভাবে বরাদ্দ প্রক্রিয়াকরণ বা অনুমোদনের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে বিভাগীয় ও ফৌজদারি তদন্তের ব্যবস্থা করা।
২. সংশ্লিষ্ট সময়ে দেওয়া সব বরাদ্দের ওপর নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, নগর পরিকল্পনাবিদ ও দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সমন্বয়ে স্বাধীন কমিটির মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ ফরেনসিক অডিট করা।
৩. প্লট বরাদ্দে সম্পূর্ণ ডিজিটাল লটারি চালু করা। এর সঙ্গে সরাসরি সম্প্রচার, নিরাপদ ডিজিটাল রেকর্ড এবং এনক্রিপ্টেড নির্বাচনব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
৪. বেআইনিভাবে বরাদ্দ পাওয়া এবং একাধিক প্লট গ্রহণের ঘটনা শনাক্ত করতে অতীতের বরাদ্দ পর্যালোচনা করা।
৫. পুনরুদ্ধার করা প্লট ভূমিহীন নাগরিক ও যোগ্য আবেদনকারীদের মধ্যে পুনরায় বরাদ্দ দেওয়া।
৬. সরকারের বিশেষ সুপারিশনীতি বাতিল করা এবং চলমান বিশেষ শ্রেণির সুপারিশ বাতিল করে এ ধরনের নতুন সুপারিশের মাধ্যমে বরাদ্দ বন্ধ করা।
৭. ভূমিহীন, নিম্ন আয়ের মানুষ, অসহায় পরিবার, একক মা ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মতো প্রকৃত প্রয়োজনীয় জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দিয়ে পয়েন্টভিত্তিক যোগ্যতা নির্ধারণের ব্যবস্থা করা।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। আদালতের এসব পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনা বিশেষ সুপারিশনির্ভর বরাদ্দের অপব্যবহার বন্ধ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের সঙ্গে সম্পর্কিত। এগুলোকে ২০২৪ সালের বিধিমালায় উল্লিখিত প্রতিটি পেশাভিত্তিক কোটা সরাসরি বাতিলের চূড়ান্ত বিচারিক ঘোষণা হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না। তবে পেশা ও প্রভাবের ভিত্তিতে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার প্রচলিত ব্যবস্থাকে পুনর্বিবেচনার জন্য আদালতের পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছে।
আদালতের পর্যবেক্ষণ থেকে স্পষ্ট যে রাষ্ট্রীয় সম্পদ বরাদ্দের ক্ষেত্রে বিশেষ ক্ষমতা, সুপারিশ ও প্রশাসনিক প্রভাবের সুযোগ থাকলে তা অপব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কোনো ব্যক্তি বা শ্রেণির বিরুদ্ধে সামগ্রিক অভিযোগ না তুলে বরাদ্দব্যবস্থাকে এমনভাবে সাজানো প্রয়োজন, যাতে অনিয়মের সুযোগই সীমিত হয়ে আসে।
বিশেষ করে রাজনৈতিক পরিচয়, প্রশাসনিক পদমর্যাদা কিংবা ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে প্লট পাওয়ার সুযোগ বন্ধ করতে হবে। কোনো ব্যক্তি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন—এটি অবশ্যই সম্মানের বিষয়। কিন্তু সেই সম্মানের প্রতিদান হিসেবে সরকারি জমি বরাদ্দ দেওয়া রাষ্ট্রীয় সম্পদের ন্যায্য বণ্টনের নীতি হতে পারে না।
রাজউকের প্লট বরাদ্দে একটি অভিন্ন, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক নীতিমালা প্রণয়ন করা প্রয়োজন।
প্রথমত, পেশা, রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রশাসনিক পদমর্যাদার ভিত্তিতে প্রচলিত বিশেষ কোটা বাতিল করতে হবে। তবে প্রকৃত অনগ্রসর, প্রতিবন্ধী ও বিশেষ সহায়তাপ্রয়োজনীয় জনগোষ্ঠীর জন্য সংবিধানসম্মত, যুক্তিসংগত ও যাচাইযোগ্য বিশেষ ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, সব যোগ্য নাগরিকের জন্য উন্মুক্ত আবেদনপ্রক্রিয়া চালু করতে হবে। আবেদনকারীর আর্থিক সক্ষমতা, ঢাকায় নিজস্ব আবাসন আছে কি না, প্রকৃত আবাসন প্রয়োজন এবং পূর্বে সরকারি আবাসন সুবিধা পেয়েছেন কি না—এসব বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে।
তৃতীয়ত, যোগ্য আবেদনকারীর সংখ্যা প্লটের তুলনায় বেশি হলে স্বচ্ছ ডিজিটাল লটারির মাধ্যমে বরাদ্দ দিতে হবে। লটারির প্রক্রিয়া সরাসরি সম্প্রচার, স্বাধীন পর্যবেক্ষণ এবং নিরীক্ষাযোগ্য ডিজিটাল রেকর্ডের আওতায় আনতে হবে।
চতুর্থত, আবেদনকারী ও বরাদ্দপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের তালিকা, যোগ্যতার ভিত্তি, প্লটের অবস্থান, আয়তন এবং বরাদ্দমূল্য জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা বজায় রেখেও প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব।
পঞ্চমত, অতীতের বরাদ্দগুলো নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করতে হবে। বিধিবহির্ভূত বরাদ্দ, একাধিক প্লট গ্রহণ, মিথ্যা তথ্য প্রদান কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
সরকারের দায়িত্ব শুধু নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষকে প্লট দেওয়া নয়; বরং দেশের সামগ্রিক আবাসন সমস্যার সমাধানে কাজ করা। ঢাকায় জমির সংকট, অস্বাভাবিক জমির মূল্য, নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের আবাসন সমস্যা এবং পরিকল্পনাহীন নগরায়ণ বড় চ্যালেঞ্জ। এ অবস্থায় রাষ্ট্রীয় জমি সীমিতসংখ্যক সুবিধাপ্রাপ্ত মানুষের মধ্যে বণ্টন না করে বৃহত্তর জনস্বার্থে ব্যবহার করা প্রয়োজন।
রাজউকের আবাসন প্রকল্পগুলোতে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী আবাসনের ব্যবস্থা বাড়ানো যেতে পারে। যাঁদের নিজস্ব বাড়ি বা পর্যাপ্ত আবাসন সম্পদ রয়েছে, তাঁদের পুনরায় রাষ্ট্রীয় আবাসন সুবিধা দেওয়ার যৌক্তিকতা নেই। অন্যদিকে প্রকৃত গৃহহীন, অসচ্ছল ও আবাসনবঞ্চিত নাগরিকদের জন্য বিশেষ আবাসন কর্মসূচি গ্রহণ করা মানবিকতা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের দাবি।
রাষ্ট্রীয় সম্পদ বণ্টনের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার মানে সবাইকে একই ধরনের সুবিধা দেওয়া নয়; বরং প্রকৃত প্রয়োজন, যোগ্যতা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা।
সরকারের কাছে প্রত্যাশা, রাজউকের প্লট বরাদ্দ বিধিমালা পুনর্বিবেচনা করে অপ্রয়োজনীয় পেশা ও পদমর্যাদাভিত্তিক কোটা বাতিল করা হবে। একই সঙ্গে প্রকৃত অনগ্রসর ও বিশেষ সহায়তাপ্রয়োজনীয় জনগোষ্ঠীর জন্য যুক্তিসংগত ব্যবস্থা বহাল রেখে বরাদ্দপ্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করা হবে। আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়ন, অতীতের বরাদ্দের নিরপেক্ষ নিরীক্ষা এবং বিশেষ সুপারিশনির্ভর বরাদ্দ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
রাষ্ট্রীয় জমি বরাদ্দে রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক সুপারিশ ও ব্যক্তিগত যোগাযোগের পরিবর্তে যোগ্যতা, প্রয়োজন, স্বচ্ছতা এবং ন্যায়বিচারকে প্রাধান্য দিতে হবে।
রাষ্ট্র সবার, রাষ্ট্রীয় সম্পদও সবার। সংবিধানের সমতার নীতি শুধু বক্তব্যে নয়, রাষ্ট্রীয় সম্পদ বণ্টনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই বাস্তবায়িত হওয়া প্রয়োজন।
লেখক: ইসলামি ফাইন্যান্স বিশেষজ্ঞ, অর্থনীতিবিদ, সমাজ ও রাষ্ট্রচিন্তক, ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং মানবাধিকারকর্মী