Dhaka Mail Logo

মতামত

ঋণখেলাপি মানেই অপরাধী নয়, পরিস্থিতির শিকারদের চাই বিশেষ বিবেচনা

ঢাকা মেইল ডেস্ক

১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৫৩ পিএম

ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির বিরুদ্ধে কঠোরতা আর অনিবার্য সংকটে পড়া সৎ ঋণগ্রহীতার প্রতি ন্যায়সংগত আচরণ—ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ একটি গুরুতর সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। এর প্রভাব এখন শুধু ব্যাংকের আর্থিক বিবরণীতে সীমাবদ্ধ থাকে নেই ; আমানতকারীদের স্বার্থ, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, উৎপাদন এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপরও পড়েছে। তাই খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, ঋণের অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং ব্যাংকের পাওনা আদায়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের বিকল্প নেই। কিন্তু এই সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে একটি মৌলিক প্রশ্ন কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যায় না—যারা ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ পরিশোধ করেন না এবং যারা অনিবার্য পরিস্থিতির শিকার হয়ে ঋণ পরিশোধ করতে পারেননা, তাদের কি একইভাবে বিবেচনা করা ন্যায়সংগত?

এ কথা আমরা মানি আর নাই মানি, বাস্তবতা হলো- সব ঋণখেলাপি একই প্রকৃতির নন। কেউ প্রতারণা, জালিয়াতি, অর্থ আত্মসাৎ কিংবা অসৎ উদ্দেশ্যে ব্যাংকের ঋণ পরিশোধে গড়িমসি করেন। আবার কেউ ব্যবসায়িক মন্দা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বাজারের অস্বাভাবিক পরিবর্তন, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা কিংবা অন্য কোনো অনিবার্য পরিস্থিতির কারণে আর্থিক সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন। প্রথম ক্ষেত্রে অপরাধের প্রকৃতি ও প্রমাণ অনুযায়ী জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে ঋণ পরিশোধের সদিচ্ছা, বাস্তব আর্থিক অবস্থা এবং পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা বিবেচনা করে বিশেষ সুযোগ দেওয়া উচিত।

ঋণ পরিশোধে অক্ষমতা আর ঋণ পরিশোধে অনিচ্ছা এক নয়। এই পার্থক্য অনুধাবন না করে ঋণখেলাপি সমস্যার কার্যকর ও ন্যায়সংগত সমাধান প্রকৃতপক্ষে সম্ভব নয়।

খেলাপি ঋণের বাস্তবতা ও অর্থনৈতিক অভিঘাত

বাংলাদেশ ব্যাংকের Financial Stability Report 2025 অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংক খাতে মোট শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩০.৬০ শতাংশ। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে এই হার ছিল ২০.২০ শতাংশ। ২০২৬ সালের মার্চ শেষে শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ বেড়ে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকায় পৌঁছানোর তথ্য প্রকাশিত হয়।

এই পরিসংখ্যান ব্যাংকিং খাতের সম্পদের মান, ঋণ বিতরণের যথার্থতা এবং ঋণ আদায় ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিপুল পরিমাণ ঋণ অনাদায়ি থাকলে ব্যাংকের তারল্য ও মূলধনের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়, নতুন উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ দেখা দেয়।

তবে খেলাপি ঋণের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণের সময় শুধু ঋণের পরিমাণ নয়, এর পেছনের কারণও অনুসন্ধান করা জরুরি। কোনো ঋণগ্রহীতা প্রতারণার মাধ্যমে ঋণ নিয়েছেন, নাকি সঠিক পন্থায় ঋণ নিয়ে আসলেই ব্যবসায়িক সংকটে পড়েছেন; ঋণের অর্থ উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহার করেছেন, নাকি অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছেন; তাঁর সম্পদ ও আয় রয়েছে, নাকি তিনি সত্যিই আর্থিক অক্ষমতার শিকার—এসব প্রশ্নের উত্তর না খুঁজে সব ঋণগ্রহীতার জন্য একই ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করলে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে না।

এখানে আরও একটি বিষয় বেশ গুরুত্বপূর্ণ। খেলাপি ঋণ কমানোর উদ্দেশ্যে কোনো ঋণ পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠন করা হলে সেটিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রকৃত ঋণ আদায় হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। ঋণগ্রহীতা বাস্তবে কিস্তি পরিশোধ করছেন কি না, ব্যবসা পুনরুদ্ধার হচ্ছে কি না এবং ব্যাংকের পাওনা ফেরত আসছে কি না—এসব ফলাফল দিয়ে ব্যবস্থাটির কার্যকারিতা মূল্যায়ন করতে হবে।

ব্যবসায়িক ব্যর্থতা সব সময় অসততার প্রমাণ নয়

ব্যবসা-বাণিজ্যে ঝুঁকি একটি স্বাভাবিক বাস্তবতা। একজন উদ্যোক্তা ব্যবসা শুরু করার সময় ভবিষ্যৎ আয়, বাজারের চাহিদা, উৎপাদন ব্যয়, পণ্যের দাম এবং ঋণের কিস্তি পরিশোধের সক্ষমতা বিবেচনা করেই বিনিয়োগ করেন। কিন্তু সব সময় পরিকল্পনা অনুযায়ী ব্যবসা পরিচালনা করা সম্ভব হয় না।

কখনো কাঁচামালের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, কখনো পণ্যের চাহিদা কমে যায়, কখনো আমদানি-রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হয়, আবার কখনো বাজারে অর্থের প্রবাহ কমে যাওয়া বা পাওনা আদায়ে দীর্ঘসূত্রতার কারণে ব্যবসার কার্যকর মূলধন আটকে যায়। এমন পরিস্থিতিতে একটি সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠানও সাময়িক সংকটে পড়তে পারে।

ধরা যাক, একজন উদ্যোক্তা নিজের সঞ্চয় ও ব্যাংকঋণ দিয়ে একটি উৎপাদনমুখী প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। সেখানে কর্মরত আছেন বহু শ্রমিক-কর্মচারী। বাজারের আকস্মিক মন্দায় পণ্য বিক্রি কমে যাওয়ায় তাঁর আয় হ্রাস পেয়েছে। অথচ ব্যাংকের কিস্তি, কর্মীদের বেতন, বিদ্যুৎ বিল, কাঁচামালের মূল্য ও অন্যান্য ব্যয় বহাল রয়েছে। তিনি ব্যবসা সচল রাখতে চেষ্টা করছেন এবং ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছেন, কিন্তু নির্ধারিত সময়ে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে পারছেন না।

এমন একজন উদ্যোক্তাকে কি সেই ব্যক্তির সমপর্যায়ে বিবেচনা করা উচিত, যিনি ঋণের অর্থ অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছেন, সম্পদ গোপন করেছেন কিংবা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও অসৎ উদ্দেশ্যে ব্যাংকের পাওনা আটকে রেখেছেন? ন্যায়বিচারের স্বার্থে এ দুই পরিস্থিতির মধ্যে পার্থক্য করা আবশ্যক।

অবশ্য ব্যবসায়িক ব্যর্থতা দেখালেই কোনো ঋণগ্রহীতাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সৎ বা বিশেষ সুবিধার যোগ্য ঘোষণা করা যায় না। তার ব্যবসায়িক হিসাব, আর্থিক বিবরণী, সম্পদ ও দায়, ঋণের অর্থের ব্যবহার এবং পরিশোধের সদিচ্ছা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করতে হবে। বিশেষ বিবেচনার ভিত্তি হতে হবে প্রমাণ, পরিচয় বা প্রভাব নয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিতে কী সুযোগ রয়েছে?

ঋণ পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদ্যমান নীতিমালায় কিছু সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের Prudential Regulations for Banks: Selected Issues সংকলনে ঋণ পুনঃতফসিলের আবেদন মূল্যায়নের সময় ঋণগ্রহীতার প্রয়োজন, আর্থিক সক্ষমতা, নগদ প্রবাহ, আর্থিক বিবরণী, অন্যান্য ব্যাংকে দায় এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বাস্তব অবস্থা যাচাইয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে নিয়মিত বা বারবার পুনঃতফসিলের মাধ্যমে প্রকৃত আর্থিক দুরবস্থা আড়াল করা এবং জালিয়াতি, অনিয়ম বা ঋণের অর্থ অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে সৃষ্ট ঋণকে সাধারণ নিয়মে পুনঃতফসিল করার বিরুদ্ধে বিধিনিষেধ রয়েছে। অর্থাৎ, পুনঃতফসিল কোনো স্বয়ংক্রিয় অধিকার নয়; এটি প্রযোজ্য নীতিমালা, শর্ত এবং ব্যাংকের মূল্যায়নের ওপর নির্ভরশীল।

এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৫ সালে সংকটাপন্ন ব্যবসা ও আর্থিক কার্যক্রম পুনর্গঠনের জন্য বিশেষ নীতিগত সহায়তার ব্যবস্থা চালু করে। ২০২৬ সালের ৩১ আগস্ট প্রকাশিত এক নির্দেশনায় নির্দিষ্ট শর্তে আবেদন জমা দেওয়ার সময়সীমা ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত বাড়ানো হয়। এক হাজার কোটি টাকা বা তার বেশি ঋণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১৫ বছর মেয়াদ এবং সর্বোচ্চ দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডের সুযোগও রাখা হয়েছিল। নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় ডাউন পেমেন্ট সংগ্রহের পর আবেদনগুলো ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে নিষ্পত্তি করার কথা।

এখানে লক্ষণীয়, এই বিশেষ সুবিধা নির্দিষ্ট নীতিমালার আওতাভুক্ত ঋণগ্রহীতাদের জন্য; এটি সব ঋণখেলাপির জন্য উন্মুক্ত সাধারণ সুবিধা নয়। আবেদন জমা দেওয়ার সময়সীমাও ৩০ সেপ্টেম্বর শেষ হয়েছে। ফলে এ ব্যবস্থাকে এখন নতুন আবেদন করার চলমান সুযোগ হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না।

তবে এসব নীতিগত উদ্যোগ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়: আর্থিক সংকটে পড়া ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে পুনরুদ্ধারের সুযোগ দেওয়া এবং ব্যাংকের পাওনা আদায়ের স্বার্থ রক্ষা করা পরস্পরবিরোধী লক্ষ্য নয়। যথাযথ যাচাই, বাস্তবসম্মত পরিশোধ পরিকল্পনা এবং কঠোর তদারকির মাধ্যমে উভয় লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করা যায়।

বিশেষ বিবেচনা মানে ঋণ মওকুফ নয়

পরিস্থিতির শিকার ঋণগ্রহীতাদের বিশেষ বিবেচনার দাবি উঠলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে—এতে কি ঋণগ্রহীতাগণ ঋণ পরিশোধে অনাগ্রহি হবে হয়ে উঠবেনা? এই আশঙ্কাকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। কারণ, ঋণগ্রহীতারা যদি মনে করেন যে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলেই বারবার সময় বাড়ানো হবে, দায় কমানো হবে কিংবা একপর্যায়ে ঋণ মওকুফ করা হবে, তাহলে ঋণ পরিশোধের সংস্কৃতি দুর্বল হতে পারে। অর্থনীতির ভাষায় এটি নৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

তাই বিশেষ বিবেচনা হতে হবে শর্তসাপেক্ষ, প্রমাণভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক। ঋণগ্রহীতাকে তার প্রকৃত আর্থিক অবস্থা প্রকাশ করতে হবে, সম্পদ ও দায়ের বিবরণ দিতে হবে এবং বাস্তবসম্মত পরিশোধ পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। ব্যাংককে নিশ্চিত হতে হবে যে ব্যবসাটি পুনরুদ্ধারের উপযোগী এবং প্রস্তাবিত ব্যবস্থা গ্রহণ করলে পাওনা আদায়ের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাবে। 

আরও পড়ুন

মধ্যপ্রাচ্যের সংকট: সামরিক শক্তি নয়, কূটনীতিই সমাধানের পথ

প্রয়োজনে ঋণের মেয়াদ পুনর্নির্ধারণ, কিস্তির কাঠামো পরিবর্তন কিংবা অনুমোদিত পুনর্গঠন পরিকল্পনার মাধ্যমে ঋণগ্রহীতাকে নিয়মিত পরিশোধে ফিরিয়ে আনা যেতে পারে। কিন্তু কেউ যদি মিথ্যা তথ্য দেন, সম্পদ গোপন করেন, পুনর্গঠনের শর্ত ইচ্ছাকৃতভাবে ভঙ্গ করেন কিংবা প্রতারণার আশ্রয় নেন, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে প্রযোজ্য আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়াই হবে সঠিক ও যথোপযুক্ত সিদ্ধান্ত।

একই সঙ্গে ব্যাংককে নিশ্চিত করতে হবে, বিশেষ সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক প্রভাব বা ব্যক্তিগত সম্পর্কের প্রভাব যেন না থাকে। বড় ঋণগ্রহীতা বলে কেউ বিশেষ সুবিধা পাবেন, আর ছোট উদ্যোক্তা বলে কেউ ন্যায্য বিবেচনা থেকে বঞ্চিত হবেন—এমন বৈষম্য গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

ঋণ বিতরণে ব্যাংকের দায়ও মূল্যায়ন করতে হবে

ঋণখেলাপির আলোচনায় সাধারণত ঋণগ্রহীতার দায় বেশি গুরুত্ব পায়। কিন্তু ঋণ বিতরণ ও তদারকিতে ব্যাংকের দায়িত্বও কম নয়। ঋণ অনুমোদনের আগে গ্রাহকের আর্থিক সক্ষমতা, ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, নগদ প্রবাহ, জামানত এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি যাচাই করা ব্যাংকের মৌলিক দায়িত্ব। ঋণ বিতরণের পর অর্থের ব্যবহার পর্যবেক্ষণ এবং সময়মতো ঝুঁকি শনাক্ত করাও জরুরি।

কোনো ব্যাংক যদি যথাযথ যাচাই ছাড়া ঋণ দেয়, প্রভাবের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ অনুমোদন করে কিংবা ঋণের অর্থের ব্যবহার তদারকিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে সেই ব্যর্থতার কারণও অনুসন্ধান করতে হবে। ব্যাংকের কর্মকর্তা, ঋণ অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ, পরিচালনা পর্ষদ কিংবা তদারকির দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের কোনো অবহেলা বা যোগসাজশ থাকলে প্রমাণের ভিত্তিতে তাঁদের জবাবদিহিও নিশ্চিত করা উচিত।

Khelapi

তবে ব্যাংকের ভুল থাকলেই ঋণগ্রহীতার ঋণ পরিশোধের দায় শেষ হয়ে যায় না। ঋণ চুক্তি ও প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী তাঁর দায় বহাল থাকবে। বরং ঋণ আদায়ের পাশাপাশি ঋণ সৃষ্টির পেছনে কোনো অনিয়ম ছিল কি না, সেটিও তদন্ত করতে হবে। অন্যথায় শুধু ঋণখেলাপির ওপর চাপ সৃষ্টি করে সমস্যার মূল কারণ অমীমাংসিত থেকে যাবে।

ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য ঋণ অনুমোদন, অর্থের ব্যবহার, ঝুঁকি মূল্যায়ন, ঋণ পুনর্গঠন এবং পাওনা আদায়—প্রতিটি পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

ইসলামি অর্থনীতিতে ঋণগ্রহীতার প্রতি মানবিক বিবেচনা

ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে প্রকৃত অসচ্ছল ঋণগ্রহীতার প্রতি আচরণের বিষয়ে ইসলামে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা রয়েছে। পবিত্র কোরআনের সুরা আল-বাকারার ২৮০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ঋণগ্রহীতা সংকটে থাকলে তার সচ্ছলতা ফিরে আসা পর্যন্ত তাকে অবকাশ দিতে হবে; আর ঋণ মওকুফ করার সুযোগ থাকলে তা আরও উত্তম। এই নির্দেশনা ঋণদাতা ও ঋণগ্রহীতার সম্পর্কের ক্ষেত্রে মানবিকতা, সহনশীলতা ও ন্যায়সংগত আচরণের গুরুত্ব তুলে ধরে।

তবে এ নির্দেশনার অর্থ এই নয় যে সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ পরিশোধ করবেন না। ঋণ পরিশোধের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা ঋণগ্রহীতার নৈতিক দায়িত্ব। একইভাবে, প্রকৃত অসচ্ছলতার কারণে কেউ ঋণ পরিশোধে অক্ষম হলে তার নাজুক পরিস্থিতি বিবেচনা না করে অযৌক্তিক চাপ সৃষ্টি করাও ইসলামের মানবিক শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

ইসলামি অর্থনীতির দৃষ্টিতে আর্থিক লেনদেনে উভয় পক্ষের অধিকার ও দায়িত্ব বিবেচনা করতে হবে। ব্যাংকের পাওনা আদায় যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি প্রকৃত সংকটে পড়া ঋণগ্রহীতার প্রতি ন্যায়সংগত আচরণও গুরুত্বপূর্ণ। অতএব, কঠোর জবাবদিহি ও মানবিক বিবেচনার সমন্বয় ইসলামি অর্থনীতির নৈতিক শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

কী ধরনের নীতিগত সংস্কার প্রয়োজন?

পরিস্থিতির শিকার ঋণগ্রহীতাদের ন্যায্য মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।

আরও পড়ুন

শিক্ষাধারায় ভারসাম্য সময়ের দাবি

প্রথমত, ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতার কারণ নির্ধারণে স্বচ্ছ ও প্রমাণভিত্তিক মূল্যায়নব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। শুধু নির্ধারিত সময়ে কিস্তি পরিশোধ না করার ভিত্তিতে ঋণগ্রহীতার উদ্দেশ্য সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়।

দ্বিতীয়ত, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা, কৃষক এবং উৎপাদনমুখী প্রতিষ্ঠানের বাস্তব আর্থিক সংকট বিবেচনায় নিয়ে প্রযোজ্য বিধির আওতায় পুনর্গঠনের সুযোগ দিতে হবে। তবে ব্যবসা পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা, ঋণ পরিশোধের সদিচ্ছা এবং ব্যাংকের পাওনা আদায়ের স্বার্থ নিশ্চিত করতে হবে।

তৃতীয়ত, পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠনের আবেদন নিষ্পত্তিতে স্বচ্ছ মানদণ্ড, নির্দিষ্ট সময়সীমা এবং যুক্তিসংগত সিদ্ধান্তের ব্যবস্থা থাকা দরকার। একই সঙ্গে সুবিধাপ্রাপ্ত ঋণগ্রহীতারা নির্ধারিত শর্ত মেনে চলছেন কি না, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

চতুর্থত, প্রতারণা, জালিয়াতি, অর্থ আত্মসাৎ এবং ইচ্ছাকৃত ঋণ পরিশোধ এড়িয়ে যাওয়ার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতারা যেন আইনের ঊর্ধ্বে থাকার সুযোগ না পান, তা নিশ্চিত করতে হবে।

পঞ্চমত, ঋণ বিতরণের আগে যথাযথ যাচাই এবং বিতরণের পরে কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং পরিচালনা পর্ষদের জবাবদিহি শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

ষষ্ঠত, ঋণ আদায়ের পাশাপাশি ঋণ সৃষ্টির পেছনে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা, অনিয়ম বা যোগসাজশ ছিল কি না, তা নিরপেক্ষভাবে অনুসন্ধান করতে হবে। এতে ভবিষ্যতে একই ধরনের সমস্যা প্রতিরোধ করা সহজ হবে।

সপ্তমত, নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ হিসেবে ব্যাংকগুলোর ওপর বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধান ও তদারকি জোরদার করতে হবে।

ঋণখেলাপির সমস্যা সমাধানে কঠোরতা যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন ন্যায়সংগত বিবেচনা। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে, ব্যাংকের অর্থ আত্মসাৎ বা প্রতারণার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে এবং ঋণ পরিশোধের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। একই সঙ্গে অনিবার্য পরিস্থিতির শিকার সৎ ঋণগ্রহীতাদের জন্য বাস্তবসম্মত সমাধানের পথ খোলা রাখতে হবে।

একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে গেলে শুধু উদ্যোক্তাই ক্ষতিগ্রস্ত হন না; কর্মচারীরা চাকরি হারাতে পারেন, সরবরাহকারীরা পাওনা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন, উৎপাদন কমে যেতে পারে এবং ব্যাংকের অর্থও অনাদায়ি থেকে যেতে পারে। বিপরীতে, সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠানকে যথাযথ মূল্যায়নের মাধ্যমে পুনরুদ্ধারের সুযোগ দেওয়া গেলে কর্মসংস্থান রক্ষা, উৎপাদন অব্যাহত রাখা এবং ব্যাংকের পাওনা আদায়—সব ক্ষেত্রেই ইতিবাচক ফল পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

তবে কোনো প্রতিষ্ঠানকে বাঁচানোর নামে অনিয়ম আড়াল করা কিংবা অযৌক্তিকভাবে ঋণের দায় কমিয়ে দেওয়া যাবে না। বিশেষ বিবেচনার সুযোগ হতে হবে যোগ্যতা, প্রমাণ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ভিত্তিতে।

ঋণখেলাপি হলেই কেউ প্রতারক নন; আবার আর্থিক সংকটের দাবি করলেই কেউ বিশেষ সুবিধার যোগ্য হয়ে যান না। প্রকৃত সত্য নির্ধারণ করতে হবে নিরপেক্ষ অনুসন্ধান ও প্রমাণের ভিত্তিতে।

ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু ঋণখেলাপির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া নয়; বরং আমানতকারীর স্বার্থ রক্ষা, উৎপাদনশীল বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি, কর্মসংস্থান বজায় রাখা এবং ন্যায়সংগত আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির বিরুদ্ধে কঠোরতা এবং পরিস্থিতির শিকার সৎ ঋণগ্রহীতার প্রতি মানবিক ও ন্যায়সংগত বিবেচনার সমন্বয়ই হতে পারে এ লক্ষ্য অর্জনের কার্যকর পথ।

লেখক: অর্থনীতিবিদ, সমাজ ও রাষ্ট্রচিন্তক এবং মানবাধিকার কর্মী