ঢাকা মেইল ডেস্ক
১৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:১৫ পিএম
মানবদেহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ মেরুদণ্ড। এটি আমাদের শরীরের ভারসাম্য রক্ষা করে, দাঁড়ানো, বসা ও চলাফেরায় সহায়তা করে এবং মেরুরজ্জু ও গুরুত্বপূর্ণ স্নায়ুগুলোকে সুরক্ষা দেয়। মেরুদণ্ডের সুস্থতার সঙ্গে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন, কর্মক্ষমতা, আত্মনির্ভরতা ও সামগ্রিক জীবনমান গভীরভাবে জড়িত। অথচ অসচেতনতা, ভুল জীবনযাপন, আঘাত, বয়সজনিত পরিবর্তন এবং বিভিন্ন রোগের কারণে মেরুদণ্ডের নানা সমস্যা দেখা দেয়, যা কখনো কখনো একজন মানুষকে দীর্ঘমেয়াদে অক্ষম করে তুলতে পারে।
১৬ অক্টোবর বিশ্ব মেরুদণ্ড দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘Support Your Spine for Life’—অর্থাৎ, সারা জীবন মেরুদণ্ডের যত্ন নিন ও সুস্থ রাখুন। এই প্রতিপাদ্য শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়ে মেরুদণ্ডের যত্ন নেওয়ার আহ্বান নয়; এটি মেরুদণ্ডের রোগ প্রতিরোধ, সময়মতো রোগ নির্ণয়, আধুনিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা এবং আক্রান্ত মানুষের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সুযোগ সৃষ্টিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ বছরের প্রতিপাদ্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, মেরুদণ্ডের রোগ সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশের প্রতিটি অঞ্চলে আধুনিক স্পাইন চিকিৎসার সুযোগ সম্প্রসারণ এখন সময়ের দাবি।
বাংলাদেশে কোমরব্যথা, ঘাড়ব্যথা, ডিস্ক প্রলাপস বা পিএলআইডি, স্পাইনাল স্টেনোসিস, মেরুদণ্ডের যক্ষ্মা, অস্টিওপোরোসিসজনিত ভার্টিব্রাল ফ্র্যাকচার, মেরুদণ্ডের আঘাত এবং স্কোলিওসিস ও কাইফোসিসের মতো সমস্যায় অনেক মানুষ ভুগছেন। এসব রোগের কারণে দৈনন্দিন কাজকর্ম ব্যাহত হয়, কর্মঘণ্টা নষ্ট হয় এবং রোগী ও তাঁর পরিবারের ওপর আর্থিক ও মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়।
দীর্ঘ সময় একটানা বসে থাকা, ভুল দেহভঙ্গি, শারীরিক পরিশ্রমের ঘাটতি, অতিরিক্ত ওজন, অনিরাপদভাবে ভারী বস্তু তোলা এবং হাড়ের দুর্বলতা মেরুদণ্ডের কিছু সমস্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম, সঠিক দেহভঙ্গি বজায় রাখা, স্বাস্থ্যকর ওজন ধরে রাখা, নিরাপদভাবে ভার বহন করা এবং বয়স ও শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী হাড়ের যত্ন নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তবে কোমরব্যথা বা ঘাড়ব্যথা হলেই অস্ত্রোপচার প্রয়োজন—এ ধারণা ভুল। অধিকাংশ ক্ষেত্রে রোগের ধরন অনুযায়ী ওষুধ, ব্যায়াম, ফিজিওথেরাপি, জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং অন্যান্য রক্ষণশীল চিকিৎসার মাধ্যমে উপকার পাওয়া যায়। প্রয়োজন অনুযায়ী এবং যথাযথ মূল্যায়নের ভিত্তিতেই অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
বিশেষ করে হাত-পায়ের শক্তি ক্রমশ কমে যাওয়া, হাঁটতে অসুবিধা, মেরুরজ্জুর ওপর চাপের লক্ষণ অথবা কোমরব্যথার সঙ্গে নতুন করে প্রস্রাব-পায়খানা নিয়ন্ত্রণে সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি। এসব লক্ষণ গুরুতর স্নায়বিক সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে এবং চিকিৎসায় বিলম্ব স্থায়ী ক্ষতির ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
বাংলাদেশে স্পাইন সার্জারির ইতিহাস দীর্ঘ প্রচেষ্টা, অভিজ্ঞতা ও ক্রমাগত দক্ষতা অর্জনের ইতিহাস। দেশের অর্থোপেডিক সার্জারির প্রাথমিক যুগ থেকেই মেরুদণ্ডের রোগের চিকিৎসায় অর্থোপেডিক সার্জনরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন। বিশেষ করে যক্ষ্মাজনিত মেরুদণ্ডের রোগে ডিকম্প্রেশন ও ফিউশন সার্জারির মাধ্যমে চিকিৎসার পথ তৈরি হয়।
অধ্যাপক আর জে গার্স্টসহ প্রাথমিক যুগের পথিকৃৎ চিকিৎসকদের অবদান বাংলাদেশের অর্থোপেডিক ও স্পাইন সার্জারির ইতিহাসে স্মরণযোগ্য। পরবর্তী সময়ে অধ্যাপক শামসুদ্দিন আহমেদ, অধ্যাপক ইমান উদ্দিন, অধ্যাপক আবদুস সামাদ শেখ এবং অধ্যাপক ইদ্রিস আলীর মতো বিশিষ্ট চিকিৎসকেরা এই শাখার বিকাশে ভূমিকা রেখেছেন। অধ্যাপক শাহ আলমসহ পরবর্তী প্রজন্মের চিকিৎসকেরাও স্পাইন সার্জারির আধুনিকায়ন ও বিস্তারে অবদান রেখে চলেছেন।
একসময় দেশে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ, আধুনিক যন্ত্রপাতি, দক্ষ সহায়ক জনবল এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা ছিল প্রকট। জটিল মেরুদণ্ডের রোগ ও আঘাতের চিকিৎসার জন্য অনেক রোগীকে বিদেশে যাওয়ার কথা ভাবতে হতো। কিন্তু গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের চিকিৎসাব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।
বর্তমানে দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে মেরুদণ্ডের জটিল রোগ ও আঘাতের চিকিৎসা করা হচ্ছে। মাইক্রোস্কোপ-সহায়িত সার্জারি, মিনিম্যালি ইনভেসিভ স্পাইন সার্জারি (MISS), এন্ডোস্কোপিক স্পাইন সার্জারি, ডিকম্প্রেশন, ফিক্সেশন ও ফিউশনসহ বিভিন্ন আধুনিক পদ্ধতি প্রয়োগ করা হচ্ছে। রোগীর অবস্থা ও অস্ত্রোপচারের ধরন অনুযায়ী এসব পদ্ধতির মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের ক্ষত কমানো, হাসপাতালে থাকার সময় হ্রাস এবং দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব হচ্ছে।
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ট্রমাটোলজি অ্যান্ড অর্থোপেডিক রিহ্যাবিলিটেশন (নিটোর), বিভিন্ন সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং বিশেষায়িত বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এই অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তবে দেশের সব অঞ্চলে সমমানের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এখনও উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে।
স্পাইন সার্জারির অগ্রগতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আধুনিক প্রযুক্তি ও উন্নত অস্ত্রোপচার কৌশলের ব্যবহার। এন্ডোস্কোপিক স্পাইন সার্জারির মতো পদ্ধতিতে নির্বাচিত রোগীর ক্ষেত্রে ছোট ছিদ্রের মাধ্যমে ক্যামেরা ও বিশেষ যন্ত্র ব্যবহার করে স্নায়ুর ওপর চাপ সৃষ্টিকারী ডিস্কের অংশ অপসারণ বা প্রয়োজনীয় ডিকম্প্রেশন করা যায়। কিছু রোগীর ক্ষেত্রে এতে টিস্যুর ক্ষতি কমানো এবং দ্রুত পুনরুদ্ধারে সহায়তা করা সম্ভব হয়।
একইভাবে স্পাইনাল স্টেনোসিস, নির্দিষ্ট ধরনের মেরুদণ্ডের ফ্র্যাকচার, স্পন্ডাইলোলিস্থেসিস, মেরুদণ্ডের বিকৃতি এবং অন্যান্য জটিল রোগের চিকিৎসায় রোগীভেদে বিভিন্ন অস্ত্রোপচার পদ্ধতি প্রয়োগ করা হচ্ছে। প্রয়োজন অনুযায়ী মাইক্রোস্কোপ, সি-আর্ম এবং অন্যান্য আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার অস্ত্রোপচারের পরিকল্পনা ও নিরাপত্তা বাড়াতে সহায়তা করে।
তবে আধুনিক প্রযুক্তি মানেই সব রোগীর জন্য একই অস্ত্রোপচার নয়। রোগীর উপসর্গ, শারীরিক পরীক্ষা, এমআরআই বা অন্যান্য ইমেজিং, মেরুদণ্ডের স্থিতিশীলতা এবং সামগ্রিক শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে চিকিৎসা নির্ধারণ করতে হয়। সব কোমরব্যথার জন্য অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হয় না; আবার উপযুক্ত রোগীর ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারে অযথা বিলম্ব করাও ঠিক নয়।
আমি সহযোগী অধ্যাপক (স্পাইন সার্জারি) হিসেবে খুলনা মেডিকেল কলেজে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নিয়মিত মেরুদণ্ডের বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা ও প্রয়োজন অনুযায়ী অস্ত্রোপচার করে আসছি। আমার পেশাগত অভিজ্ঞতায়, সঠিক রোগ নির্ণয়, যথাযথ চিকিৎসা নির্বাচন, আধুনিক অস্ত্রোপচার কৌশলের প্রয়োগ এবং নিয়মিত ফলোআপ রোগীর চিকিৎসার ফলাফল উন্নত করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
খুলনা ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের জন্য নিজ অঞ্চলে উন্নত স্পাইন চিকিৎসার সুযোগ সম্প্রসারণ বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এতে রোগীদের চিকিৎসার জন্য দূরবর্তী অঞ্চলে যাতায়াতের চাপ কমানো এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত বিশেষজ্ঞসেবা পাওয়ার সুযোগ বাড়ানো সম্ভব।
বাংলাদেশে স্পাইন সার্জারির আরও বিকাশের জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে পর্যায়ক্রমে স্বতন্ত্র স্পাইন ইউনিট প্রতিষ্ঠা করা।
বর্তমানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো দেশের সব অঞ্চলে সমানভাবে নেই। ফলে অনেক রোগীকে চিকিৎসার জন্য রাজধানী বা কয়েকটি বড় শহরের ওপর নির্ভর করতে হয়। এতে যাতায়াতের ব্যয়, চিকিৎসায় বিলম্ব এবং পরিবারের আর্থিক চাপ বাড়ে। বিশেষ করে মেরুদণ্ডের গুরুতর আঘাত বা স্নায়ুর ওপর চাপজনিত সমস্যায় দ্রুত উপযুক্ত চিকিৎসা পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিটি সরকারি মেডিকেল কলেজে প্রয়োজন ও সক্ষমতা অনুযায়ী স্পাইন ইউনিট প্রতিষ্ঠা করা গেলে রোগ নির্ণয়, অস্ত্রোপচার, অস্ত্রোপচার-পরবর্তী পরিচর্যা, ফলোআপ ও পুনর্বাসনের সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা সহজ হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে প্রয়োজনীয় জনবল ও অবকাঠামোসম্পন্ন নির্বাচিত মেডিকেল কলেজে এ উদ্যোগ শুরু করে ধাপে ধাপে অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোতে সম্প্রসারণ করা যেতে পারে।
একটি কার্যকর স্পাইন ইউনিটের জন্য প্রশিক্ষিত স্পাইন সার্জন, দক্ষ অ্যানেসথেসিওলজিস্ট, প্রশিক্ষিত নার্স, অপারেশন থিয়েটার দল, ফিজিওথেরাপিস্ট, পুনর্বাসনকর্মী, উপযুক্ত ইমেজিং সুবিধা এবং প্রয়োজনীয় নিবিড় পরিচর্যার ব্যবস্থা থাকা দরকার। অপারেটিং মাইক্রোস্কোপ, সি-আর্ম, এন্ডোস্কোপিক যন্ত্রপাতি এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ধাপে ধাপে নিশ্চিত করতে হবে। জটিল অস্ত্রোপচারের জন্য নিউরো-নেভিগেশনের মতো ব্যয়বহুল প্রযুক্তি প্রয়োজন ও সক্ষমতা অনুযায়ী নির্ধারিত কেন্দ্রে স্থাপন করা যেতে পারে।
শুধু যন্ত্রপাতি কেনাই যথেষ্ট নয়; সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ, ব্যবহারকারী প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তা এবং নিয়মিত কার্যকারিতা নিশ্চিত করাও সমান জরুরি।
স্পাইন সার্জারি একটি বিশেষায়িত ও জটিল চিকিৎসাশাখা। দক্ষ স্পাইন সার্জন তৈরি করতে দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞের অধীনে হাতে-কলমে শিক্ষা এবং গবেষণার সুযোগ প্রয়োজন।
সরকারি ব্যবস্থাপনায় স্পাইন সার্জারিতে কর্মরত সহকারী অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক ও অধ্যাপকদের জন্য স্বীকৃত বিদেশি স্পাইন সেন্টারে তিন থেকে ছয় মাস মেয়াদি কাঠামোবদ্ধ ফেলোশিপের সুযোগ সৃষ্টি করা যেতে পারে। প্রশিক্ষণ শেষে তাঁদের অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতা নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে প্রয়োগের পাশাপাশি অন্য চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণেও কাজে লাগানোর ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
দেশেও ধাপে ধাপে স্পাইন সার্জারির বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ ও ফেলোশিপ কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সার্জন তৈরি, চিকিৎসার মান নির্ধারণ এবং আধুনিক পদ্ধতির নিরাপদ প্রয়োগ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
এ ক্ষেত্রে সহকারী অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপকদের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁরা রোগীসেবার পাশাপাশি শিক্ষাদান, তরুণ চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ, গবেষণা এবং নতুন প্রযুক্তি প্রচলনের দায়িত্ব পালন করেন। অনেক চিকিৎসক নিজ উদ্যোগে বিদেশে ফেলোশিপ ও উন্নত প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে দেশে ফিরে অর্জিত জ্ঞান প্রয়োগ করছেন।
কিন্তু বিশেষায়িত ইউনিট, পর্যাপ্ত একাডেমিক পদ এবং সুস্পষ্ট ক্যারিয়ার কাঠামো না থাকলে এই দক্ষ জনবলের পূর্ণ সদ্ব্যবহার কঠিন হতে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞতা, গবেষণা, পেশাগত দক্ষতা এবং প্রচলিত বিধিমালা বিবেচনা করে স্পাইন সার্জারির জন্য উপযুক্ত একাডেমিক পদ ও পদোন্নতির কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন।

যোগ্য চিকিৎসকদের পদায়ন ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে স্বচ্ছ, ন্যায্য ও সময়োপযোগী নীতিমালা নিশ্চিত করা গেলে সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে স্বতন্ত্র স্পাইন ইউনিট চালু করা সহজ হবে এবং নতুন স্পাইন সার্জন তৈরির পথ আরও সুগম হবে।
বাংলাদেশের রোগীদের রোগের ধরন, চিকিৎসার ফলাফল, অস্ত্রোপচার-পরবর্তী জটিলতা, দীর্ঘমেয়াদি কর্মক্ষমতা এবং পুনর্বাসনের ফলাফল নিয়ে নিয়মিত গবেষণা প্রয়োজন। বিশেষ করে জেলা পর্যায়ের হাসপাতালে সীমিত সম্পদের মধ্যে স্পাইন সার্জারির ফলাফল নিয়ে মানসম্মত গবেষণা আন্তর্জাতিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে বাংলাদেশের বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে পারে।
এ জন্য জাতীয় পর্যায়ে স্পাইন সার্জারির একটি রোগী-তথ্যভান্ডার বা রেজিস্ট্রি গড়ে তোলা যেতে পারে। রোগীর গোপনীয়তা রক্ষা করে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে চিকিৎসার মান মূল্যায়ন, গবেষণা পরিচালনা এবং স্বাস্থ্যনীতি নির্ধারণ করা সহজ হবে।
বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে যৌথ কর্মশালা, প্রশিক্ষণ, গবেষণা এবং একাডেমিক বিনিময় বাড়ানোও জরুরি। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ, নিয়মিত দক্ষতা মূল্যায়ন এবং প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসা চর্চার মাধ্যমে বাংলাদেশের স্পাইন সার্জারির মান আরও উন্নত করা সম্ভব।
উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রতিবছর অনেক বাংলাদেশি বিদেশে যান। তাঁদের মধ্যে মেরুদণ্ডের জটিল রোগ ও আঘাতের চিকিৎসা গ্রহণকারী রোগীরাও রয়েছেন। তবে শুধু স্পাইন সার্জারির জন্য কতজন রোগী বিদেশে যান এবং এর পেছনে কত বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়, তার নির্ভরযোগ্য পৃথক পরিসংখ্যান প্রয়োজন। সঠিক তথ্য ছাড়া এ বিষয়ে নির্দিষ্ট সংখ্যা উল্লেখ করা সমীচীন নয়।
তবে এটি স্পষ্ট যে, যেসব রোগের নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা বাংলাদেশেই সম্ভব, সেসব ক্ষেত্রে দেশীয় চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর আস্থা বাড়ানো গেলে রোগী ও পরিবারের বিদেশযাত্রার ব্যয় কমানো সম্ভব। বিদেশে চিকিৎসার ক্ষেত্রে হাসপাতালের খরচের পাশাপাশি বিমানভাড়া, আবাসন, খাবার, যাতায়াত এবং সঙ্গে থাকা স্বজনদের ব্যয়ও যুক্ত হয়
দেশে আধুনিক স্পাইন চিকিৎসার সুযোগ বাড়ানো, চিকিৎসার মান নিশ্চিত করা, রোগীদের যথাযথ পরামর্শ দেওয়া এবং চিকিৎসার ফলাফল সম্পর্কে স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ করা গেলে দেশেই চিকিৎসা গ্রহণের প্রবণতা বাড়তে পারে। এতে পরিবারের অর্থ সাশ্রয়ের পাশাপাশি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থাও বৃদ্ধি পাবে।
ভবিষ্যতে বাংলাদেশে স্পাইন সার্জারির মান, গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামো আরও শক্তিশালী করা গেলে আঞ্চলিক পর্যায়ে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে। তবে এ লক্ষ্য অর্জনের ভিত্তি হতে হবে রোগীর নিরাপত্তা, প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ।
‘Support Your Spine for Life’—এই প্রতিপাদ্য আমাদের ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক উভয় পর্যায়েই দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানায়। ব্যক্তিগত পর্যায়ে নিয়মিত শরীরচর্চা, সঠিক দেহভঙ্গি, স্বাস্থ্যকর ওজন, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণের মাধ্যমে মেরুদণ্ডের যত্ন নিতে হবে।
অন্যদিকে, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আধুনিক স্পাইন চিকিৎসার সুযোগ সম্প্রসারণ, বিশেষজ্ঞ জনবল তৈরি, গবেষণায় বিনিয়োগ এবং সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে স্বতন্ত্র স্পাইন ইউনিট প্রতিষ্ঠাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
এ জন্য কয়েকটি পদক্ষেপ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ:
১. সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে পর্যায়ক্রমে স্বতন্ত্র স্পাইন ইউনিট প্রতিষ্ঠা।
২. স্পাইন সার্জারিতে বিশেষ প্রশিক্ষণ, ফেলোশিপ ও দক্ষ জনবল তৈরির সুযোগ সম্প্রসারণ।
৩. যোগ্য চিকিৎসকদের জন্য স্বচ্ছ একাডেমিক পদ, পদায়ন ও পদোন্নতির কাঠামো নিশ্চিত করা।
৪. আধুনিক যন্ত্রপাতির পাশাপাশি প্রশিক্ষিত সহায়ক জনবল, নিবিড় পরিচর্যা এবং পুনর্বাসনসেবা নিশ্চিত করা।
৫. জাতীয় পর্যায়ে স্পাইন সার্জারির রোগী-তথ্যভান্ডার, গবেষণা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো।
৬. জনগণের মধ্যে মেরুদণ্ডের রোগ প্রতিরোধ, সতর্কসংকেত শনাক্তকরণ এবং সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি।
মেরুদণ্ডের সুস্থতা মানে শুধু ব্যথামুক্ত জীবন নয়; এর অর্থ স্বাভাবিক চলাফেরা, কর্মক্ষমতা, আত্মনির্ভরতা এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন। বাংলাদেশের স্পাইন সার্জারি ইতোমধ্যে অনেক দূর এগিয়েছে। এখন প্রয়োজন এই অগ্রযাত্রাকে পরিকল্পিত, প্রাতিষ্ঠানিক এবং দেশব্যাপী বিস্তৃত করা।
আমরা চাই, উন্নত স্পাইন চিকিৎসার সুযোগ যেন কেবল রাজধানী বা কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। খুলনা, সাতক্ষীরাসহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষও যেন প্রয়োজন অনুযায়ী আধুনিক, নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ পান।
বিশ্ব মেরুদণ্ড দিবস ২০২৬-এ আমাদের অঙ্গীকার হোক—মেরুদণ্ডের যত্ন সারা জীবনের, আধুনিক চিকিৎসা সবার অধিকার। সুস্থ মেরুদণ্ড, কর্মক্ষম মানুষ, আত্মনির্ভর বাংলাদেশ।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক (স্পাইন সার্জারি), খুলনা মেডিকেল কলেজ