ঢাকা মেইল ডেস্ক
১৬ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৪৮ পিএম
শুক্রবারের সকালটা একটু অন্য রকম। সপ্তাহের হিসাব মেলাতে মেলাতে মানুষ যখন দুদণ্ড শান্তি খোঁজে, তখন সংবাদপত্র এসে জানায়, হিসাবের খাতা এখনো বন্ধ হয়নি। কোথাও চাকরিপ্রার্থীর চোখে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ক্ষোভ, কোথাও মানুষের জীবিকার টানাপোড়েন, কোথাও আবার নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ নিয়ে দুশ্চিন্তা। রাষ্ট্রের কাগজে এসব আলাদা খবর; মানুষের জীবনে তারা একই গল্পের বিভিন্ন পৃষ্ঠা। গল্পটির নাম—নিরাপদে বাঁচার অধিকার। অবশ্য নিরাপত্তা এখন এমন এক বস্তু, যার অভাব সবাই বোঝেন, কিন্তু দায়িত্বটি ঠিক কার, তা বোঝার সময় ফাইলটি প্রায়ই অন্য টেবিলে চলে যায়।
এই নিরাপত্তার সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে শ্রমের ন্যায্য দাম। তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের বিক্ষোভের মুখে সরকার নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। উত্তরা ও টঙ্গীতে বেতন ও ভাতা বাড়ানোর দাবিতে সড়ক অবরোধ করেছেন শ্রমিকেরা। তাঁদের সংসারে মাসের হিসাবটি খুব সহজ—বাড়িভাড়া, চাল-ডাল, বিদ্যুৎ, ওষুধ আর সন্তানের পড়াশোনা। কঠিন কেবল হিসাবের ফল। বাজারদর অবশ্য প্রতি মাসেই নিজের বেতন বাড়িয়ে নেয়; শ্রমিকের বেতন বাড়ানোর জন্য আবার বোর্ড বসাতে হয়। মালিকের উৎপাদন খরচ আছে, রফতানির চাপ আছে, ব্যবসার যুক্তিও আছে। কিন্তু যে মানুষটি পোশাক তৈরি করেন, তাঁর নিজের পরিবারের শীতবস্ত্র কেনার সামর্থ্য কতটুকু, সে প্রশ্নটিও মজুরি নির্ধারণের টেবিলে থাকা উচিত। কারখানার সেলাই মেশিন একটানা চলে, শ্রমিকের সংসারও চলে—তবে দ্বিতীয়টির জ্বালানি কোথা থেকে আসে, সে হিসাব সচরাচর কমই দেখা হয়।
জীবিকার পথে বাধা কখনো মজুরি, কখনো নিয়মের বেড়া। ঝিনাইদহে এক গৃহপরিচারিকার সন্তান শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় মেধাতালিকার ওপরের দিকে থেকেও স্থায়ী ঠিকানার জটিলতায় নিয়োগপত্র পাননি—এমন খবর সামাজিক মাধ্যমে উদ্বেগ তৈরি করেছে। ঘটনাটির বিস্তারিত যাচাই ও নিয়োগবিধির ব্যাখ্যা জরুরি। ঠিকানা যাচাইয়ের প্রয়োজন থাকতে পারে; কিন্তু যার জীবনের ঠিকানাই অনিশ্চিত, তার কাছে স্থায়ী ঠিকানার কাগজ চাওয়ার আগে রাষ্ট্রের একটু থেমে ভাবা উচিত। মেধার তালিকায় প্রথম সারিতে জায়গা পাওয়া কঠিন, আর কাগজের এক ঘরে আটকে যাওয়া আরও কঠিন। রাষ্ট্র যদি বলে, ‘আপনি যোগ্য, কিন্তু আপনার ঠিকানা ঠিক নেই’, তবে প্রার্থীও হয়তো জিজ্ঞেস করতে পারেন, ‘স্যার, আমার ঠিকানাটা ঠিক করে দেওয়ার দায়িত্ব কার?’ অন্যদিকে নরসিংদীর রায়পুরার ৭৪ বছর বয়সী খবির উদ্দিন খানের ৪২ কিলোমিটার ম্যারাথন দৌড়ের ভিডিও মানুষকে আনন্দ দিয়েছে। এই বয়সে তিনি দৌড়ে দেখিয়েছেন, বয়স সব সময় বাধা নয়। কেউ কেউ অবশ্য চল্লিশের পর সিঁড়ি ভাঙতেই হাঁপিয়ে ওঠেন। খবির উদ্দিনের কাছে তাঁদের বিনীত প্রশ্ন—আপনি কি দৌড়ের সঙ্গে সঙ্গে বয়সটাও বাড়িতে রেখে বেরিয়েছিলেন?
রান্নাঘরেও স্বস্তি নেই। এলপিজি ব্যবসায়ীদের ধর্মঘটের ঘোষণা ঘিরে সিলিন্ডার সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। তবে ঘোষিত কর্মসূচি আর বাস্তবে চলমান ধর্মঘট এক বিষয় নয়; ব্যবসায়ী সংগঠনটি কর্মসূচি প্রত্যাহার করেছিল বলে প্রকাশিত খবরে জানানো হয়। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন তাদের দাবিগুলো নিয়ে ২৯ অক্টোবর গণশুনানির আশ্বাস দিয়েছিল। এই পার্থক্যটি জরুরি, কারণ গুজবে চুলা জ্বলে না, তবে বাজার গরম হতে সময় লাগে না। এদিকে প্যাকেটজাত খাবারে অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও সম্পৃক্ত চর্বির বিষয়ে সতর্কীকরণ লেবেল চালুর দাবি উঠেছে। ক্রেতা কী কিনছেন, তা জানার অধিকার তাঁর আছে। খাবারের মোড়কে হাসিখুশি ফলমূলের ছবি দেখে ভেতরের উপাদানও যে হাসিখুশি হবে, এমন কোনো বৈজ্ঞানিক নিশ্চয়তা নেই। বিজ্ঞাপনের ভাষা মিষ্টি হতে পারে; তথ্যের ভাষা হওয়া চাই সোজা। চিনি কতটা আছে, সেটি জানিয়ে দিলে খাবারের প্রতি ভালোবাসা কমে যেতে পারে—কিন্তু চিকিৎসকের সঙ্গে পরবর্তী পরিচয়টি হয়তো কিছুটা পিছিয়ে যাবে।
ডিজিটাল জীবনেও নিশ্চিন্তির ঘাটতি। পাঠাওয়ের সাইবার নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ঘটনার পর কিছু ব্যবহারকারীর নাম, ই-মেইল ও ফোন নম্বর অননুমোদিত ব্যক্তিদের হাতে যাওয়ার কথা জানানো হয়েছে। তবে ১ কোটি ৯০ লাখ ব্যবহারকারীর তথ্য ফাঁসের দাবিটি স্বাধীনভাবে নিশ্চিত নয়। সংখ্যাটি সত্য হোক বা না হোক, ঘটনাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মোবাইল অ্যাপে কয়েকটি বোতাম টিপে আমরা যাতায়াত, খাবার ও অর্থ লেনদেনের ব্যবস্থা করি; সঙ্গে ব্যক্তিগত তথ্যও তুলে দিই। আগে পকেটমার পকেট থেকে মানিব্যাগ নিতেন, এখন তথ্য চুরি হলে পকেটের পাশাপাশি পরিচয়টিও ঝুঁকিতে পড়তে পারে। প্রযুক্তি আমাদের সময় বাঁচায়, কিন্তু নিরাপত্তার দায় এড়ানোর ছাড়পত্র দেয় না। অন্যদিকে, আজারবাইজানের বাকুতে সিআইসিএ শীর্ষ সম্মেলনে ইসরায়েলি প্রেসিডেন্টের বক্তব্যের সময় বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের ওয়াকআউটের খবর দেশের পররাষ্ট্রনীতির অবস্থান নিয়ে আলোচনা তৈরি করেছে। কূটনীতিতে কখনো বক্তব্যই প্রতিবাদ, কখনো নীরব প্রস্থানও বক্তব্য হয়ে ওঠে। তবে ওয়াকআউটের ছবির চেয়ে তার কূটনৈতিক ফলাফল বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সম্মেলনকক্ষ থেকে বেরিয়ে আসা সহজ; যে বার্তা নিয়ে বেরোনো হলো, সেটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কত দূর পৌঁছাল, আসল হিসাব সেখানে।
আজকের সম্পাদকীয় ভাবনায় সুন্দরবন ও রাজধানীর সড়ক—দুই ভিন্ন ভূগোল, অথচ অসুখের ধরন কিছুটা একই। সুন্দরবনে লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও সুপেয় পানির সংকট গাছপালা এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। গেওয়া ও কাঁকড়া গাছের বিস্তার, চারাগাছের মৃত্যু এবং বনের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার খবর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজন মনে করিয়ে দেয়। বনকে মানচিত্রে সংরক্ষিত ঘোষণা করা সহজ; তার নদী, মিঠাপানির উৎস ও প্রাণের বৈচিত্র্য বাঁচিয়ে রাখা কঠিন। ঢাকার সড়কের চিত্রও আলাদা কিছু নয়। যানজট, অবৈধ পার্কিং, ফুটপাত দখল ও ফিটনেসবিহীন যানবাহনের ভিড়ে শহর যেন প্রতিদিন নিজেকেই আটকে রাখে। ফুটপাত পথচারীর, কিন্তু পথচারী সেখানে হাঁটতে গেলে কখনো দোকান, কখনো মোটরসাইকেল, কখনো অন্য কোনো বাধার সঙ্গে সমঝোতা করতে হয়। গাড়ি চলে সড়কে, মানুষ হাঁটে ফুটপাতে—এটুকু বুঝতে যদি বিশেষজ্ঞ কমিটি লাগে, তবে সভার কার্যবিবরণী ছাপানোর জন্য আলাদা যানজটও লাগতে পারে। সুন্দরবনে প্রকৃতি পথ হারায় পানির অভাবে, ঢাকায় মানুষ পথ হারায় মানুষের তৈরি বিশৃঙ্খলায়। দুটো ক্ষেত্রেই পরিকল্পনার চেয়ে বাস্তবায়নের অভাব বেশি চোখে পড়ে।
সীমান্তের বাইরে ইয়েমেনের এডেন শহরে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ কমপ্লেক্সে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবর মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা বাড়িয়েছে। হামলার পর নিরাপত্তারক্ষী নিহত হওয়ার খবর এসেছে; হতাহতের সংখ্যা ও ঘটনার বিবরণে বিভিন্ন প্রতিবেদনের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। সংঘাতের মানচিত্রে প্রাসাদ, বিমানবন্দর ও জ্বালানি অবকাঠামো কৌশলগত লক্ষ্য করলেও প্রতিটি বিস্ফোরণের পর সাধারণ মানুষের জীবনই সবচেয়ে বেশি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ক্ষমতাবানদের হাতে যুদ্ধের মানচিত্র থাকে, সাধারণ মানুষের হাতে থাকে ঘরের চাবি—যুদ্ধ শুরু হলে সেই চাবি দিয়ে নিরাপত্তার দরজা খোলা যায় না। শুক্রবারের এই সকালে তাই আমাদের চাওয়া খুব সাধারণ: শ্রমের ন্যায্য দাম, নিয়মে মানবিকতা, প্রযুক্তিতে নিরাপত্তা, প্রকৃতির প্রতি দায়িত্ব এবং মানুষের জীবনের প্রতি সম্মান। রাষ্ট্রের সব হিসাবের শেষে মানুষটিই যেন বাদ না পড়ে। আর সম্ভব হলে, মানুষটিকে নিয়ে সভা করার আগে তাঁর কথা একবার শুনে নেওয়া হোক। সভার সময় বাঁচবে, মানুষের সময়ও। জুমা মোবারক।
লেখক: সাবেক সিনিয়র সচিব