শুভ সকাল। রাষ্ট্রেরও বোধ হয় ঘুম পায়। তবে মুশকিল হলো, তার ঘুম ভাঙানোর জন্য কখনো ঘণ্টা বাজাতে হয়, কখনো মিছিল করতে হয়, কখনো আবার ফেসবুকে ভিডিও ছাড়তে হয়। কক্সবাজার সদর হাসপাতালের লিফটের নিচে চার দিন ধরে একটি মরদেহ পড়ে থাকার খবরটি আমাদের সেই পুরোনো প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে—দায়িত্বে থাকা মানুষগুলো তখন কোথায় ছিলেন? যে হাসপাতালে মানুষ জীবনের শেষ আশাটুকু নিয়ে আসে, সেখানে একটি মৃতদেহ চার দিন ধরে অদৃশ্য থাকে কী করে? লিফটের কাজ মানুষকে ওপর-নিচে নেওয়া; দায়িত্ববোধেরও এমন ওঠানামা থাকলে বিপদ। সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভ ছড়িয়েছে, মানুষ জবাব চাইছে। কিন্তু রাষ্ট্রের চোখ খোলার জন্য প্রতিটি অবহেলাকে ভাইরাল হতে হবে কেন? তদন্ত হোক, দায় নির্ধারিত হোক, ব্যবস্থা নেওয়া হোক। মৃত মানুষটি আর ফিরবেন না, কিন্তু তাঁর নীরব উপস্থিতি যেন জীবিতদের বিবেককে জাগিয়ে রাখে।
রাষ্ট্রপতি নিরাপদ অভিবাসন, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং প্রবাসী ও প্রত্যাবর্তনকারী কর্মীদের অধিকার সুরক্ষার ওপর জোর দিয়েছেন। বাংলাদেশের অর্থনীতির সংসারে প্রবাসী আয় সেই উপার্জনশীল সন্তানের মতো, যার পাঠানো টাকায় বহু পরিবারের চুলা জ্বলে। অথচ সেই সন্তান বিদেশে যাওয়ার সময় কতটা নিরাপদ, কাজের বাজারে কতটা দক্ষ, আর ফিরে এলে তাঁর জন্য কী অপেক্ষা করে—সেসব প্রশ্নের উত্তর সব সময় ততটা উজ্জ্বল নয়। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও হরমুজ প্রণালী ঘিরে নিরাপত্তার উদ্বেগ বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে। দূরের সমুদ্রপথে উত্তেজনা দেখা দিলে তার ঢেউ এসে লাগে এ দেশের বাজারে, পরিবহন ব্যয়ে, এমনকি মধ্যবিত্তের মাসশেষের হিসাবেও। তাই জনশক্তি রপ্তানির সাফল্য শুধু কতজন গেলেন, সেই গণনায় শেষ হতে পারে না। কর্মী কত টাকা খরচ করে গেলেন, কত নিরাপদে কাজ করলেন, ন্যায্য মজুরি পেলেন কি না—এসবও জাতীয় অর্থনীতির হিসাবের খাতা থেকে বাদ দেওয়া চলে না।
বেনাপোল কাস্টমসে নির্ধারিত তালিকার বাইরে পণ্য পরিবহনে সহায়তার অভিযোগে দুই সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ও তিন সিপাইকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। সিসিটিভির ফুটেজে অনিয়ম ধরা পড়েছে, বিজিবি জব্দ করেছে ২ কোটি ৬৮ লাখ টাকার পণ্য। অভিযোগ প্রমাণিত হলে শাস্তি হওয়া উচিত, তবে সাময়িক বরখাস্তই যেন বিচারের শেষ পৃষ্ঠা না হয়। সরকারি দপ্তরে নিয়মের বই দিনের আলোয় খোলা থাকে, কিন্তু তার ব্যতিক্রম যদি রাতের অন্ধকারে লেখা হয়, তবে সেই বই পড়ে লাভ কী? অন্যদিকে, চাল, ডাল ও ভোজ্যতেলের দাম নিয়ন্ত্রণে বাজারে অভিযান চলছে; বিভিন্ন জেলায় চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ব্যবসায়ীদের প্রতিবাদও দেখা যাচ্ছে। বাজারে ক্রেতা চান ন্যায্য দাম, ব্যবসায়ী চান নিরাপদে ব্যবসা করার অধিকার। প্রশাসনের কাজ দুটিই নিশ্চিত করা। অভিযান করে ছবি তোলা সহজ; বাজারের অসাধু চক্রকে নিয়মের মধ্যে রাখা কঠিন। কিন্তু রাষ্ট্রের দক্ষতার পরীক্ষা সহজ কাজ দিয়ে হয় না, হয় কঠিন কাজটি কতটা নিয়মিত করা যায়, তা দিয়ে।
খাদ্যনিরাপত্তার প্রশ্নও আজ আলোচনায়। ট্রান্সকম বেভারেজেস লিমিটেডের উৎপাদিত জনপ্রিয় কোমল পানীয় সেভেন-আপে পরীক্ষাগারে মানহীন উপাদান পাওয়ার অভিযোগে বিশুদ্ধ খাদ্য আদালতে মামলা হয়েছে; শুনানির দিন ধার্য হয়েছে ১৬ নভেম্বর। অভিযোগের সত্যতা আদালতেই নির্ধারিত হবে। তবু ঘটনাটি মনে করিয়ে দেয়, বোতলের গায়ে পরিচিত নাম থাকলেই ভেতরের উপাদান নিয়ে প্রশ্ন করা যাবে না, এমন কোনো কথা নেই। বিজ্ঞাপন পণ্যের পরিচয় দেয়, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয় পরীক্ষার ফল ও কার্যকর তদারকি। এর বিপরীতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাদ ও উন্মুক্ত স্থানে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প চালুর খবর আশার কথা বলে। বিদ্যুৎ বিল সাশ্রয় এবং জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ যোগ করার এই উদ্যোগ সফল হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে। তবে সৌরপ্যানেল বসানোর ছবি দিয়ে উন্নয়নের অ্যালবাম পূর্ণ করলেই হবে না; কত বিদ্যুৎ উৎপাদিত হলো, কত টাকা বাঁচল, যন্ত্রপাতি কত দিন সচল থাকল—সেই হিসাবও প্রকাশ করতে হবে। সূর্যের আলো বিনা মূল্যে আসে, কিন্তু তাকে কাজে লাগানোর প্রকল্পে জনগণের টাকা খরচ হয়।
ক্রীড়া প্রশাসনে সাবেক অধিনায়ক ও তারকা খেলোয়াড়দের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাওয়া নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে আলোচনা চলছে। মাঠের অভিজ্ঞতা প্রশাসনে কাজে লাগতে পারে; একজন অধিনায়ক জানেন, খেলার ফল কেবল জার্সির নাম দিয়ে আসে না। তবে মাঠের তারকা হলেই প্রশাসনের পরীক্ষায় পূর্ণ নম্বর পাওয়া যায় না। সেখানে দরকার পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা, যোগ্যতা ও জবাবদিহি। আজকের সম্পাদকীয় আলোচনায়ও দুটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব দাবি করে—মধ্যপ্রাচ্যের সংকটে রেমিট্যান্স ও জ্বালানি ব্যয়ের ঝুঁকি, এবং সরকারের নীতিনির্ধারক ও উপদেষ্টাদের কার্যকারিতা। সংকটের সময় বৈঠকের সংখ্যা বাড়ে, বিবৃতির দৈর্ঘ্যও বাড়ে; জনগণ শুধু জানতে চায়, তাতে তাদের জীবনে কী বদল এল। প্রশাসনিক সংস্কারের সাফল্যও ফাইলের মলাটে নয়, নাগরিকের অভিজ্ঞতায় ধরা পড়ে। কোনো দপ্তরে কাজের জন্য দিনের পর দিন ঘুরতে না হলে, কোনো সিদ্ধান্তের জন্য পরিচয়ের দরকার না পড়লে, কোনো অভিযোগের উত্তর সময়মতো মিললে মানুষ বুঝবে—সংস্কার সত্যিই দরজায় পৌঁছেছে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে হরমুজ প্রণালী ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তাকে সামনে এনেছে। তেল পরিবহনের পথে অনিশ্চয়তা বাড়লে বাজারে দামের ওঠানামা শুধু অর্থনীতিবিদদের চার্টে সীমাবদ্ধ থাকে না; তার প্রভাব পড়ে পরিবহন ভাড়া, পণ্যের মূল্য এবং আমদানিনির্ভর দেশের বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদায়। বাংলাদেশের জন্য তাই পরিস্থিতির ওপর নজর রাখা এবং বিকল্প প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি। জ্বালানির বাজারে ঝড় উঠলে ছাতা খুঁজতে যাওয়ার চেয়ে আগে থেকেই ছাদ মেরামত করা বুদ্ধিমানের কাজ। আমদানি ব্যয় সামলানো, জ্বালানির অপচয় কমানো এবং প্রবাসী আয়ের প্রবাহ সুরক্ষিত রাখা—এই তিনটি ক্ষেত্রেই আগাম পরিকল্পনার প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক সংকট আমাদের হাতে তৈরি নয়, কিন্তু তার অভিঘাত কতটা সামলাতে পারব, সেই প্রস্তুতির দায় আমাদেরই।
সপ্তাহের শেষ কর্মদিবসে এসে কথাটা আবার সেই হাসপাতালের লিফটের কাছেই ফিরে যায়। একটি মরদেহ চার দিন পড়ে থাকা, কাস্টমসে অনিয়ম, বাজারে চাঁদাবাজি, খাদ্যপণ্যের মান নিয়ে অভিযোগ—এসব আলাদা আলাদা খবর হলেও অসুখের গোড়ায় একই প্রশ্ন: যার যে দায়িত্ব, তিনি কি তা পালন করছেন? রাষ্ট্রের সাফল্য মাপতে খুব জটিল তত্ত্ব লাগে না। একজন রোগী হাসপাতালে মর্যাদা পেলেন কি না, একজন কর্মী বিদেশে নিরাপদে গেলেন কি না, একজন ক্রেতা ন্যায্য দামে পণ্য কিনতে পারলেন কি না, আর জনগণের টাকায় নেওয়া প্রকল্প সত্যিই মানুষের কাজে লাগল কি না—এই ছোট প্রশ্নগুলোর উত্তরেই বড় রাষ্ট্রের পরিচয়। আশ্বাসের বাজারে আমাদের আরেকটি নতুন পণ্য দরকার নেই। দরকার পুরোনো প্রতিশ্রুতির বাস্তব সরবরাহ। দিনটি হোক কথার চেয়ে কাজের, আর ক্ষমতার চেয়ে দায়িত্বের হিসাব মেলানোর।
লেখক: সাবেক সিনিয়র সচিব




