Dhaka Mail Logo

মতামত

শিক্ষা-শিল্পের সংযোগ: চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় করণীয়

ঢাকা মেইল ডেস্ক

২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:০৫ পিএম

বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে, উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ বেড়েছে এবং প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ স্নাতক ডিগ্রি নিয়ে শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। একই সময়ে শিল্প ও সেবা খাতও দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন, ডেটা অ্যানালিটিকস ও ডিজিটাল প্রযুক্তি কর্মক্ষেত্রের ধরনই পাল্টে দিচ্ছে। তাই এখন প্রশ্ন হচ্ছে-আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ কি একই গতিতে বদলাচ্ছে?

বাস্তবতা খুব স্বস্তিদায়ক নয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রম জরিপ-২০২৪ প্রতিবেদন অনুযায়ী, উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১৩.৫ শতাংশ এবং বেকার স্নাতকের সংখ্যা প্রায় ৮ লাখ ৮৫ হাজার। অর্থাৎ একদিকে শিল্পপ্রতিষ্ঠান দক্ষ কর্মীর অভাবের কথা বলছে, অন্যদিকে লাখ লাখ উচ্চশিক্ষিত তরুণ কাজ পাচ্ছেন না। এই আপাতবিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা—বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্জিত শিক্ষা ও শ্রমবাজারে প্রয়োজনীয় দক্ষতার মধ্যে ব্যবধান।

বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পখাতের কার্যকর সহযোগিতা এই ব্যবধান কমাতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশে শিক্ষা ও শিল্পের সংযোগ এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। এর পেছনে অনেক কারণ ও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আমি নিজে একটি গবেষণা করতে গিয়ে একটি ’পলিসি পেপার’ তৈরি করেছি। সে বিষয়ে নীতি নির্ধারকদের সাথে আলোচনা যেতে পারে। যাহোক, এখানে আমি পাঁচটি বড় চ্যালেঞ্জ নিয়ে অল্প বিস্তার আলোচনা করছি।

১. বিশ্ববিদ্যালয় শেখাচ্ছে এক জিনিস, কর্মক্ষেত্র চাইছে আরেকটি

প্রথম এবং সম্ভবত সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো কারিকুলাম-এর সাথে দক্ষতার অমিল (curriculum–skills mismatch) । অনেক ক্ষেত্রে পাঠ্যক্রমে বিষয়ভিত্তিক তাত্ত্বিক জ্ঞানের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হলেও চাকরির বাজার চাইছে তার চেয়ে বেশি কিছু। যেমন-professional communication, English proficiency, critical thinking, problem-solving, teamwork, digital literacy, data analysis এবং নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর সক্ষমতা।

বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ বিষয়ক বিশ্লেষণেও দক্ষতার অমিল এবং কর্মসংস্থান উপযোগী দক্ষতার ঘাটতির বিষয়টি উঠে এসেছে। অর্থাৎ শিক্ষার্থী পরীক্ষায় ভালো ফল করছেন, কিন্তু সেই ফল সব সময় কর্মক্ষেত্রে পারফরমেন্স-এ রূপান্তরিত হচ্ছে না।

এর সমাধানে পাঠ্যক্রম তৈরির টেবিলে শিল্পখাতকে বসাতে হবে। প্রতিটি discipline বা faculty-তে কার্যকর Industry Advisory Committee গঠন করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। নিয়োগদাতা কী ধরনের দক্ষতা চাইছেন, আগামী পাঁচ বছরে কোন দক্ষতার চাহিদা বাড়বে এবং প্রযুক্তি কীভাবে সংশ্লিষ্ট পেশাকে বদলে দিচ্ছে-এই তথ্য নিয়মিতভাবে পাঠ্যক্রমে প্রতিফলিত করতে হবে।

২. সমঝোতা স্মারক  হচ্ছে, কিন্তু কার্যকর সহযোগিতা কতটা হচ্ছে?

বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রায়ই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের খবর পাওয়া যায়। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন করা দরকার—সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর কী হলো? কতজন শিক্ষার্থী internship পেলেন? কতটি যৌথ গবেষণা হলো? কতজন industry expert শ্রেণিকক্ষে গেলেন? বিশ্ববিদ্যালয়ের কতজন শিক্ষক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বাস্তব সমস্যা নিয়ে গবেষণা করলেন? কতজন গ্রাজুয়েট সরাসরি কর্মসংস্থানের সুযোগ পেলেন? এসব প্রশ্নের উত্তর না থাকলে MoU মূলত আনুষ্ঠানিক দলিলেই সীমাবদ্ধ থাকে।

এখানেই দ্বিতীয় বড় সমস্যা—স্থায়ী institutional mechanism-এর অভাব। ইউজিসি ইতোমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষা–শিল্প সহযোগিতা জোরদার করার উদ্যোগ নিয়েছে। এখন প্রয়োজন এটিকে প্রাতিষ্ঠানিক ও ফলাফলভিত্তিক করা।

প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কার্যকর University–Industry Collaboration and Employability Unit প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। তবে শুধু নতুন একটি অফিস খুললেই হবে না। এর নির্দিষ্ট জনবল, বাজেট, বার্ষিক কর্মপরিকল্পনা এবং measurable performance indicators থাকতে হবে। বছরে কয়টি internship, industry project, joint research, guest lecture ও graduate placement হয়েছে—তার হিসাব প্রকাশ করতে হবে।

৩. বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা হচ্ছে, শিল্পে তার ব্যবহার কোথায়?

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার পরিমাণ বাড়ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই গবেষণার কতটা দেশের শিল্প, ব্যবসা ও সেবা খাতের বাস্তব সমস্যা সমাধান করছে?

অন্যদিকে শিল্পপ্রতিষ্ঠানেরও সমস্যা আছে—উৎপাদনশীলতা, প্রযুক্তি গ্রহণ, product development, management, supply chain, marketing, human resource development কিংবা digital transformation ইত্যাদি নিয়ে। অথচ এসব সমস্যা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পখাতের যৌথ গবেষণা এখনো সীমিত।

বিআইডিএস-এর স্কিল গ্যাপ গবেষণাতেও শিক্ষা-শিল্প সংযোগ, যুগোপযোগী কারিকুলাম এবং গবেষণা অবকাঠামোর দুর্বলতার বিষয় উঠে এসেছে। এসব ব্যবধান কমাতে Industry–University Joint Research Fund গঠন করা যেতে পারে। শিল্পপ্রতিষ্ঠান বাস্তব সমস্যা চিহ্নিত করবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা সমাধান নিয়ে কাজ করবেন এবং প্রয়োজনে সরকার matching grant দেবে। গবেষকের মূল্যায়নেও শুধু journal publication নয়—patent, prototype, consultancy, industry-funded research এবং বাস্তব সমস্যার সমাধানকে গুরুত্ব দিতে হবে।

আরও পড়ুন

উচ্চশিক্ষার সংকট ও চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় করণীয় কী?

ইউজিসি’র ICSETEP-এর competitive R&D grant-এ Academy–Industry Collaboration-এর জন্য অর্থায়নের ব্যবস্থা এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এটিকে প্রকল্পনির্ভর না রেখে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থায় রূপ দেওয়া প্রয়োজন।

৪. Internship যদি শুধু সনদ হয়, দক্ষতা তৈরি হবে কীভাবে?

শিক্ষার্থী চার বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লেন, ভালো ফল করলেন; কিন্তু বাস্তব প্রতিষ্ঠানে কাজ করার অভিজ্ঞতা ছাড়াই চাকরির বাজারে প্রবেশ করলেন। চাকরিতে গিয়ে প্রথমবার তাঁকে শিখতে হচ্ছে professional communication, deadline, teamwork, client handling কিংবা workplace problem-solving। তাহলে উচ্চশিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রের মধ্যে একটি বড় অংশ অনুপস্থিত থেকে যাচ্ছে।

এই জায়গায় work-based learning অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। Internship-কে শুধু কয়েক সপ্তাহের আনুষ্ঠানিকতা বা একটি certificate সংগ্রহের ব্যবস্থায় সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। Discipline-এর প্রকৃতি অনুযায়ী internship, apprenticeship, field attachment, live project, consultancy assignment কিংবা real-world problem solving শিক্ষার অংশ করতে হবে। শিল্পপ্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীর performance মূল্যায়ন করবে এবং সেই মূল্যায়ন academic credit-এর অংশ হতে পারে। এতে শিক্ষার্থী চাকরি পাওয়ার আগেই কর্মক্ষেত্রের বাস্তবতা সম্পর্কে ধারণা পাবেন।

Edu

৫. দায় কার—বিশ্ববিদ্যালয়ের, না শিল্পখাতের?

সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাটি মানসিকতার। বিশ্ববিদ্যালয় মনে করতে পারে—আমাদের দায়িত্ব শিক্ষা দেওয়া, চাকরি দেওয়া শিল্পখাতের কাজ। আবার শিল্পপ্রতিষ্ঠান বলতে পারে—আমরা কেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীকে প্রশিক্ষণ দেব? বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই তো job-ready graduate আসার কথা।

দুই পক্ষের এই অবস্থানের মাঝখানেই শিক্ষার্থী আটকে যাচ্ছেন। বাস্তবতা হলো, ভবিষ্যতের দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি shared responsibility দরকার। বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পখাত এবং সরকার—তিন পক্ষকেই দায়িত্ব নিতে হবে।

শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে curriculum development, guest teaching, internship, laboratory support ও research funding-এ যুক্ত হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে। একইভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের performance assessment-এ graduate employment, employer satisfaction, internship completion, industry-funded research এবং joint innovation-এর মতো সূচক অন্তর্ভুক্ত করা দরকার।

বিচ্ছিন্ন প্রকল্প নয়, প্রয়োজন জাতীয় কাঠামো

বাংলাদেশে HEAT, ICSETEP এবং বিভিন্ন skills-development initiative-এর মাধ্যমে উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও কর্মসংস্থান সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এগুলো ইতিবাচক। কিন্তু প্রকল্প শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে academia–industry collaboration-ও দুর্বল হয়ে পড়লে দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়া যাবে না।

তাই এখন প্রয়োজন শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি’র নেতৃত্বে একটি National Academia–Industry Collaboration Framework। এই কাঠামোর অন্তত ছয়টি বাধ্যতামূলক উপাদান থাকা উচিত—নিয়মিত labour-market intelligence, industry participation in curriculum review, structured internship/work-based learning, joint R&D funding, industry experts-এর teaching engagement এবং graduate tracer study ও employer feedback।

বিশ্ববিদ্যালয় কতজন গ্রাজুয়েট তৈরি করেছে—শুধু এই সংখ্যা দিয়ে উচ্চশিক্ষার সাফল্য বিচার করার সময় শেষ হয়ে আসছে। প্রশ্ন করতে হবে—তাদের কতজনের অর্জিত জ্ঞান বাস্তব কর্মক্ষেত্রে প্রয়োগযোগ্য? কতজন নতুন জ্ঞান ও উদ্ভাবন সৃষ্টি করতে পারছেন? আর কতজন সম্মানজনক কর্মসংস্থানে প্রবেশ করতে পারছেন?

আরও পড়ুন

প্রাসঙ্গিক প্রযুক্তিজ্ঞানই হতে পারে আগামীর বড় সম্পদ

প্রায় ৮ লাখ ৮৫ হাজার বেকার স্নাতকের পরিসংখ্যান তাই শুধু বেকারত্বের সংখ্যা নয়; এটি আমাদের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার জন্য একটি সতর্কবার্তা।

রাষ্ট্র উচ্চশিক্ষায় অর্থ ব্যয় করছে, পরিবার তার সঞ্চয় ব্যয় করছে এবং একজন তরুণ জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে বিনিয়োগ করছেন। এত বড় বিনিয়োগের পর যদি ডিগ্রি ও কর্মদক্ষতার মধ্যে ব্যবধান থেকে যায়, তাহলে ক্ষতিটা শুধু একজন বেকার তরুণের নয়—ক্ষতিটা জাতীয় অর্থনীতিরও।

ডিগ্রি থেকে দক্ষতা, দক্ষতা থেকে কর্মসংস্থান এবং গবেষণা থেকে উদ্ভাবন—এই সংযোগটিই এখন তৈরি করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পখাতের মাঝখানের দেয়াল যত দ্রুত ভাঙবে, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা তত দ্রুত অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের প্রকৃত চালিকাশক্তিতে পরিণত হবে।

লেখক: গভর্ন্যান্স অ্যান্ড পলিসি অ্যানালাইসিস এক্সপার্ট এবং প্রফেসর, লোকপ্রশাসন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়