বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

প্রাসঙ্গিক প্রযুক্তিজ্ঞানই হতে পারে আগামীর বড় সম্পদ

মো. মুখলেছুর রহমান
প্রকাশিত: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৫৪ এএম

শেয়ার করুন:

প্রাসঙ্গিক প্রযুক্তিজ্ঞানই হতে পারে আগামীর বড় সম্পদ
মো. মুখলেছুর রহমান। ছবি: সংগৃহীত

ভবিষ্যতে একাডেমিক সার্টিফিকেটের মূল্য কতটা থাকবে- তার চূড়ান্ত উত্তর পেতে আর হয়তো খুব বেশিদিন অপেক্ষা করতে হবে না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) অকল্পনীয় অগ্রগতি শিক্ষাব্যবস্থা, কর্মসংস্থান এবং দক্ষতার ধারণা অভূতপূর্ব ধারনার জন্ম দিতে যাচ্ছে। এমন এক সময়ের মধ্য দিয়ে আমরা অতিক্রম করছি, যখন প্রযুক্তির উৎকর্ষতা সাধিত হচ্ছে কল্পনাতীতভাবে।  পৃথিবী যে দ্রুততার সাথে অগ্রসর হচ্ছে তাতো দিবালোকের মতো স্পষ্ট।

কিছুদিন আগে এআই ছিল মূলত প্রযুক্তিবিদদের আলোচনার বিষয়; এখন সাধারণ মানুষও লেখালেখি, অনুবাদ, গবেষণা, তথ্য বিশ্লেষণ, ছবি তৈরি, প্রোগ্রামিংসহ নানা কাজে এআই ব্যবহার করে চলেছে। যে কাজের জন্য একজন কর্মী প্রয়োজন, সেটিই একটি এআই সিস্টেম কয়েক সেকেন্ডে করে দিতে পারছে।

প্রযুক্তি থেমে নেই। সুপারইন্টেলিজেন্স (Superintelligence) এর ধারনা শুরু হয়েছে। এর অর্থ এমন একটি এআই ব্যবস্থা, যা মানুষের প্রায় সব ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক কাজে সবচেয়ে মেধাবী মানুষদেরও ছাড়িয়ে যেতে পারে। এটি একটি সম্ভাব্য ধারনা, নিশ্চিত বাস্তবতা নয়। তবে এআই গবেষকদের একটি অংশ মনে করেন, এমন প্রযুক্তি খুব দ্রুতই চলে আসবে বাজারে।  সাবেক Openএআই গবেষক ড্যানিয়েল ককোটাজলো ও তাঁর সহকর্মীরা এআই-এর দ্রুত বিকাশ নিয়ে যে পূর্বাভাস দিয়েছেন, সেখানে মানুষের তুলনায় অত্যন্ত সক্ষম এআই-এর সম্ভাব্য উত্থান এবং এর ঝুঁকি নিয়ে গুরুতর সতর্কতা রয়েছে।

ককোটাজলো নিজেও এখন এআই উন্নয়নের প্রতিযোগিতা ধীর করা এবং সরকারগুলোর আগেভাগে প্রস্তুতি নেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তাঁর সাম্প্রতিক বক্তব্যের মূল উদ্বেগ হলো—এআই যদি মানুষের নিয়ন্ত্রণ ও নীতিনির্ধারণের সক্ষমতার চেয়ে দ্রুত এগিয়ে যায়, তাহলে সমাজের প্রস্তুতির সময় অত্যন্ত কমে যেতে পারে।

এখানেই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। ধরা যাক, একটি এআই কয়েক সেকেন্ডে একটি দীর্ঘ প্রতিবেদন লিখতে পারে, বানান ও ভাষার ভুল সংশোধন করতে পারে, অনুবাদ করতে পারে, হিসাব করতে পারে, তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারে এবং একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর গবেষণার প্রাথমিক কাঠামো তৈরি করতে পারে। তাহলে শুধু এসব কাজ করার সক্ষমতার প্রমাণ হিসেবে একটি সার্টিফিকেটের প্রয়োজনীয়তা আর থাকবে না।

বানান সংশোধন, হিসাব, অনুবাদ, গ্রাফিক ডিজাইন, কাস্টমার সার্ভিস, সফটওয়্যার কোডিং—অসংখ্য ক্ষেত্রেই এআই মানুষের উপযোগিতা ধারণাতীত ভাবে হ্রাস করে দিচ্ছে।

এআই যদি রোবটের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন বিষয়টি আরও জটিল আকার ধারণ করবে। এআই-চালিত রোবট শারীরিক কাজ করতে পারবে; স্বয়ংক্রিয় যানবাহন পরিবহনব্যবস্থাকে বদলে দিতে পারে; শিল্পকারখানা আরও বেশি স্বয়ংক্রিয় হতে পারে। ফলে শুধু অফিসের চাকরি নয়, কৃষি, উৎপাদন, পরিবহন ও সেবাখাতেও মানুষের প্রচলিত ভূমিকা আশংকাজনকভাবে হ্রাস পেতে পারে।

আরও পড়ুন

বিশ্ববাজারে হালাল অর্থনীতির বিস্ময়কর উত্থান ও বাংলাদেশ

এ কথা হলফ করে বলা মুশকিল, এআই ভবিষ্যতে মানুষের সব কাজ করে ফেলবে কিংবা কয়েক বছরের মধ্যেই সব সার্টিফিকেট অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাবে—এমন দাবি নিশ্চিত সত্য হিসেবে গ্রহণ করা সমীচীন হবে না।

ইতিহাস বলে, প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনেক পূর্বাভাসই ভুল প্রমাণিত হয়েছে। তবে এসব বৈজ্ঞানিক পূর্বাভাস থেকে প্রস্তুতি ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে। যদি ভবিষ্যৎবাণী সত্য প্রমাণিত হয় তাহলে যে অপূরনীয় ক্ষতি সাধিত হবে তা পূরণ করতে সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে নিজেদের যোগ্যতা কে শানিত করতে হবে, শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করতে হবে।

সৃজনশীলতা, নৈতিক বিচারবোধ, নেতৃত্ব, সহমর্মিতা, যোগাযোগ, সমালোচনামূলক চিন্তা, সমস্যা চিহ্নিত করার ক্ষমতা, দল পরিচালনা, বাস্তব পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং নতুন কিছু শেখার সক্ষমতা—এসব দক্ষতার গুরুত্ব বরং বাড়তে পারে।

এ কারণে সার্টিফিকেটের প্রয়োজন একেবারে শেষ হয়ে যাবে—এমনটা বলা বোধহয় ঠিক হবে না। চিকিৎসক, প্রকৌশলী, আইনজীবী কিংবা অন্যান্য পেশায় যোগ্যতা যাচাইয়ের জন্য আনুষ্ঠানিক শিক্ষা ও স্বীকৃত সনদের প্রয়োজন থাকবে। কিন্তু সার্টিফিকেট আর যোগ্যতার একমাত্র প্রমাণ হিসেবে টিকে থাকবে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন। নিয়োগদাতারা হয়তো ক্রমেই দেখবেন একজন মানুষ বাস্তবে কী করতে পারেন, কত দ্রুত নতুন কিছু শিখতে পারেন এবং এআই-কে কতটা কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারেন। অর্থাৎ ভবিষ্যতের শিক্ষা হবে শুধু ‘কী জানি’-এর শিক্ষা নয়; বরং ‘কী করতে পারি’ এবং ‘কীভাবে নতুন কিছু শিখতে পারি’—তার শিক্ষা।

AI

এখানে বাংলাদেশের জন্য একটি বিশেষ শিক্ষা রয়েছে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এখনো অনেকাংশে পরীক্ষা, নম্বর ও সার্টিফিকেটকেন্দ্রিক। একটি পরীক্ষায় ব্যর্থ হলে একজন শিক্ষার্থী নিজেকে ব্যর্থ মানুষ মনে করে বসে। অথচ একটি পরীক্ষার ফলাফল কখনো একজন মানুষের পুরো জীবন, মেধা কিংবা সম্ভাবনার মূল্য নির্ধারণ করতে পারে না।

পরীক্ষায় ব্যর্থতা জীবনে ব্যর্থতা নয়। সার্টিফিকেট গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কিন্তু মানুষের মূল্য সার্টিফিকেটে নির্ধারিত হয় না।

প্রযুক্তির এই দ্রুত পরিবর্তনের যুগে শিক্ষার উদ্দেশ্যও তাই বদলাতে হবে। একজন শিক্ষার্থীকে শুধু একটি চাকরির জন্য প্রস্তুত করলে চলবে না; তাকে এমন পৃথিবীর জন্য প্রস্তুত করতে হবে, যেখানে আজকের চাকরিটি আগামীকাল নাও থাকতে পারে।

আরও পড়ুন

ইসলামি ব্যাংকগুলো থেকে অর্থপাচার ও শরিয়াহ বোর্ডের দায়

শিক্ষার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত শেখার সক্ষমতা তৈরি করা। কারণ এআই যত দ্রুতই এগিয়ে যাক, ভবিষ্যতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানবিক দক্ষতাগুলোর একটি হবে—নিজেকে ক্রমাগত নতুন করে তৈরি করার ক্ষমতা।

আমরা এমন এক প্রজন্ম, যারা ইন্টারনেটবিহীন পৃথিবী থেকে স্মার্টফোন ও এআই-এর পৃথিবীতে এসে পৌঁছেছি। পরিবর্তনের গতি এত দ্রুত যে কয়েক ঘণ্টা অনলাইনের বাইরে থাকলেও মনে হয় পৃথিবীতে অনেক কিছু ঘটে গেছে। আগামী দশক আরও দ্রুত পরিবর্তিত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

‘আপনার সার্টিফিকেট কী?’ এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হতে পারে ‘আপনি কতটা প্রাসঙ্গিক?’, ‘আপনি কী করতে পারেন?’, ‘নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে কত দ্রুত মানিয়ে নিতে পারেন?’

সার্টিফিকেট তখনও থাকবে, বিশ্ববিদ্যালয়ও থাকবে, শিক্ষকও থাকবেন। কিন্তু শিক্ষার অর্থ বদলাতে হবে। মুখস্থ জ্ঞান ও পরীক্ষার ফলের চেয়ে মানুষের বিচারবোধ, সৃজনশীলতা, নৈতিকতা, দক্ষতা এবং শেখার ক্ষমতাকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।

এআই মানবজাতির জন্য আশীর্বাদ হবে, নাকি অভিশাপ  হবে—তার উত্তর সময়ই বলবে। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত: এআই-এর যুগে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ হতে পারে কালের বিবর্তনে পরিবর্তিত জ্ঞান বিজ্ঞান ও শিক্ষার সাথে নিজেদের তাল মিলিয়ে চলতে পারার অক্ষমতা।

মানুষকে সমকালিন পরিবেশ পারিপার্শ্বিকতা বিবেচনায় , প্রাসঙ্গিক থাকতেই হবে।  প্রাসঙ্গিকতার ভিত্তি সার্টিফিকেট নয়; জ্ঞান, দক্ষতা, বিবেচনাবোধ, মানবিকতা এবং আজীবন শেখার সক্ষমতা।

লেখক: অর্থনীতিবিদ, সমাজ ও রাষ্ট্রচিন্তক, শিক্ষাবিদ ও মানবাধিকার কর্মী

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর