ঢাকা মেইল ডেস্ক
১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৫৬ পিএম
মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে রাষ্ট্রের দুইজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির মুখে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়ে অত্যন্ত কঠোর দুটি মন্তব্য মিডিয়ার মাধ্যমে আমরা দেশবাসী জানতে পেরেছি। জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেছেন, ‘অধিকাংশ সরকারি কর্মকর্তা চোর।’ এর পরদিন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেছেন, সরকারি চাকরিজীবীদের কাজ হলো ‘কিছু চুরি করা, কিছু কাজ করা।’ বক্তব্য দুটি নিঃসন্দেহে জনমনে আলোড়ন সৃষ্টি করার মতো। কারণ দুর্নীতি নিয়ে সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের ক্ষোভের সঙ্গে এগুলোর মিল রয়েছে। কিন্তু লোকপ্রশাসনের দৃষ্টিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো-অধিকাংশই সরকারি কর্মকর্তারা যদি সত্যিই এত ব্যাপকভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত হন, চোর হোন, তবে তাদের নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব কার? আর দায় কার?
১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ভোলার তজুমদ্দিনে সরকার দলীয় লোকজনের সাথে এক মতবিনিময় সভায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতি, ঘুষ ও লুটপাট নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেন। দেশের শীর্ষস্থানীয় সব মিডিয়া ফলাওভাবে তাঁর বক্তব্য ‘অদ্ভুত দেশ আমাদের! অধিকাংশ সরকারি কর্মকর্তা চোর: স্পিকার’ শিরোনামে প্রকাশ/প্রচার করে।
এর দু’দিন পর ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ লক্ষ্মীপুরে সরকারি কর্মকর্তা ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিদের সঙ্গে মত বিনিময়কালে পরিবেশ মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু সরকারি চাকরিজীবীদের নিয়ে ‘কিছু চুরি, কিছু কাজ’ মন্তব্য করেন। মন্ত্রীর বক্তব্যও একইভাবে ফলাওভাবে মিডিয়া প্রচার করে।
এখন প্রশ্ন ওঠে-রাষ্ট্রের এত উচ্চপর্যায় থেকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পর্কে এমন মূল্যায়ন এলে, এর দায় কার? আর রাষ্ট্রের করণীয় কী?
একজন সাধারণ নাগরিক ভূমি অফিস, হাসপাতাল, থানা কিংবা অন্য কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানে হয়রানির শিকার হয়ে ক্ষোভের বশে বলতে পারেন- ‘সরকারি অফিসে সবাই চোর।’ তাঁর বক্তব্য অভিজ্ঞতা ও ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু একজন স্পিকার বা মন্ত্রীর অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাঁরা রাষ্ট্র ক্ষমতার কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাদের হাতে বা তাদের প্রতিনিধিত্ব করা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার হাতে রয়েছে আইন, প্রশাসন, তদন্ত, অডিট, বিভাগীয় ব্যবস্থা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা। তাই রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল ব্যক্তি যখন বলেন ‘অধিকাংশ সরকারি কর্মকর্তা চোর’, তখন স্বাভাবিকভাবেই পাল্টা প্রশ্ন আসে, তাহলে রাষ্ট্র তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না কেন? আর যদি রাষ্ট্র ব্যবস্থা নিতে না পারে, তাহলে সেটি শুধু কর্মকর্তাদের ব্যর্থতা নয়; সেটি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ, তদারকি ও জবাবদিহি ব্যবস্থারও ব্যর্থতা।
শিরোণাম দেখে প্রশাসন ক্যাডারের আমার স্বজন-বন্ধুরা হয়তো ভাববেন, আমি তাদেরকে আক্রমণ করে লিখছি। তাঁরা কেন এমন ভাববেন? আমলাতন্ত্র মানে কি তাহলে শুধু প্রশাসন ক্যাডার? না। তাহলে জনসাধারণের মধ্যে কেন এমন ধারণা হলো যে, আমলাতন্ত্র মানে শুধু প্রশাসন ক্যাডার। এই ধারণা কি জনগণ প্রতিষ্ঠিত করেছে নাকি প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা তাদের কর্মকাণ্ড বা আধিপত্য (ডমিনেন্ট আচরণ) দিয়ে এটি প্রতিষ্ঠিত করেছেন? সেটি হলে, তার দায় তো ‘প্রশাসন ক্যাডারেরই।’ অন্য কারো নয়। মূলত ‘আমলাতন্ত্র’ বলতে প্রজাতন্ত্রে নিয়োজিত সকল কর্মচারীকেই বোঝানো হয়। সকল ক্যাডারের কর্মকর্তাকেই বুঝায়।
যাহোক, আমি অবাক বিস্ময়ে পর্যবেক্ষণ করলাম যে, স্পিকার বা মন্ত্রীর মন্তব্যের কোন প্রতিবাদ কোন ক্যাডার থেকেই করা হয়নি। যদিও তাদের প্রত্যেকের সমিতি আছে। আবার ব্যাচভিত্তিক সমিতিও আছে। নানা সময়ে তাঁরা তাদের স্বার্থের বিপরীতে সরকারি কোনো সিদ্ধান্ত হলে ‘হুংকার’ বা ‘হুমকি’ কিংবা ‘প্রতিবাদ’ আসে। তাঁরা সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নীতি নির্ধারকদের সাথে দেখা করে। নিজেদের স্বার্থ ঠিক রাখে। উদাহরণস্বরূপ, কর্মকর্তাদের সুদমুক্ত ঋণ সুবিধার আওতায় প্রাপ্ত গাড়ির মেইনটেইনেন্স বাবদ ৫০ হাজার টাকা থেকে ২৫ হাজার টাকা করার অফিস আদেশ জারি হলে সবাইকে সরব হতে দেখা যায় এবং সরকার বাধ্য হয় সেই অফিস আদেশ প্রত্যাহার করে। আবার বিদেশে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণে পূর্ণ বেতনে ছুটি (ডেপুটেশনে) বাতিল করলেও কর্মকর্তাদের সরব হতে দেখা যায়। সরকার বাধ্য হয়ে পূর্ণ বেতনে ছুটির নিয়ম বহাল রাখে। অন্তবর্তীকালীন সরকারের সময় জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের পদোন্নতি ক্ষেত্রে অন্যান্য ক্যাডারের সাথে প্রশাসন ক্যাডারের দ্বন্দ্ব দৃষ্টিকটু ভাবে প্রতিবাদ-পাল্টা প্রতিবাদ আমরা দেখেছি। কিন্তু স্পিকার ও মন্ত্রীর মন্তব্যের ব্যাপারে ‘সবাইকে’ চুপ থাকতে দেখে একথা জনগণ বিশ্বাস করছে যে, স্পিকার ও মন্ত্রীর বক্তব্য সরকারি কর্মকর্তারা মেনে নিয়েছেন। তাঁরা এসব দোষে দুষ্ট। তাহলে আমলাতন্ত্র এই ‘দায়’ স্বীকার করে নিচ্ছে বলে অনুমান করা যায়। অধিকন্তু, এতদিন যারা ‘শুদ্ধাচার’ পুরস্কার পেলেন তাঁরা কোথায়? তাঁরাও কেন চুপ? তাহলে কি ‘শুদ্ধাচার’ পুরস্কার প্রাপ্তরা সবাই ‘বেনজির মার্কা’ অফিসার (পলাতক পুলিশের সাবেক আইজি বেনজির আহমেদ)? এই প্রশ্ন যদি জনসাধারণ ও সচেতন নাগরিক তোলে, তাহলে উত্তর কী?
এখানেই বাংলাদেশের দুর্নীতিবিরোধী আলোচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা রয়েছে। দুর্নীতিকে প্রায়ই এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যেন এটি শুধুই আমলাতন্ত্রের সমস্যা।
আরও পড়ুন
সাইনবোর্ড বদলেছে, স্বভাব বদলাবে তো?
কিন্তু বাস্তব শাসনব্যবস্থা এত সরল নয়। জনপ্রশাসনের দৃষ্টিতে আলোচনা করলে এবং বাংলাদেশের আমলাতন্ত্রের অতীত ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমলাতন্ত্রের এই ‘দায়’ (চোরতন্ত্র বা কিছু চুরি, কিছু কাজ) রাজনীতিকদের ওপরও বর্তায়। কেননা, আমরা ‘তোফায়েল ক্যাডার’ এর কথা জানি। এরপর জনতার মঞ্চের ইতিহাসের কথাও জানি। চব্বিশের জুলাই বিপ্লব পূর্ববর্তী প্রায় ১৭ বছরের আমলাতন্ত্র তো আমলাতন্ত্র ছিল না। ‘আওয়ামীতন্ত্র’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিল। রাজনীতিকরাই তো সেটি প্রতিষ্ঠিত করেছিল। বর্তমান নির্বাচিত সরকারের আমলেও একই পদ্ধতির পদধ্বনি শোনা যায়। ওএসডি না বলে এখন ‘সংযুক্তি’ বলা হচ্ছে। এক পুলিশ কর্মকর্তা ‘ঘুষের বিনিময়ে পোস্টিং’ পাওয়ার ওয়াদা করে পোস্টিংয়ের পর আর ঘুষের বাকি টাকা না দেওয়ার অভিযোগের কথাও স্যোসাল মিডিয়ায় ঘোরাঘুরি করছে।
অপর দিকে, আরেকটু গভীরে প্রবেশ করলে এবং কিছু প্রশ্নের উত্তর খুঁজলে ‘চোরতন্ত্রের’ ভিতরের রুপটা আরো পরিস্কার দেখা যাবে। যেমন, সরকারি প্রকল্প কে অনুমোদন করে? বাজেটের রাজনৈতিক অগ্রাধিকার কে নির্ধারণ করে? সরকারি প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে কারা থাকেন? প্রশাসনের বদলি-পদায়নে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ কেন ওঠে? ঠিকাদারি, স্থানীয় উন্নয়ন, নিয়োগ কিংবা সরকারি সম্পদ ব্যবস্থাপনায় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক স্বার্থ কখনো কখনো কোথায় মিলিত হয়?
সুতরাং দুর্নীতি যদি থাকে, তার দায় শুধু একজন ঘুষখোর কর্মকর্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। দুর্নীতি অনেক সময় একটি নেটওয়ার্ক বা ইকো-সিস্টেম হিসেবে কাজ করে—যেখানে অসৎ কর্মকর্তা, রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি, ব্যবসায়ী, ঠিকাদার ও মধ্যস্বত্বভোগীর স্বার্থ পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়। তাই আমলাকে ‘চোর’ বললে রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না।
বরং প্রশ্নটি উল্টো দিক থেকেও করতে হবে-দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি করে এমন রাজনৈতিক-প্রশাসনিক ব্যবস্থা পরিবর্তনের দায়িত্ব কার?
জনপ্রশাসনের একটি পরিচিত ধারণা হলো প্রিন্সিপাল-এজেন্ট তত্ত্ব (Principal–Agent Theory)। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণ চূড়ান্ত প্রিন্সিপাল। নির্বাচিত রাজনৈতিক নেতৃত্ব জনগণের পক্ষে রাষ্ট্র পরিচালনা করে। তাই তাদের প্রিন্সিপাল হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং আমলাতন্ত্র (Bureaucracy) বা প্রশাসন নীতি বাস্তবায়নের এজেন্ট হিসেবে কাজ করে।
এজেন্ট যদি দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে ব্যক্তি স্বার্থে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে, তখন প্রিন্সিপাল-এর দায়িত্ব হলো তাকে মনিটরিং, জবাবদিহি, শাস্তি এবংএমন কি ইনসেনটিভ-এর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা। কিন্তু যদি এজেন্ট দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম করে এবং প্রিন্সিপাল যদি তা নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়; তাহলে ব্যর্থতা শুধু এজেন্ট-এর নয়; প্রিন্সিপাল-এর ওপরও বর্তায়।
তবে এই তত্ত্বের আলোকে বর্তমান প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি সরকারি প্রশাসনের বড় অংশ সত্যিই দুর্নীতিগ্রস্ত হয়, তাহলে এত বছর ধরে তাদের পারফরম্যান্সে অডিট, ইন্টিগ্রেটি মনিটরিং, ডিসিপ্লিনারি মনিটরিং মেকানিজমে এবং সর্বোপরি জবাবদিহির সিস্টেম কেন কার্যকর করা গেল না? বর্তমান সরকার এখন বলতে পারেন, তারা ক্ষমতায় ছিলেন না। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার এই পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। তাহলে, সাধারণ ও সচেতন নাগরিক এর উত্তরে বলতে পারেন, নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় এসে বিএনপি সরকার গত ৭/৮ মাসে একজন দুর্নীতিগ্রস্থ কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে কোন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে? বরং প্রশাসনে দক্ষ ও সৎ হিসেবে পরিচিত অনেক কর্মকর্তাকে আওয়ামী লীগের মতো আবারো কালো রাজনীতির ‘ট্যাগ’ দিয়ে ‘জনপ্রশাসনে সংযুক্ত’র নামে ‘ওএসডি’ করা হচ্ছে বলে জোর অভিযোগ ওঠছে। আবার অনেক ‘অভিযোগ’ রয়েছে এমন অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে ‘চুক্তিভিত্তিক’ নিয়োগের অভিযোগও ওঠছে। এসব অভিযোগের উত্তর কী?
সুতরাং ‘চোর’ শনাক্ত করার পরবর্তী ধাপ হওয়া উচিত শাস্তি; শুধু বক্তৃতা নয়। জাতি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা কী নেয়া হচ্ছে সেটি দেখার অপেক্ষায়।
রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের ভাষারও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া (institutional consequence) রয়েছে। একজন মন্ত্রী যখন কোনো সরকারি কর্মকর্তাকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা দেন, সেটি প্রশাসনিক জবাবদিহিতাকে শক্তিশালী করতে পারে। কিন্তু পুরো সরকারি কর্মচারী সমাজকে একটি নেতিবাচক পরিচয়ের মধ্যে ফেলে দিলে সৎ কর্মকর্তাদের মনোবল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
উদাহরণস্বরূপ, একজন উইং চিফ (অতিরিক্ত সচিব) হাজারো চাপ সত্ত্বেও রাষ্ট্রের ‘এক টাকাও’ যাতে অপচয় না হয় সে জন্য অবিচল থাকেন; একজন সৎ জেলা প্রশাসক হাজারো চাপ সত্ত্বেও ফেয়ার নির্বাচন অনুষ্ঠানে দৃঢ় থাকেন; একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দুর্যোগের রাতে মাঠে থাকেন; একজন চিকিৎসক প্রত্যন্ত অঞ্চলে সেবা দেন; একজন কৃষি কর্মকর্তা কৃষকের কাছে যান; একজন শিক্ষক সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও তাঁর সাধ্যমতো পাঠদান করেন; একজন প্রকৌশলী সততার সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়ন করেন--তাঁদের সবাইকে একই ভাষায় বিচার করা ন্যায়সংগত নয়।
রাষ্ট্রের উচিত দুর্নীতিবাজকে ভয় দেখানো এবং সৎ কর্মকর্তাকে সাহস দেওয়া--দুজনকে একই কাতারে দাঁড় করানো নয়।
রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিরা যদি মনে করেন সরকারি প্রশাসনে দুর্নীতি ব্যাপক, তাহলে জনগণের সামনে পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর আসা প্রয়োজন: দুর্নীতির প্রকৃত মাত্রা কত? কোন কোন দপ্তরে ঝুঁকি বেশি? কারা জড়িত? তাঁদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? এবং ভবিষ্যতে দুর্নীতির সুযোগ বন্ধ করতে কী প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন করা হচ্ছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়া গেলে বক্তব্য থেকে পলিসি এ্যাকশন-এ যাওয়া সম্ভব হবে।
একই সঙ্গে রাজনৈতিক নেতৃত্বকেও একই জবাবদিহির ফ্রেমওয়ার্ক-এর মধ্যে আনতে হবে। কারণ দুর্নীতি প্রতিরোধের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে যদি কর্মকর্তা জবাবদিহির আওতায় না থাকেন। আবার একই সাথে ‘রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার’ একই মাত্রায় জবাবদিহির আওতায় না থাকলে দুর্নীতি প্রতিরোধ সম্ভব হয় না।
সাম্প্রতিক দুটি বক্তব্য আমাদের সামনে একটি বড় সুযোগও তৈরি করেছে। রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায় যখন প্রকাশ্যে প্রশাসনিক দুর্নীতি নিয়ে কথা বলছে, তখন আলোচনাটি ব্যক্তিগত মন্তব্যের বিতর্কে শেষ না হয়ে প্রশাসনিক সংস্কারের সূচনা হতে পারে। বিএনপি সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে-এর অঙ্গীকারও রয়েছে।
যদি কোনো কর্মকর্তা চুরি করেন-তাঁকে চিহ্নিত করুন। যদি ঘুষ নেন-প্রমাণ করুন। যদি সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করেন-আইনের আওতায় আনুন। আর যিনি সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন-তাঁর মর্যাদা রক্ষা করুন। তাঁর প্রাপ্য সম্মান-পদোন্নতি তাঁকে দিন।
কারণ সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য রাষ্ট্রের প্রয়োজন শুধু দুর্নীতিবিরোধী বক্তৃতা নয়; প্রয়োজন এমন প্রতিষ্ঠান, যেখানে দুর্নীতি করা কঠিন, ধরা পড়া সহজ এবং শাস্তি প্রায় অনিবার্য।
শেষ পর্যন্ত তাই প্রশ্নটি সরকারি কর্মকর্তা ‘চোর’ কি না-সেটি নয়। মূল প্রশ্ন হলো: যদি রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরাই মনে করেন সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে দুর্নীতি এত ব্যাপক, তাহলে তাঁদের নিয়োগ, নিয়ন্ত্রণ, তদারকি ও জবাবদিহির দায়িত্বে থাকা রাষ্ট্র এতদিন কী করেছে এবং এখন কী করবে?
জনগণ অভিযোগের চেয়ে সেই উত্তরটিই বেশি জানতে চায়।
লেখক: গভর্ন্যান্স অ্যান্ড পলিসি এ্যানালাইসিস এক্সপার্ট ও প্রফেসর, লোকপ্রশাসন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়