মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

রাষ্ট্রের হিসাবের খাতা শেষ পর্যন্ত নাগরিকের জীবনেই খুলে যায়

শামসুল আলম
প্রকাশিত: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:০৫ এএম

শেয়ার করুন:

রাষ্ট্রের হিসাবের খাতা শেষ পর্যন্ত নাগরিকের জীবনেই খুলে যায়

ভোরের কাগজ খুলে আজ মনে হলো, বাংলাদেশ বুঝি আবার তার হিসাবের খাতা খুলেছে। কোথাও কয়েক হাজার কোটি টাকা কমানোর চেষ্টা, কোথাও ব্যাংকের টাকা ফেরত আনার ব্যস্ততা, কোথাও বাজারদরের সঙ্গে জনগণের দৈনিক কুস্তি—আর দূরে এআই সাহেব ইতিমধ্যে আমাদের ছেলেমেয়েদের চাকরির ভবিষ্যৎ নিয়ে বেশ গম্ভীর মুখে বৈঠক করছেন।

মেট্রোরেল দিয়েই শুরু করা যাক। এমআরটি লাইন-১ ও লাইন-৫ (উত্তর) প্রকল্পের সংশোধিত ডিপিপিতে প্রায় ৯,৭৪১ কোটি ৮৪ লাখ টাকা কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে; তবু দুই প্রকল্পের মোট ব্যয় থাকছে প্রায় ২ লাখ ৪ হাজার ২৪৩ কোটি টাকা। সাশ্রয় নিঃসন্দেহে ভালো খবর, কিন্তু একটু দুষ্টু প্রশ্ন থেকেই যায়—যে টাকা এখন কমানো যাচ্ছে, সেটি আগে এতটা বেড়ে উঠল কী করে? উন্নয়ন প্রকল্পের টাকাও বোধহয় মানুষের মতো—সময়মতো লাগাম না দিলে বেশ খানিকটা মোটা হয়ে যায়। তবে ব্যয় কমানোর সঙ্গে যেন মান, নিরাপত্তা ও স্থায়িত্বও ‘সাশ্রয়ী’ না হয়ে যায়।

মেট্রোরেলের খাতা থেকে ব্যাংকের খাতায় গেলে গল্পটি খুব আলাদা নয়। খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ ও ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ফেরাতে নজরদারি বাড়ছে। ভালো কথা। তবে ব্যাংকের অসুখেরও মজার স্বভাব—ঋণ দেওয়ার সময় সে বেশ হাসিখুশি, ফেরত চাওয়ার সময় হঠাৎ স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে যায়। তাই ঋণ অনুমোদন থেকে পুনঃতফসিল, আদায় থেকে পরিচালনা পর্ষদের জবাবদিহি—সবখানেই স্বচ্ছতা দরকার। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা জোরদার ও বাজার মনিটরিংও প্রয়োজন; কিন্তু অভিযান যেন আস্থার বিকল্প না হয়, আর বাজারকে যেন সারাজীবন পাহারা দিয়ে সুস্থ রাখতে না হয়। সরবরাহ, মজুত, পরিবহন আর পাইকারি-খুচরা দামের সেই রহস্যময় ফারাকটিরও একদিন জিজ্ঞাসাবাদ হওয়া দরকার।

সামাজিক মাধ্যম ভবিষ্যতের খাতা খুলেছে এআই এবং চাকরি। তরুণ ফ্রিল্যান্সার ও কর্মজীবীদের প্রশ্ন, এআই কি চাকরি খাবে, না নতুন চাকরি বানাবে? বাস্তবতা হলো, রিপোর্ট লেখা, অনুবাদ, তথ্য বিশ্লেষণ, সফটওয়্যার তৈরি—অনেক কাজের ধরনই বদলাচ্ছে। তাই শিক্ষাব্যবস্থাকেও মুখস্থবিদ্যার দীর্ঘ প্রেম থেকে বেরোতে হবে।

সরকার মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে ১৫ দফা নির্দেশনা বাস্তবায়ন শুরু করেছে—অভিন্ন পাঠপরিকল্পনা, শ্রেণিকক্ষ পর্যবেক্ষণ ও শিক্ষক প্রশিক্ষণসহ। এআই যদি উত্তর লিখে দিতে পারে, ছাত্রকে প্রশ্ন করতে শেখাতে হবে; তথ্য খুঁজে দিতে পারলে সত্য-মিথ্যা যাচাই করতে শেখাতে হবে। ‘কী জানি’ থেকে ‘কীভাবে ভাবি’—এই যাত্রাটিই হবে আসল শিক্ষা সংস্কার।

সম্পাদকীয় পাতার দুটি সুরও যেন একই জায়গায় এসে মিশেছে—জনগণের টাকা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। মেগা প্রকল্পে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় ও দুর্নীতি কমাতে বাস্তবসম্মত প্রাক্কলন, স্বাধীন যাচাই, স্বচ্ছ দরপত্র ও নিয়মিত জবাবদিহি দরকার। আর শিক্ষা সংস্কারের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি প্রজন্ম, যারা ভবিষ্যতের সমস্যাকে পুরোনো ফাইলে খুঁজবে না। রাষ্ট্রের সবচেয়ে লাভজনক প্রকল্প সবসময় সেতু, রেললাইন কিংবা উড়ালসড়ক নয়; কখনো একটি ভালো বিদ্যালয়, একজন দক্ষ শিক্ষক ও একটি চিন্তাশীল শিশুর ওপর বিনিয়োগের মুনাফা কয়েক প্রজন্ম ধরে পাওয়া যায়—ফিতাও কাটতে হয় না, মাইকও লাগে না।

দূরের পৃথিবীও ইতোমধ্যে ভবিষ্যতের কিস্তি আদায় শুরু করেছে। এআই নিয়ে বিশ্ববাজারে বিপুল বিনিয়োগের পাশাপাশি প্রযুক্তির ঝুঁকি ও গতি নিয়ে সতর্কতা বাড়ছে; এআই ও সেমিকন্ডাক্টর বাজারেও তার প্রভাব পড়ছে। একই সময়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিপূরণ ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থায়ন নিয়ে আন্তর্জাতিক দর-কষাকষি চলছে। বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা একটাই—প্রযুক্তিতে শুধু ব্যবহারকারী আর জলবায়ুতে শুধু ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকলে চলবে না; দক্ষতা, গবেষণা, নিজস্ব প্রযুক্তি ও শক্তিশালী কূটনীতির মাধ্যমে ভবিষ্যতের খাতায় নিজের হাতেও কয়েকটি ভালো অঙ্ক লিখতে হবে। আজকের সাশ্রয়, আজকের শিক্ষা আর আজকের সুশাসন—সবই আসলে আগামী দিনের কিস্তি।

রাষ্ট্রের হিসাবের খাতা শেষ পর্যন্ত নাগরিকের জীবনেই খুলে যায়। সেখানে ভুল অঙ্কের সুদ অনেক বেশি। আর সঠিক অঙ্কের লাভ—একটি সুন্দর, সুশাসিত, আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশ—প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে জমতে থাকে।

লেখক: সাবেক সিনিয়র সচিব, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সাবেক সহকারী একান্ত সচিব (২০০১-২০০৬)

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর