ঢাকা মেইল ডেস্ক
১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:২১ পিএম
কালের বিবর্তনে বিশ্বব্যবস্থার পরিবর্তন, বিভিন্ন দেশের উত্থান পতন এক অতি স্বাভাবিক ঘটনা। তবে এ পরিবর্তন সাধারণত কোনো একটি ঘটনার মাধ্যমে সংঘটিত হয় না। অর্থনৈতিক শক্তির পুনর্বিন্যাস, সামরিক সক্ষমতার বিস্তার, প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা, বাণিজ্যপথের পরিবর্তন এবং কূটনৈতিক জোটের রূপান্তর—এসবের সম্মিলিত প্রভাবে ধীরে ধীরে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়। বর্তমান বিশ্বও এমন এক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে যে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, সোভিয়েত ইউনিয়নের বিভাজনের পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মার্কিন প্রভাব আরও বিস্তৃত বা নিরঙ্কুশ হয়ে ওঠে। অর্থনীতি, সামরিক শক্তি, প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থা এবং বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ছিল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে চীনের উত্থান, ভারতের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্প্রসারণ, রাশিয়ার সামরিক ও জ্বালানি প্রভাব, ইউরোপের কৌশলগত পুনর্বিন্যাস এবং বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর অধিকতর সক্রিয়তা সেই ব্যবস্থাকে এক নতুন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
এ পরিবর্তনকে কেউ কেউ ‘এককেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার অবসান’ হিসেবে দেখছেন। আবার বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, বিশ্ব এখনো পুরোপুরি বহুকেন্দ্রিক হয়ে উঠতে পারেনি ; বরং যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিদ্বন্দ্বিতার পাশাপাশি ক্রমান্বয়ে আরও কয়েকটি শক্তিকেন্দ্র গড়ে উঠছে। বাস্তবতা সম্ভবত এই দুই ধারণার মাঝামাঝি। বিশ্ব একদিকে বহুমুখী হচ্ছে, অন্যদিকে বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতাও তীব্র হচ্ছে।
বিশ্বশক্তির পরিবর্তনের সবচেয়ে দৃশ্যমান ক্ষেত্র অর্থনীতি। চীন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী প্রভাব বলয় তৈরিতে সক্ষম হয়েছে। প্রযুক্তি, অবকাঠামো, বাণিজ্য ও বিনিয়োগেও তার ভূমিকা উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে। ভারতও দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি, বৃহৎ জনসংখ্যা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং কূটনৈতিক সক্রিয়তার মাধ্যমে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করছে।
অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক শক্তি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ থাকলেও নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। রাশিয়া অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও জ্বালানি, সামরিক সক্ষমতা ও ভূরাজনৈতিক প্রভাবের কারণে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রেখেছে।
এই পরিবর্তনের আরেকটি দিক হলো, উন্নয়নশীল দেশগুলো নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থকে আগের তুলনায় বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। তারা কোনো একটি শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাইছে।
বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থার আলোচনায় ব্রিকস বেশ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থান করছে। ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই জোট ২০২৪ সালে কয়েকটি নতুন সদস্য যুক্ত করে এবং ২০২৫ সালে ইন্দোনেশিয়াও সদস্য হয়। ব্রিকসের সদস্য রাষ্ট্র সমূহের মধ্যকার কিছু গুরুত্বপূর্ণ মতপার্থক্যের কারণে ব্রিকসের উত্থানকে একক আধিপত্যের তাৎক্ষণিক বিকল্প হিসেবে না দেখে বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে দেখা অধিক যুক্তিসংগত হবে।
বিশ্বের সামরিক শক্তির ক্ষেত্রেও পরিবর্তন স্পষ্ট। সিপ্রি-এর ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী সামরিক ব্যয় ২.৯ শতাংশ বেড়ে ২.৮৮৭ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়া সম্মিলিতভাবে বিশ্বের সামরিক ব্যয়ের প্রায় ৫১ শতাংশ বহন করেছে। একই সময়ে ইউরোপ ও এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলেও সামরিক ব্যয় উল্লেখযোগ্যহারে বেড়েছে। 
এই পরিসংখ্যানের তাৎপর্য হলো, সামরিক শক্তি এখন আর কেবল কয়েকটি দেশের একচেটিয়া ক্ষেত্র নয়। প্রযুক্তি, ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, সাইবার সক্ষমতা, মহাকাশ প্রযুক্তি এবং সমুদ্রপথ নিয়ন্ত্রণের মতো ক্ষেত্রেও প্রতিযোগিতা বাড়ছে। ফলে শক্তির ভারসাম্য এখন কেবল সেনাসংখ্যা বা প্রচলিত অস্ত্রের ওপর নির্ভর করছে না।
তবে সামরিক শক্তির বিস্তার মানেই স্থিতিশীলতা নয়। বরং পারস্পরিক অবিশ্বাস, অস্ত্র প্রতিযোগিতা ও ভুল হিসাবের ঝুঁকি বাড়তে পারে। বহুমেরু বিশ্ব যদি সহযোগিতার বদলে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত হয়ে পড়ে, তাহলে ছোট ও মাঝারি দেশগুলোও তার প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে পারবে না।
যুক্তরাষ্ট্র এখনো বিশ্বের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক, সামরিক ও প্রযুক্তিগত শক্তি। আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থা, ডলার, বৈশ্বিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান, সামরিক জোট এবং উচ্চপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে তার প্রভাব অত্যন্ত শক্তিশালী। তাই ‘যুক্তরাষ্ট্রের পতন’ বা ‘মার্কিন আধিপত্যের সম্পূর্ণ অবসান’—এ ধরনের সরলীকৃত বক্তব্য বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের ধরন বদলাচ্ছে। আগে যেখানে অনেক দেশ নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও কূটনীতিতে ওয়াশিংটনের ওপর তুলনামূলকভাবে বেশি নির্ভর করত, এখন অনেক দেশ একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইউরোপ, ভারত, রাশিয়া ও অন্যান্য শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে চলার নীতি অবলম্বন করেছে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের অবসান নয়; বরং একক নির্ভরতার পরিবর্তে বহুস্তরীয় সম্পর্কের বিস্তার।
বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থার পক্ষে সবচেয়ে বড় যুক্তি হলো—কোনো একটি শক্তি সব বিষয়ে একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারবে না। বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলের মতামত, স্বার্থ ও সক্ষমতা আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে অধিক গুরুত্ব পেতে পারে। জাতিসংঘের সংস্কার, বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় প্রতিনিধিত্ব, উন্নয়ন অর্থায়ন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ন্যায্যতা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কও নতুন গতি পেতে পারে।
আরও পড়ুন
প্রাসঙ্গিক প্রযুক্তিজ্ঞানই হতে পারে আগামীর বড় সম্পদ
দোষ প্রমাণের আগে অপরাধী বলা গুরুতর অন্যায়
কিন্তু বহুমেরু বিশ্ব নিজে থেকেই ন্যায়ভিত্তিক বা শান্তিপূর্ণ বিশ্ব তৈরি করে না। একাধিক শক্তি যদি নিজেদের প্রভাব বিস্তারের জন্য ছোট দেশগুলোকে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র বানায়, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। একটি শক্তির আধিপত্যের পরিবর্তে কয়েকটি শক্তির প্রতিযোগিতা শুরু হলে দুর্বল দেশগুলোর ওপর চাপ কমবেই—এমন নিশ্চয়তা নেই।
তাই বহুমুখী শক্তির উত্থানের সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইন, সার্বভৌম সমতা, কূটনৈতিক সংলাপ এবং বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা নিশ্চিত করা জরুরি। শক্তির সংখ্যা বাড়লেই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয় না; শক্তির ব্যবহার কোন নীতি ও প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে, সেটিই মূল প্রশ্ন।
এই পরিবর্তন বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য সুযোগ ও ঝুঁকি—দুই-ই তৈরি করছে। একদিকে বিভিন্ন শক্তির মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকলে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও জ্বালানি সহযোগিতার নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে বড় শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কোনো একটি পক্ষের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক স্বার্থকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য তাই প্রয়োজন স্বার্থভিত্তিক, ভারসাম্যপূর্ণ ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি। কোনো শক্তির বিরোধিতা করার জন্য অন্য শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক নয়; বরং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি, রপ্তানি ও সার্বভৌম স্বার্থকে কেন্দ্র করে সম্পর্ক নির্ধারণ করা উচিত।
বিশ্বব্যবস্থার পরিবর্তনে বাংলাদেশের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানো। অর্থনীতি দুর্বল হলে কূটনৈতিক স্বাধীনতাও সীমিত হয়। তাই উৎপাদনশীলতা, রপ্তানি বৈচিত্র্য, জ্বালানি নিরাপত্তা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও সুশাসন—এসবই আন্তর্জাতিক পরিবর্তনের মধ্যে দেশের অবস্থান শক্তিশালী করার ভিত্তি।
একটি শক্তির একক আধিপত্য যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি কয়েকটি শক্তির প্রতিযোগিতাও অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। প্রয়োজন এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে কোনো দেশই অন্য দেশের সার্বভৌমত্বকে অবজ্ঞা করতে না পারে; যেখানে আন্তর্জাতিক আইন শক্তিশালী দেশ ও দুর্বল দেশ—উভয়ের জন্যই প্রযোজ্য হবে; যেখানে উন্নয়নশীল দেশগুলো কেবল শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র না হয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের অংশীদার হবে।
বিশ্ব এখন যে রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তা হয়তো একদিন একটি নতুন আন্তর্জাতিক ভারসাম্যের দিকে নিয়ে যাবে। কিন্তু সেই ভারসাম্য কেমন হবে, তা নির্ভর করবে শক্তিধর দেশগুলোর আচরণ, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার এবং ছোট ও মাঝারি দেশগুলোর সম্মিলিত কূটনৈতিক ভূমিকার ওপর।
একক আধিপত্য থেকে বহুমুখী শক্তির উত্থান ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। তবে এই পরিবর্তনের প্রকৃত সাফল্য নির্ধারিত হবে শক্তির সংখ্যা দিয়ে নয়—ন্যায়, শান্তি, সার্বভৌম সমতা ও মানবিক মর্যাদা কতটা প্রতিষ্ঠিত হয়, তা দিয়ে।
লেখক: অর্থনীতিবিদ, আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও মানবাধিকার কর্মী