ঢাকা মেইল ডেস্ক
১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:১৯ পিএম
অভিযোগ, তদন্ত, বিচার ও দণ্ড—এই চারটি বিষয়কে এক করে দেখা আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। যথাযথ প্রক্রিয়ায় বিচারের পূর্বেই কোন অভিযুক্তকে দোষী সাব্যস্ত করে তা প্রচার করা ন্যায়বিচারের দৃষ্টিতে এক গুরুতর অপরাধ। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তাকে অপরাধী হিসেবে গণ্য করার প্রবণতা আমাদের সমাজে ক্রমেই ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। আদালতে বিচারাধীন বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সংবাদমাধ্যম কিংবা রাজনৈতিক বক্তব্যে কাউকে ‘দুর্নীতিবাজ’, ‘চোর’, ‘খুনি’ বা ‘অপরাধী’ ইত্যাদি বলে প্রচার করা হচ্ছে। অথচ আইনের মৌলিক নীতি হলো, আদালতে অপরাধ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত প্রত্যেক ব্যক্তি নির্দোষ বলে বিবেচিত হবেন। এটি কেবল আইনি আনুষ্ঠানিকতা নয়; ন্যায়বিচারের অন্যতম প্রধান ভিত্তি।
কোনো অভিযোগের সত্যতা যাচাই করার জন্যই তদন্তের প্রয়োজন হয়। তদন্তের উদ্দেশ্যই হলো, অভিযোগের পক্ষে ও বিপক্ষে তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করা, সাক্ষ্য যাচাই করা এবং প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করা। এরপর বিজ্ঞ আদালত সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ পূর্বক রায় প্রদান করেন- অভিযুক্ত ব্যক্তি সত্যিই অপরাধ করেছেন কি না।
কিন্তু মামলা শুরুর পর তদন্ত শুরুর আগেই বা তদন্ত চলাকালে অভিযুক্তকে দোষী বলে প্রচার করা হলে অনেক ক্ষেত্রে বিচারপ্রক্রিয়ার স্বাভাবিক যাত্রা ব্যাহত হয়।কখনো সখনো তদন্তকারী সংস্থা, আদালত এবং জনমত প্রভাবিত হয়ে পড়েন।
অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন হতে পারে; কিন্তু অভিযোগের ভিত্তিতে তাঁকে অপরাধী ঘোষণা করা ন্যায়বিচার হতে পারে না।
বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ ছড়িয়ে পড়লে অনেকেই যাচাই-বাছাই ছাড়াই তাঁকে অপরাধী মনে করে থাকেন। কেউ কেউ আবার আদালতের রায় হওয়ার আগেই শাস্তির দাবি তোলেন। এ প্রবণতা শুধু ব্যক্তির সুনাম নষ্ট করে না, তাঁর পরিবার, পেশা ও সামাজিক অবস্থানকেও বিপর্যস্ত করতে পারে।
একবার কাউকে ‘অপরাধী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হলে পরবর্তী সময়ে আদালত তাঁকে নির্দোষ ঘোষণা করলেও সেই ক্ষতি পুরোপুরি পূরণ করা কঠিন। মানহানি, সামাজিক বর্জন, চাকরি হারানো কিংবা ব্যবসায়িক ক্ষতির মতো পরিণতি অনেক সময় আদালতের রায়ের আগেই ঘটে যায়। অথচ বিচারে নির্দোষ প্রমাণিত হলে সেই ক্ষতির দায় কেউ নেয়না বা নিতে পারেনা।
সংবাদমাধ্যমের কাজ হলো জনগণকে সঠিক তথ্য জানানো, ক্ষমতাবানদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং জনস্বার্থের বিষয়গুলো সামনে তুলে ধরা। কিন্তু সংবাদ পরিবেশন ও অপরাধী সাব্যস্ত করার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে- এ বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে।
‘অভিযোগ উঠেছে’, ‘মামলা হয়েছে’, ‘তদন্ত চলছে’—এসব তথ্যের সঙ্গে ‘অপরাধ করেছেন’—এমন সিদ্ধান্তমূলক বক্তব্য কখনো এক হতে পারেনা।
সংবাদে অভিযোগকারীর বক্তব্য যেমন থাকতে পারে, তেমনি অভিযুক্তের বক্তব্য, তদন্তের অবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট নথির তথ্যও থাকা বাঞ্ছনীয়।
বিশেষ করে শিরোনাম ও প্রচারের ক্ষেত্রে শব্দচয়নে সতর্কতা অবলম্বন জরুরি। অভিযুক্তকে দোষী সাব্যস্ত করে এমন ভাষা ব্যবহার করা শুধু সাংবাদিকতার নৈতিকতার পরিপন্থী নয় বরং ন্যায়বিচারের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকেও বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
আরও পড়ুন
প্রাসঙ্গিক প্রযুক্তিজ্ঞানই হতে পারে আগামীর বড় সম্পদ
ইসলামি ব্যাংকগুলো থেকে অর্থপাচার ও শরিয়াহ বোর্ডের দায়
গণতান্ত্রিক সমাজে মামলা ও বস্তুনিষ্ঠ তদন্তের মাধ্যমে অপরাধের বিচার হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে রাজনৈতিকভাবে হেয় করা, সামাজিকভাবে হেয় করা কিংবা জনমনে অপরাধী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য মামলা ও অভিযোগকে ব্যবহার করা হলে তা আইনের শাসনের জন্য বিপজ্জনক।
অভিযোগ সত্য হলে অবশ্যই তদন্ত ও বিচার হতে হবে। অপরাধ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী শাস্তিও নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু অভিযোগ মিথ্যা হলে বা প্রমাণিত না হলে অভিযুক্ত ব্যক্তির মর্যাদা ও অধিকারও রক্ষা করতে হবে। সে জন্য বিদ্যমান আইনে মিথ্যা মামলাকারিদের জন্য শাস্তির বিধান অন্তর্ভুক্তকরার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
ন্যায়বিচার মানে শুধু অপরাধীকে শাস্তি দেয়া নয় বরং নির্দোষ ব্যক্তিকে অন্যায়ভাবে শাস্তি না দেওয়াও ন্যায়বিচারের অপরিহার্য অংশ। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় ভারসাম্য জরুরি।
অভিযুক্ত ব্যক্তির অধিকার রক্ষা করা মানে অপরাধের বিচার বন্ধ করে দেওয়া নয়। বরং এটি বিচারব্যবস্থাকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো—অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করা, প্রমাণের ভিত্তিতে মামলা পরিচালনা করা, আদালতের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং রায় কার্যকর করা।
একই সঙ্গে নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো অভিযোগ দেখেই তা প্রচার করা, অপমানজনক মন্তব্য করা কিংবা কাউকে অপরাধী বলে ঘোষণা করা থেকে বিরত থাকা উচিত। অভিযোগের বিচার আদালতে হবে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নয়।
একটি সভ্য সমাজে মানুষের মর্যাদা, আইনের শাসন এবং ন্যায়বিচার পরস্পর সম্পর্কিত। কোনো ব্যক্তি অপরাধ করলে তাঁর বিচার ও শাস্তি অবশ্যই হতে হবে। কিন্তু বিচার শেষ হওয়ার আগেই তাঁকে অপরাধী বলে প্রচার করা হলে আমরা নিজেরাই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় দুর্ভেদ্য প্রাচীর নির্মাণ করে তুলি।
রাষ্ট্র, রাজনৈতিক দল, সংবাদমাধ্যম এবং সাধারণ নাগরিক—সকলকেই এ বিশ্বাস গভীরভাবে লালন করতে হবে যে, অভিযুক্ত ব্যক্তি অপরাধী নন; তিনি একজন বিচারাধীন ব্যক্তি। আদালতের রায়ই নির্ধারণ করবে তিনি দোষী কি না। অভিযোগের ভিত্তিতে বিচার শুরু হতে পারে, কিন্তু দোষী সাব্যস্ত করার অধিকার কেবল আদালতের।
লেখক: অর্থনীতিবিদ, সমাজ ও রাষ্ট্রচিন্তক এবং মানবাধিকার কর্মী