Dhaka Mail Logo

মতামত

ফুলের তোড়া ও অপ্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা কাম্য নয়

ঢাকা মেইল ডেস্ক

১০ জুলাই ২০২৬, ০২:৫০ পিএম

একটি আধুনিক রাষ্ট্রের শক্তি শুধু তার অবকাঠামো, অর্থনীতি বা প্রযুক্তিগত সক্ষমতায় নয়; বরং তার প্রশাসনিক দক্ষতা, সময় ব্যবস্থাপনা এবং কর্মসংস্কৃতির ওপরও বহুলাংশে নির্ভর করে। ইতিহাস সাক্ষী, যে রাষ্ট্র তার প্রতিটি কর্মঘণ্টাকে মূল্য দিতে শেখে, সেই রাষ্ট্রই জনসেবা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং সুশাসনের ক্ষেত্রে অগ্রগতি লাভ করে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশে সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত এবং অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে এমন কিছু আনুষ্ঠানিক সংস্কৃতি বিদ্যমান, যা কর্মদক্ষতার পরিবর্তে এসব আনুষ্ঠানিকতাকেই বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়। পদস্থ কর্মকর্তাদের ফুলের তোড়া দিয়ে বরণ, দীর্ঘ শুভেচ্ছা অনুষ্ঠান, বিদায় সংবর্ধনা, ব্যানার, ফটোসেশন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার এবং অপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক সভা তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

এ কথা অস্বীকার করার জো নেই যে, সৌজন্য ও পারস্পরিক সম্মান প্রদর্শন একটি সুস্থ কর্মপরিবেশের জন্য সহায়ক। কিন্তু যখন সৌজন্য প্রদর্শনের নামে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়, সরকারি অর্থ ব্যয় হয়, শত শত কর্মকর্তা-কর্মচারীকে তাদের মূল কাজ বন্ধ রাখতে হয় এবং জনসেবা ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত হয়, তখন বিষয়টি কেবল সামাজিক রীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং এটি প্রশাসনিক দক্ষতা, আর্থিক শৃঙ্খলা এবং সুশাসনের বিষয়গুলো জড়িয়ে পড়ে।

বাংলাদেশের বহু প্রতিষ্ঠানে নতুন কোনো কর্মকর্তা যোগদান করলেই ফুলের তোড়া কেনা, অতিথি আপ্যায়ন, কর্মচারীদের সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করানো, একের পর এক ছবি তোলা, ভিডিও ধারণ, বক্তব্য প্রদান এবং পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের দীর্ঘ আয়োজন দেখা যায়। আবার বিদায়ী কর্মকর্তার ক্ষেত্রেও একই চিত্র। অনেক সময় জন্মদিন, পদোন্নতি, অবসর, সফর কিংবা পরিদর্শন উপলক্ষেও একই ধরনের অনুষ্ঠান হয়। এসব আয়োজনের জন্য প্রায়ই পুরো অফিসের স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হয়। এসব অপ্রয়োজনীয় কাজে মূল্যবান সময় ব্যয় করা সচেতন ও দেশপ্রেমিক মানুষের জন্য মোটেই কাম্য নয়।

এ কথা মনে রাখতে হবে, একজন সরকারি কর্মচারীর কর্মঘণ্টার মূল্য শুধু তার বেতনের অঙ্কে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে জনগণের সেবা, উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতি, ফাইল নিষ্পত্তি, নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রম। একটি ফাইল একদিন আটকে গেলে একজন উদ্যোক্তার বিনিয়োগ বিলম্বিত হতে পারে, একজন রোগীর চিকিৎসা ব্যাহত হতে পারে, একজন কৃষকের ভর্তুকি পেতে দেরি হতে পারে কিংবা একটি উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন পিছিয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ কর্মঘণ্টার অপচয়ের নেতিবাচক প্রভাব সুদূরপ্রসারী ও বহুমাত্রিক।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব আনুষ্ঠানিকতার অনেক ব্যয় সরাসরি সরকারি বাজেটে না থাকলেও বিভিন্ন দপ্তরের পরিচালন ব্যয়, কল্যাণ তহবিল অথবা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনানুষ্ঠানিক চাঁদা থেকে বহন করা হয়। এর ফলে অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের একটি সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। রাষ্ট্র যখন ব্যয়সংকোচনের কথা বলে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ের কথা বলে, বিদেশ সফর সীমিত করে এবং সরকারি ব্যয় কমানোর উদ্যোগ গ্রহণ করে, তখন একই সঙ্গে এই ধরনের ক্ষুদ্র কিন্তু বিস্তৃত অঙ্গনে বিরাজমান অপচয়ের দিকেও নজর দেওয়া জরুরি।

এর সঙ্গে আরেকটি সামাজিক সমস্যা যুক্ত হয়েছে—ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা। অনেক ক্ষেত্রে ফুলের তোড়া আর সৌজন্যের প্রতীক থাকে না; এটি হয়ে ওঠে প্রভাব প্রদর্শন, আনুগত্য প্রকাশ কিংবা ঊর্ধ্বতনকে সন্তুষ্ট করার প্রতিযোগিতা। ফলে কর্মক্ষেত্রে মেধা, দক্ষতা, উদ্ভাবন ও কর্মনিষ্ঠার পরিবর্তে ব্যক্তিপূজা ও তোষামোদের সংস্কৃতি শক্তিশালী হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। একটি গণতান্ত্রিক ও পেশাদার প্রশাসনের জন্য এটি মোটেই ইতিবাচক নয়।

বিশ্বের উন্নত প্রশাসনিক ব্যবস্থাগুলোর চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে নতুন কর্মকর্তাকে স্বাগত জানানো হয় সংক্ষিপ্ত পরিচিতি সভা, করমর্দন বা ছোট একটি ওরিয়েন্টেশন সেশনের মাধ্যমে। আনুষ্ঠানিকতার পরিবর্তে গুরুত্ব দেওয়া হয় কাজের পরিকল্পনা, দায়িত্ব বণ্টন, কর্মসম্পাদনের লক্ষ্য এবং ফলাফল মূল্যায়নে। কারণ আধুনিক ব্যবস্থাপনা বিজ্ঞানের অন্যতম মূলনীতি হলো—সময় একটি সম্পদ (Time is a Resource)। এই সম্পদের অপচয় শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দেয়।

অনেক বেসরকারি করপোরেট প্রতিষ্ঠানও এখন “লিন ম্যানেজমেন্ট”, “টাইম ম্যানেজমেন্ট” এবং “রেজাল্ট-বেসড ম্যানেজমেন্ট”-এর ওপর জোর দিচ্ছে। সেখানে অপ্রয়োজনীয় সভা, দীর্ঘ আনুষ্ঠানিকতা এবং সময় অপচয়কে উৎপাদনশীলতার অন্যতম শত্রু হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সরকারি প্রশাসনেও একই দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠিত হওয়া প্রয়োজন।

আরও পড়ুন

এশিয়ার নতুন অর্থনৈতিক মানচিত্রে বাংলাদেশ

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আশাব্যঞ্জক

এই সংস্কৃতি পরিবর্তনের জন্য কয়েকটি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে-

প্রথমত, সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে ফুলের তোড়া, ব্যয়বহুল শুভেচ্ছা অনুষ্ঠান এবং দীর্ঘ সংবর্ধনা নিরুৎসাহিত করে একটি প্রশাসনিক নির্দেশিকা প্রণয়ন করা যেতে পারে।

দ্বিতীয়ত, যোগদান বা বিদায় অনুষ্ঠান সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার নীতি গ্রহণ করা যেতে পারে, যাতে অফিসের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত না হয়।

তৃতীয়ত, ফুলের তোড়ার পরিবর্তে একটি বই, একটি গাছের চারা অথবা প্রতিষ্ঠানের সাধারণ স্মারক দেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তোলা যেতে পারে। এতে পরিবেশও উন্নত হবে এবং অপচয়ও কমবে।

চতুর্থত, কোনো কর্মকর্তার প্রকৃত সম্মান তাঁর নেতৃত্ব, সততা, কর্মদক্ষতা এবং জনসেবার মাধ্যমে মূল্যায়িত হওয়া উচিত; ফুলের তোড়ার সংখ্যায় নয়।

পঞ্চমত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের প্রতিযোগিতার পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানের অর্জন, সেবার মান এবং উদ্ভাবনী উদ্যোগকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে এই উপলব্ধি তৈরি করতে হবে যে রাষ্ট্রের প্রতিটি মিনিট জনগণের সম্পদ। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জনগণের করের অর্থে বেতন পান। ফলে তাঁদের প্রতিটি কর্মঘণ্টা জনগণের কল্যাণে সর্বোচ্চ দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করা একটি নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব।

আমরা এমন একটি প্রশাসন চাই, যেখানে কর্মকর্তার কক্ষে প্রবেশের আগে ফুলের তোড়া নয়, থাকবে প্রস্তুত কর্মপরিকল্পনা।সংবর্ধনার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে সেবার মান। ফটোসেশনের চেয়ে মূল্যবান হবে দ্রুত ফাইল নিষ্পত্তি। যেখানে ব্যক্তির চেয়ে বড় হবে প্রতিষ্ঠান, আর আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে বড় হবে দায়িত্ববোধ।

বাংলাদেশ আজ উন্নত, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠনের লক্ষ্যে সম্মুখপানে অগ্রসরমান। সেই সুমহান অভিযাত্রায় প্রশাসনিক সংস্কৃতির ছোট ছোট পরিবর্তনও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। ফুলের তোড়া কমলে সম্মান কমবে না; বরং বাড়বে কর্মঘণ্টার মূল্য, জনসেবার গতি, প্রশাসনের পেশাদারিত্ব এবং জনগণের আস্থা। আধুনিক রাষ্ট্রের প্রশাসনে ফুলের তোড়ার নয়, কর্মদক্ষতারই হওয়া উচিত সর্বোচ্চ মর্যাদা।

লেখক: অর্থনীতিবিদ, রাষ্ট্রচিন্তক ও মানবাধিকার কর্মী