বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আশাব্যঞ্জক

মো. মুখলেছুর রহমান
প্রকাশিত: ০৪ জুলাই ২০২৬, ০৭:৪৩ পিএম

শেয়ার করুন:

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আশাব্যঞ্জক
মো. মুখলেছুর রহমান। ছবি: সংগৃহীত

এ কথা সত্যের খুবই কাছাকাছি যে, বাংলাদেশের অর্থনীতির সূচক বর্তমানে ঊর্ধ্বমুখী। সাম্প্রতিক সময়ে রেমিট্যান্সে রেকর্ড, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার বৃদ্ধি, বৈদেশিক বাণিজ্যে ডিজিটাল রূপান্তর, রাজস্ব আদায়ে উন্নতি এবং পুঁজিবাজারে কিছু কাঠামোগত সংস্কারের উদ্যোগ—এসবই দেশের অর্থনীতির জন্য নিঃসন্দেহে ইতিবাচক বার্তা বহন করছে। তবে মনে রাখতে হবে, বৈশ্বিক অর্থনীতির অনিশ্চয়তা, প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের গতি এবং ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা আমাদের প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানগত স্বস্তি ম্লান করে দিতে পারে। অতএব প্রবৃদ্ধির গুণগত মান এবং স্থায়িত্বই আমাদের জন্য আগামী দিনের মূল চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশ গত দুই দশকে ধারাবাহিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে বিশ্বের অন্যতম সম্ভাবনাময় উদীয়মান অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। দারিদ্র্য হ্রাস, শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং রপ্তানি বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রবাসী বাংলাদেশিদের অবদান দেশের অর্থনীতিকে একটি শক্ত ভিত্তি দিয়েছে। নতুন অর্থবছরের শুরুতে অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে ইতিবাচক অগ্রগতি সেই ধারাবাহিকতারই প্রতিফলন।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অর্জন এসেছে রেমিট্যান্স খাতে। বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে রেমিট্যান্স শুধু রিজার্ভ শক্তিশালী করে না; এটি দেশের কোটি কোটি পরিবারের জীবনমান উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আমদানি ব্যয় নির্বাহ, বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা এবং বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষায়ও এর ভূমিকা অনস্বীকার্য। তবে দীর্ঘমেয়াদে রেমিট্যান্সের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা সমীচীন হবে না।কারণ এটি মূলত বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের আয়ের ওপর নির্ভরশীল, যা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা বা শ্রমবাজারের অস্থিতিশীলতার কারণে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

আরও পড়ুন

এশিয়ার নতুন অর্থনৈতিক মানচিত্রে বাংলাদেশ

দেশের অর্থনীতির আকার বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক অর্জন। তবে জিডিপির আকার যতই বাড়ুক না কেন, মৌলিক বিবেচনার বিষয় হবে —এই প্রবৃদ্ধির সুফল সমাজের সব স্তরের মানুষের কাছে কতটা পৌঁছাচ্ছে। যদি আয় বৈষম্য বাড়তে থাকে, কর্মসংস্থান পর্যাপ্ত না হয় কিংবা উৎপাদনশীল বিনিয়োগের পরিবর্তে ভোগনির্ভর প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকে, তাহলে বড় অর্থনীতির প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনমানের উন্নয়নে প্রত্যাশিত ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হবে না।

এখানেই ডিজিটাল রূপান্তরের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে কাগজনির্ভর প্রক্রিয়ার পরিবর্তে ইলেকট্রনিক ডকুমেন্ট ব্যবস্থার সূচনা শুধু একটি প্রযুক্তিগত পরিবর্তন নয়; এটি ব্যবসা পরিচালনার সংস্কৃতিরও পরিবর্তন। এতে সময় ও ব্যয় কমবে, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক জটিলতা হ্রাস পাবে এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী হবে। ভবিষ্যতের অর্থনীতি হবে তথ্যনির্ভর, প্রযুক্তিনির্ভর এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর ভিত্তি করে। তাই ডিজিটাল অবকাঠামো, সাইবার নিরাপত্তা এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই।

রাজস্ব আদায়ে উন্নতি সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণের জন্য অভ্যন্তরীণ রাজস্বই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উৎস। তবে শুধু রাজস্ব বাড়ালেই হবে না; করব্যবস্থাকে আরও ন্যায়সঙ্গত, সহজ এবং করদাতাবান্ধব করতে হবে। একই সঙ্গে কর ফাঁকি ও অব্যবস্থাপনা রোধে প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করাও খুবই প্রয়োজন।

Taka

পুঁজিবাজারের সাম্প্রতিক সংস্কার উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে গণ্য করা যায়। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার আস্থার সংকট, দুর্বল সুশাসন এবং নীতিগত অস্থিরতায় ভুগছে। অথচ একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজার ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি শিল্পায়ন সম্ভব নয়। ব্যাংকনির্ভর অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বিকল্প মূলধনের উৎস হিসেবে পুঁজিবাজারকে অবশ্যই কার্যকর করতে হবে। এর জন্য তালিকাভুক্ত কোম্পানির জবাবদিহিতা, তথ্য প্রকাশের স্বচ্ছতা, বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা ভীষণ জরুরি।

তবে ইতিবাচক খবরের মাঝেও আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এখনও উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সুদের হার, ঋণের বোঝা, সরবরাহ শৃঙ্খলের অনিশ্চয়তা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তিগত পরিবর্তন নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। উন্নত দেশগুলোতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মন্থর হলে বাংলাদেশের রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ের ওপরও তার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই বৈশ্বিক ঝুঁকি মোকাবিলায় অর্থনৈতিক নীতিকে বিচক্ষণতার সাথে ঢেলে সাজাতে হবে।

আরও পড়ুন

পুঁজিবাজারে ইতিবাচক গতি, ব্যাংক খাতে গভীর সতর্কবার্তা

আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হবে—রেমিট্যান্স, প্রযুক্তি ও পুঁজিবাজার। বাস্তবে এই তিনটিকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। রেমিট্যান্স অর্থনীতিকে স্থিতিশীলতা দেবে, প্রযুক্তিনির্ভর ডিজিটাল বাণিজ্য উৎপাদনশীলতা ও প্রতিযোগিতা বাড়াবে, আর শক্তিশালী পুঁজিবাজার শিল্পায়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন নিশ্চিত করবে। এই তিনটি স্তম্ভের সঙ্গে যদি সুশাসন, দক্ষ জনশক্তি, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং নীতির ধারাবাহিকতা যুক্ত হয়, তবে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের গণ্ডি পেরিয়ে উচ্চ আয়ের অর্থনীতির পথে এগোতে পারবে বলে আশা করা যায়।

অতীতের সাফল্য অবশ্যই অনুপ্রেরণার। কিন্তু ভবিষ্যতের সাফল্য নির্ভর করবে আজকের সিদ্ধান্তের ওপর। প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান যতই আশাব্যঞ্জক হোক, তা তখনই অর্থবহ হবে, যখন সেই প্রবৃদ্ধি হবে কর্মসংস্থানমুখী, অন্তর্ভুক্তিমূলক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং সুশাসনভিত্তিক। নতুন অর্থবছরের শুরুতে বাংলাদেশের জন্য এটাই হওয়া উচিত অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার মূল অঙ্গীকার।

লেখক: অর্থনীতিবিদ, সমাজচিন্তক ও মানবাধিকার কর্মী

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর