images

মতামত

কূটনীতির ব্যস্ত মৌসুমে বাংলাদেশ: সুযোগ, চ্যালেঞ্জ ও নতুন বাস্তবতা

ঢাকা মেইল ডেস্ক

১৪ জুন ২০২৬, ০১:৪৮ পিএম

বাংলাদেশের কূটনৈতিক অঙ্গন বর্তমানে এক ব্যতিক্রমধর্মী ব্যস্ত সময় অতিক্রম করছে। একদিকে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমানের রাশিয়া সফর, অন্যদিকে পররাষ্ট্র সচিবের চীন সফরের প্রস্তুতি; প্রধানমন্ত্রী ২১ জুন মালয়েশিয়া সফরে যাচ্ছেন, তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঢাকা সফর করেছেন, আবার চলতি মাসেই বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বেইজিং সফরও আলোচনায় রয়েছে। একই সময়ে জাপানের কাছে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়া এগোচ্ছে, সীমান্তে ভারত থেকে পুশইনের ঘটনায় ঢাকা দিল্লির কাছে একাধিক প্রতিবাদপত্র পাঠাচ্ছে। এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরাইল উত্তেজনা আবারও জ্বলে উঠেছে, যার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে।

এসব ঘটনাকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এগুলো একত্রে বিবেচনা করলে বোঝা যায়, বাংলাদেশ এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছে যখন আন্তর্জাতিক রাজনীতি, আঞ্চলিক ভূরাজনীতি, অর্থনৈতিক কূটনীতি এবং জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নগুলো পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত হয়ে উঠেছে। বর্তমান বিশ্বে কোনো দেশের পররাষ্ট্রনীতি আর শুধু রাষ্ট্রদূতদের বৈঠক বা কূটনৈতিক সৌজন্যের বিষয় নয়; এটি এখন অর্থনীতি, বাণিজ্য, জ্বালানি, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ, নিরাপত্তা এবং উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি কৌশলগত ক্ষেত্র।

বিশ্বব্যবস্থা বর্তমানে একটি বড় রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতা ক্রমেই তীব্র হচ্ছে, অন্যদিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এখনো বৈশ্বিক অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে। মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সংঘাতের আশঙ্কা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের মতো একটি উদীয়মান অর্থনীতির দেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—কোনো একক শক্তির বলয়ে আবদ্ধ না হয়ে সবার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা এবং সেই সম্পর্ককে দেশের উন্নয়নের স্বার্থে কাজে লাগানো।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতায় সেই বহুমাত্রিক ভারসাম্যের প্রচেষ্টার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বাংলাদেশের জন্য ভৌগোলিক ও কৌশলগত কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাণিজ্য, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, নিরাপত্তা ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনাসহ বহু ক্ষেত্রে দুই দেশের পারস্পরিক নির্ভরশীলতা রয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে সীমান্তে পুশইন, হত্যা, নদীর পানি বণ্টন এবং বাণিজ্যিক ভারসাম্যহীনতার মতো বিষয়গুলোও বাস্তবতা। তাই দিল্লির সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করাও সমান জরুরি। সাম্প্রতিক প্রতিবাদপত্রগুলো সেই বার্তাই বহন করছে যে, ঢাকা সম্পর্ক চায়, কিন্তু আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে নয়।

অন্যদিকে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক এখন শুধু অবকাঠামো উন্নয়নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বাণিজ্য, শিল্পায়ন, প্রযুক্তি স্থানান্তর, বিনিয়োগ এবং আঞ্চলিক সংযোগের ক্ষেত্রেও বেইজিং একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। চীন বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যিক অংশীদার এবং উন্নয়ন সহযোগী। ফলে পররাষ্ট্র সচিবের চীন সফর কিংবা বিভিন্ন পর্যায়ে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগকে বৃহত্তর অর্থনৈতিক কূটনীতির অংশ হিসেবেই দেখা উচিত।

রাশিয়ার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প শুধু একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়; এটি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ফলে মস্কোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা বাংলাদেশের জন্য কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক চাপের মধ্যেও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের বাস্তব দিকগুলোকে বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে ঢাকাকে।

এদিকে তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্কও নতুন গুরুত্ব পাচ্ছে। মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী রাষ্ট্র হিসেবে তুরস্ক প্রতিরক্ষা শিল্প, প্রযুক্তি, বাণিজ্য এবং কূটনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে দ্রুত উত্থান ঘটিয়েছে। দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের সংযোগস্থলে অবস্থানকারী এই দেশটির সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে।

মালয়েশিয়া সফরের গুরুত্বও কম নয়। মালয়েশিয়া দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশি শ্রমবাজারের অন্যতম প্রধান গন্তব্য। কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, শিক্ষা এবং ইসলামী অর্থায়নের ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধির যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী রাখতে এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াতে শ্রমবাজার কূটনীতি এখন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।

আরও পড়ুন

বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নতুন অর্জন, গৌরবের সঙ্গে বর্তাবে দায়িত্বও

বাজেট ভালো, সুফল নির্ভর করবে কার্যকরের ওপর

অন্যদিকে জাপানের সম্পৃক্ততা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল পরিচালনায় জাপানি অংশগ্রহণ কেবল একটি বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি বাংলাদেশের অবকাঠামো ব্যবস্থাপনা ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ পরিবেশের প্রতি আস্থারও প্রতীক। জাপান দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের অন্যতম নির্ভরযোগ্য উন্নয়ন সহযোগী এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরসহ বিভিন্ন প্রকল্পে তাদের বিনিয়োগ ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভিত্তি গড়ে তুলছে।

তবে এই কূটনৈতিক সাফল্যের সম্ভাবনার পাশাপাশি উদ্বেগের কারণও রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরাইল সংঘাতের নতুন উত্তেজনা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য সরাসরি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশ তার জ্বালানির একটি বড় অংশ আমদানির ওপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি পেলে আমদানি ব্যয় বাড়বে, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি হবে এবং মূল্যস্ফীতি আবারও ঊর্ধ্বমুখী হতে পারে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি শুধু পরিবহন খাতেই নয়, কৃষি, শিল্প এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারেও প্রভাব ফেলবে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বাংলাদেশের জন্য কেবল দূরের কোনো যুদ্ধ নয়; এর অর্থনৈতিক অভিঘাত দেশের প্রতিটি নাগরিকের জীবনকে স্পর্শ করতে পারে।

এ কারণেই বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের কূটনীতিকে শুধু রাজনৈতিক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। এখন প্রয়োজন অর্থনৈতিক কূটনীতি, জ্বালানি কূটনীতি, বাণিজ্য কূটনীতি এবং শ্রমবাজার কূটনীতিকে সমন্বিতভাবে পরিচালনা করা। বিশ্বের বড় শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে পক্ষ নেওয়ার পরিবর্তে জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করে বাস্তববাদী ও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখাই হতে পারে বাংলাদেশের সবচেয়ে কার্যকর কৌশল।

বাংলাদেশের ইতিহাস বলে, যে সময়ে দেশ কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করতে পেরেছে, সে সময়েই উন্নয়নের সুযোগগুলোকে কাজে লাগানো সম্ভব হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিও সেই ধরনের একটি সন্ধিক্ষণ। একদিকে রয়েছে বহুমুখী আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের সুযোগ, অন্যদিকে রয়েছে বৈশ্বিক অস্থিরতার ঝুঁকি। এই বাস্তবতায় বিচক্ষণ, দূরদর্শী এবং স্বার্থকেন্দ্রিক কূটনীতিই হতে পারে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি।

সফর, বৈঠক ও যৌথ বিবৃতির সংখ্যা দিয়ে কূটনীতির সাফল্য বিচার করা যায় না। প্রকৃত সাফল্য নির্ধারিত হবে তখনই, যখন এসব কূটনৈতিক তৎপরতা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, জ্বালানি নিরাপত্তা, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক মর্যাদা বৃদ্ধিতে বাস্তব অবদান রাখবে। বর্তমান ব্যস্ত কূটনৈতিক মৌসুম তাই শুধু ঘটনাবহুল নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অবস্থান নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ও বটে। এখন দেখার বিষয়, ঢাকা এই সুযোগগুলোকে কতটা দক্ষতার সঙ্গে জাতীয় উন্নয়নের শক্তিতে রূপান্তর করতে পারে।

লেখক: অর্থনীতিবিদ, সমাজচিন্তক ও মানবাধিকার কর্মী