images

মতামত

কৃষকের কান্না: বাজার সংস্কারে আর কত দেরি?

ঢাকা মেইল ডেস্ক

০৭ জুন ২০২৬, ০৮:৪৫ এএম

বাংলাদেশের কৃষক, মৎস্যচাষি ও ক্ষুদ্র উৎপাদকরা দেশের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি। তাদের শ্রম, ঘাম ও ঝুঁকির ওপর নির্ভর করেই দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, গ্রামীণ অর্থনীতি এবং শিল্পের কাঁচামালের একটি বড় অংশ গড়ে উঠেছে। কিন্তু পরিহাস হলো, উৎপাদন প্রক্রিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হওয়া সত্ত্বেও তারা প্রায়শই সবচেয়ে কম লাভের ভাগ পান। বরং বাজারব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে সক্রিয় মধ্যস্বত্বভোগীরা উৎপাদন ও ভোগের মধ্যবর্তী অবস্থানকে পুঁজি করে অধিকাংশ মুনাফা নিজেদের দখলে নিয়ে নেন। ফলে একদিকে উৎপাদক ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হন, অন্যদিকে ভোক্তাকে গুনতে হয় অতিরিক্ত দাম। এই বৈপরীত্য বাংলাদেশের কৃষিপণ্য বিপণন ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের এক গভীর অসুখ, যার কার্যকর প্রতিকার এখন জরুরি হয়ে উঠেছে।

প্রতিবছরই আমরা একই ধরনের সংবাদ দেখতে পাই। কখনও আলুর দাম উৎপাদন খরচের নিচে নেমে যায়, কখনও পেঁয়াজ, টমেটো, মরিচ বা বিভিন্ন মৌসুমি সবজির বাজারে ধস নামে। কৃষক ক্ষেত থেকে যে টমেটো ৫ বা ৬ টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য হন, কয়েক ঘণ্টা পর শহরের বাজারে সেই টমেটো ৩০ বা ৪০ টাকায় বিক্রি হয়। কখনও কখনও এই ব্যবধান আরও বেশি হয়। একই চিত্র দেখা যায় দুধ, ডিম, মাছ কিংবা ফলমূলের ক্ষেত্রেও। উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যকার এই বিশাল মূল্য পার্থক্য কোনো সুস্থ বাজারব্যবস্থার লক্ষণ নয়; বরং এটি সরবরাহ শৃঙ্খলের দুর্বলতা, অস্বচ্ছতা এবং মধ্যস্বত্বভোগী নির্ভরতার বহিঃপ্রকাশ।

সমস্যার মূল কারণগুলোর একটি হলো কৃষকদের বাজারে দরকষাকষির ক্ষমতার অভাব। দেশের অধিকাংশ কৃষক ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক। তাদের উৎপাদন সীমিত, পুঁজি সীমিত এবং সংরক্ষণ সুবিধাও প্রায় নেই বললেই চলে। ফসল ঘরে তোলার পর তারা দীর্ঘ সময় ধরে তা মজুত করে রাখার সামর্থ্য রাখেন না। ফলে ঋণ পরিশোধ, সংসার পরিচালনা কিংবা পরবর্তী মৌসুমের প্রস্তুতির জন্য দ্রুত পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হন। এই বাধ্যবাধকতার সুযোগ নেয় ফড়িয়া, আড়তদার ও অন্যান্য মধ্যস্বত্বভোগী গোষ্ঠী। তারা মৌসুমের শুরুতে কম দামে পণ্য কিনে পরবর্তীতে বাজার পরিস্থিতি অনুযায়ী অধিক দামে বিক্রি করে বিপুল মুনাফা অর্জন করে।

অবশ্য মধ্যস্বত্বভোগীর উপস্থিতি যে সবসময় অপ্রয়োজনীয়, তা নয়। উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যে পরিবহন, সংরক্ষণ ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় কিছু মধ্যবর্তী সেবার প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন এই মধ্যবর্তী স্তরগুলো অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায় এবং বাজারের ওপর একচেটিয়া প্রভাব বিস্তার করে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, একটি পণ্য উৎপাদক থেকে ভোক্তার হাতে পৌঁছাতে চার-পাঁচটি স্তর অতিক্রম করে। প্রতিটি স্তরে মূল্য বৃদ্ধি পায়, কিন্তু সেই অতিরিক্ত অর্থের খুব সামান্য অংশই উৎপাদকের কাছে ফিরে আসে।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বাজারে প্রায়ই সিন্ডিকেট বা কারসাজির অভিযোগ ওঠে। কোনো কোনো সময় কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়, আবার উৎপাদনের মৌসুমে কৃষকদের কাছ থেকে অস্বাভাবিক কম দামে পণ্য কিনে নেওয়া হয়। এর ফলে বাজারের স্বাভাবিক প্রতিযোগিতা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং উৎপাদক-ভোক্তা উভয় পক্ষই ক্ষতির শিকার হন। একটি কার্যকর বাজারব্যবস্থায় মূল্য নির্ধারিত হওয়ার কথা চাহিদা ও জোগানের ভিত্তিতে; কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলোর স্বার্থই মূল্য নির্ধারণে বড় ভূমিকা পালন করে।

এই পরিস্থিতির জন্য শুধু বাজারের কিছু অসাধু ব্যবসায়ীকে দায়ী করলে চলবে না; রাষ্ট্রকেও নিজের ভূমিকা নিয়ে আত্মসমালোচনা করতে হবে। স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরও কৃষিপণ্য বিপণনের ক্ষেত্রে একটি আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও উৎপাদকবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তোলা যায়নি। দেশের বহু অঞ্চলে পর্যাপ্ত কোল্ড স্টোরেজ নেই, আধুনিক গুদাম নেই, কৃষিপণ্য সংগ্রহ ও পরিবহনের কার্যকর ব্যবস্থা নেই। ফলে কৃষকরা বাজারে সুবিধাজনক সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করার সুযোগ পান না।

বিশ্বের অনেক দেশে কৃষক সমবায় বাজারব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সমবায়ভিত্তিক বিপণনের মাধ্যমে উৎপাদকরা সরাসরি পাইকারি বাজার কিংবা খুচরা বিক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহ করতে পারেন। এতে মধ্যস্বত্বভোগীর সংখ্যা কমে এবং উৎপাদকরা ন্যায্য মূল্য পান। বাংলাদেশেও সমবায় আন্দোলনের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে, কিন্তু কৃষিপণ্য বিপণনে সেই সম্ভাবনাকে কাঙ্ক্ষিতভাবে কাজে লাগানো যায়নি। এখন নতুন করে এ বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ার সময় এসেছে।

আরও পড়ুন

ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের প্রশ্নে আপস নেই

ইসলামী ব্যাংক নিয়ে রাজনীতি নয়, হোক সংস্কারের আলোচনা

একই সঙ্গে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন। কৃষিপণ্যের অনলাইন বাজার, ডিজিটাল নিলামব্যবস্থা এবং সরাসরি ক্রেতা-উৎপাদক সংযোগ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হলে বাজারে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে। কৃষক জানতে পারবেন কোথায় তার পণ্যের মূল্য কত, আর ভোক্তাও জানতে পারবেন তিনি যে মূল্য দিচ্ছেন তার কত অংশ প্রকৃত উৎপাদকের কাছে পৌঁছাচ্ছে।

সরকারের উচিত কৃষিপণ্যের বাজার পর্যবেক্ষণে আরও সক্রিয় হওয়া। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, প্রতিযোগিতা কমিশন এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে কেবল অভিযান পরিচালনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; বরং বাজার কাঠামোর দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। কোথায় মূল্য বৃদ্ধি হচ্ছে, কেন হচ্ছে এবং কোন স্তরে অস্বাভাবিক মুনাফা নেওয়া হচ্ছে—এসব বিষয়ে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশের ব্যবস্থা থাকতে হবে।

মনে রাখতে হবে, কৃষকের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা কেবল একটি অর্থনৈতিক বিষয় নয়; এটি সামাজিক ন্যায়বিচার, খাদ্য নিরাপত্তা এবং টেকসই উন্নয়নের প্রশ্ন। একজন কৃষক যদি বারবার লোকসানের মুখে পড়েন, তাহলে তিনি কৃষিকাজ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন। এর প্রভাব শুধু তার পরিবারে সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর অভিঘাত পড়বে জাতীয় উৎপাদন, খাদ্য সরবরাহ এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর।

বাংলাদেশ আজ মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার পথে। উন্নয়নের নানা সূচকে অগ্রগতির কথা আমরা গর্বের সঙ্গে বলি। কিন্তু যে কৃষক দেশের খাদ্য নিরাপত্তার ভিত্তি গড়ে তুলছেন, তিনি যদি নিজের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য না পান, তাহলে সেই উন্নয়ন পূর্ণতা পাবে না। উৎপাদক ও ভোক্তার স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা, মধ্যস্বত্বভোগীর অযৌক্তিক প্রভাব হ্রাস এবং একটি স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক বাজারব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন আর বিলাসিতা নয়—এটি রাষ্ট্রের অপরিহার্য দায়িত্ব।

কৃষকের ঘামের মূল্য যেন আর ফড়িয়ার মুনাফায় হারিয়ে না যায়—সেই নিশ্চয়তা দেওয়াই হওয়া উচিত নীতিনির্ধারকদের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। কারণ কৃষক বাঁচলে কৃষি বাঁচবে, আর কৃষি বাঁচলে দেশের অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তার ভিত্তিও থাকবে সুদৃঢ়।

লেখক: অর্থনীতিবিদ, সমাজচিন্তক ও মানবাধিকার কর্মী