মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের প্রশ্নে আপস নেই

মো. মুখলেছুর রহমান
প্রকাশিত: ০৫ জুন ২০২৬, ০২:৪১ পিএম

শেয়ার করুন:

ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের প্রশ্নে আপস নেই
মো. মুখলেছুর রহমান। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সংকট কোনো নতুন ঘটনা নয়। গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে একের পর এক ঋণ কেলেঙ্কারি, বেনামি ঋণ বিতরণ, অর্থপাচার, দুর্বল তদারকি এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে দেশের আর্থিক খাত বারবার আস্থার সংকটে পড়েছে। এই সময়ে রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতাগুলোর একটি হলো—যারা ব্যাংক খাতকে দুর্বল করেছে, তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যায়নি। বরং অনেক ক্ষেত্রে তারা প্রভাব ও ক্ষমতার বলয়ে থেকে গেছেন। এমন বাস্তবতায় ‘ব্যাংক রেজুলেশন আইন’-এর বিতর্কিত ১৮(ক) ধারা বাতিলের উদ্যোগ শুধু একটি আইনি সংশোধন নয়; এটি দেশের আর্থিক খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে রাষ্ট্রের অবস্থান স্পষ্ট করারও একটি পরীক্ষা।

গত ১০ এপ্রিল সংসদে পাস হওয়া ব্যাংক রেজুলেশন আইনে শেষ মুহূর্তে যুক্ত করা হয়েছিল ১৮(ক) ধারা। সেখানে বলা হয়েছিল, কোনো ব্যাংক পুনর্গঠন বা অবসায়নের আওতায় যাওয়ার আগে যারা সেই ব্যাংকের মালিক বা শেয়ারহোল্ডার ছিলেন, তারা পরবর্তীতে আবারও ওই ব্যাংকের সম্পদ, দায় ও শেয়ার গ্রহণের জন্য আবেদন করতে পারবেন। বাংলাদেশ ব্যাংক চাইলে অন্য কাউকেও একই সুযোগ দিতে পারবে।

আইনটির এই অংশ প্রকাশ্যে আসার পর অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার, সুশীল সমাজ এবং সাধারণ আমানতকারীদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি হয়। কারণ প্রশ্নটি ছিল আইনের ভাষা নিয়ে নয়; বরং এর সম্ভাব্য ব্যবহার নিয়ে। দেশের মানুষ খুব ভালো করেই জানে, ব্যাংকিং খাতের বর্তমান সংকটের পেছনে কোনো বিমূর্ত শক্তি নয়, বরং নির্দিষ্ট ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর ভূমিকা রয়েছে। যারা হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ নিয়েছে, নিয়ম ভেঙেছে, প্রভাব খাটিয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংককে কার্যত ব্যক্তিগত সম্পদে পরিণত করেছে, তাদের জন্য আবারও মালিকানায় ফেরার সুযোগ রাখা কেন প্রয়োজন—এই প্রশ্নের কোনো গ্রহণযোগ্য উত্তর তখন পাওয়া যায়নি।

বাংলাদেশের পাঁচটি ইসলামী ধারার ব্যাংক—এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক—সাম্প্রতিক সময়ে এই বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল। বিগত সরকারের সময় একটি প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে থাকা এসব ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ বিতরণ, বেনামি অর্থায়ন এবং অনিয়মের অভিযোগ প্রকাশ্যে আসে। পরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করে এবং বিভিন্ন সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নেয়। কিন্তু আর্থিক সংকট কাটিয়ে ওঠার পাশাপাশি সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা।

ব্যাংকিং খাতে আস্থা একবার নষ্ট হলে তা ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত কঠিন। একজন আমানতকারী ব্যাংকে টাকা রাখেন এই বিশ্বাসে যে তাঁর অর্থ নিরাপদ থাকবে এবং প্রতিষ্ঠানটি সুশাসনের ভিত্তিতে পরিচালিত হবে। কিন্তু যখন তিনি শুনতে পান, যে গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যাংক ধ্বংসের অভিযোগ রয়েছে, তারাই আবার কোনো না কোনোভাবে ফিরে আসতে পারে, তখন স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ সৃষ্টি হয়। সাম্প্রতিক সময়ে কিছু ব্যাংক থেকে আমানত উত্তোলনের প্রবণতা সেই উদ্বেগেরই প্রতিফলন।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এই ধারা আর্থিক খাত সংস্কারের মূল দর্শনের সঙ্গেই সাংঘর্ষিক। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ব্যাংক রেজুলেশন বা ব্যাংক পুনর্গঠন আইন প্রণয়নের মূল উদ্দেশ্য হলো আমানতকারীদের সুরক্ষা, আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং ব্যর্থ ব্যবস্থাপনার দায় নির্ধারণ। কোথাও এই আইন এমনভাবে ব্যবহার করা হয় না, যাতে ব্যর্থ বা বিতর্কিত মালিকেরা পুনরায় একই প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার সুযোগ পান।

এই কারণেই বিশ্বব্যাংকের আপত্তি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। জানা গেছে, এই ধারা বহাল থাকলে বাংলাদেশের জন্য সম্ভাব্য ১৬৫ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ সহায়তা অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারত। বিষয়টিকে কেউ কেউ বিদেশি চাপ হিসেবে দেখতে পারেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো অর্থায়নের আগে সংশ্লিষ্ট দেশের আর্থিক খাতের সুশাসন ও সংস্কার কর্মসূচি মূল্যায়ন করে। তাদের প্রশ্ন ছিল খুবই সরল—যারা ব্যাংককে বিপর্যস্ত করেছে, তাদের জন্য কেন পুনরায় ফিরে আসার আইনি সুযোগ রাখা হবে?

আরও পড়ুন

ইসলামী ব্যাংক নিয়ে রাজনীতি নয়, হোক সংস্কারের আলোচনা

বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নতুন অর্জন, গৌরবের সঙ্গে বর্তাবে দায়িত্বও

এই প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর সরকারের কাছেও ছিল না বলেই মনে হয়। ফলে শেষ পর্যন্ত বিতর্কিত ধারা বাতিলের সিদ্ধান্তের দিকে অগ্রসর হতে হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে এটিকেই চূড়ান্ত সাফল্য মনে করা সমীচীন হবে না।

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের প্রকৃত সংকট একটি ধারা বা একটি আইনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। খেলাপি ঋণের পাহাড়, অর্থপাচার, দুর্বল করপোরেট গভর্ন্যান্স, রাজনৈতিক প্রভাব এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার সীমাবদ্ধতা—সব মিলিয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংকট তৈরি হয়েছে। আজও বহু বড় ঋণখেলাপির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগেরও পূর্ণাঙ্গ নিষ্পত্তি হয়নি। অনেক ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক অবস্থাও সাধারণ আমানতকারীদের কাছে স্পষ্ট নয়।

সুতরাং কেবল বিতর্কিত ধারা বাতিল করাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন আরও গভীর সংস্কার। যারা ব্যাংক লুটপাটের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর বিচার নিশ্চিত করতে হবে। ঋণ পুনরুদ্ধারে দৃশ্যমান অগ্রগতি আনতে হবে। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদকে রাজনৈতিক বিবেচনার বাইরে এনে পেশাদার ও জবাবদিহিমূলক কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রকৃত অর্থে স্বাধীন ও শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।

অন্তর্বর্তীকালীন সংস্কার থেকে শুরু করে বর্তমান সরকারের ব্যাংক খাত পুনর্গঠনের উদ্যোগ—সবকিছুর সফলতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে একটি মৌলিক প্রশ্নের ওপর: রাষ্ট্র কার পক্ষে দাঁড়াবে? আমানতকারীদের পক্ষে, নাকি ব্যাংক লুটেরাদের পক্ষে?

বিতর্কিত ১৮(ক) ধারা বাতিলের সিদ্ধান্ত সেই প্রশ্নের একটি ইতিবাচক উত্তর দেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে। এখন প্রয়োজন সেই অবস্থানকে আরও সুস্পষ্ট করা। কারণ ব্যাংক খাতের সংস্কার তখনই অর্থবহ হবে, যখন জনগণ নিশ্চিত হবে যে দেশের কোনো ব্যাংক আর কখনো কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক প্রভাবের ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত হবে না।

বাংলাদেশের অর্থনীতির স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং সাধারণ মানুষের সঞ্চয়ের নিরাপত্তা—সবকিছুই এর সঙ্গে জড়িত। তাই ব্যাংক সংস্কারের মূলনীতি হওয়া উচিত একটিই—ব্যাংক বাঁচবে, আমানতকারীরা সুরক্ষা পাবে; কিন্তু ব্যাংক লুটেরাদের জন্য আর কোনো পেছনের দরজা খোলা থাকবে না।

লেখক: অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার ও মানবাধিকার কর্মী

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর