images

মতামত

সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে সংঘাত নয়, সম্প্রীতির বিজয় হোক

ঢাকা মেইল ডেস্ক

৩০ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:২৯ পিএম

সুদীর্ঘ এক যুগ পর বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় নির্বাচন হতে যাচ্ছে। অন্যান্য জাতীয় নির্বাচনের থেকে ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন দুই দিক দিয়ে গুরুত্ববহ। প্রথমত বাংলাদেশের স্বাধীনতায় নেতৃত্বদানকারী দলটি এবার নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। আর দ্বিতীয়ত তাদের ১৫ বছরের শাসনামলের পৈশাচিকতার বিরুদ্ধে গণ‌অভ্যুত্থানকেন্দ্রিক জুলাই সনদের উপর গণভোট। দুটিই মূলত আ. লীগ রাজনীতির জন্য সবিশেষ ক্ষতিকর। আ. লীগ বিহীন নির্বাচনে কমন‌ওয়েলথ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারত ব্যতীত অন্য দেশগুলো যেভাবে পর্যবেক্ষক পাঠানোর উৎসব মুখর ঘোষণা দিয়েছে তাতে এই মুহূর্তে আ. লীগ বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রায় অপ্রাসংগিক।

তাই এবারের জাতীয় নির্বাচন আ. লীগ ছাড়াও গণতন্ত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎসব। এই সময় মানুষ তাদের মতামত, আশা-আকাঙ্ক্ষা ও ভবিষ্যৎ ভাবনা ব্যালটের মাধ্যমে প্রকাশ করবে। কিন্তু যদি এই উৎসব সহিংসতায় রূপ নেয়, তাহলে গণতন্ত্রের সৌন্দর্য ম্লান হয়ে যাবে। রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়বে, এবং সমাজে সৃষ্টি হবে ভয়, বিভাজন ও অবিশ্বাস। নির্বাচনী সহিংসতা কিছু তাৎক্ষণিক প্রাণহানি বা ভাঙচুরের ঘটনা নয়, এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদী। গভীর এবং বহুস্তরীয়।

নির্বাচনী সহিংসতা ভোটের আগে, ভোট চলাকালীন বা পরে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সংঘটিত মারধর, হত্যা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, ভয়ভীতি প্রদর্শন, ভোটার বা প্রার্থীদের হুমকির সাথে সম্পর্কিত।  নির্বাচনী সহিংসতার পেছনে সাধারণত কয়েকটি কারণ কাজ করে: যথা- ক্ষমতা হারানোর ভয়, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, স্থানীয় আধিপত্যের লড়াই, প্রশাসনিক দুর্বলতা, দণ্ডমুক্তির সংস্কৃতি, দলীয় ক্যাডারভিত্তিক রাজনীতি ইত্যাদি।

যখন রাজনীতি জনকল্যাণের নীতি থেকে সরে গিয়ে শক্তি প্রদর্শন ও অর্থোপার্জনের খেলায় পরিণত হয়, তখন নির্বাচন হয়ে ওঠে সংঘর্ষের সমরক্ষেত্র। এইসব সংঘাত সংঘর্ষ ও সহিংসতায় উগ্র ও অগণতান্ত্রিক শক্তি লাভবান হয়। গণতান্ত্রিক পরিবেশে যুক্তি, জনসমর্থন ও নীতির ভিত্তিতে রাজনীতি করতে হয়। কিন্তু যারা জনপ্রিয়তার ঘাটতিতে ভোগে বা গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতায় দুর্বল, তারা সহিংসতার মাধ্যমে মাঠ দখল করতে চায়। ভয় দেখিয়ে ভোটারদের ঘরে আটকে রাখা, বিরোধী এজেন্টদের কেন্দ্রে ঢুকতে না দেওয়া, প্রার্থীদের প্রচারে বাধা দেওয়া, এসবের মাধ্যমে তারা কৃত্রিমভাবে প্রভাব বিস্তার করে। অর্থাৎ, সংঘাত-সহিংসতা গণভিত্তিহীন রাজনীতির জন্য এক ধরনের শর্টকাট রাস্তা।

স্থানীয় সন্ত্রাসী ও পেশিশক্তিনির্ভর গোষ্ঠী

এবারকার নির্বাচনেও কিছু কিছু এলাকায় রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় শক্তিশালী সন্ত্রাসী বলয় গড়ে তুলেছে। তারা ভোটকেন্দ্র দখল, ব্যালট ছিনতাই, প্রতিপক্ষকে মারধর এসবের বিনিময়ে পায় ভবিষ্যৎ সুবিধা যেমন:

টেন্ডার বাণিজ্য, দখলদারিত্ব, চাঁদাবাজি, প্রশাসনিক প্রভাব, অপরাধীরা পায় মামলা থেকে রেহাই। এভাবে নির্বাচনী সহিংসতা তাদের জন্য বিনিয়োগের মতো। আজ সহিংসতা সংঘর্ষ, গুন্ডামি, মাস্তানি, কাল ক্ষমতার ভাগ।

কখনও কখনও সহিংসতা ইচ্ছাকৃতভাবে সৃষ্টি করা হয় অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির জন্য, যাতে বলা যায় 'দেশ অরাজকতার দিকে যাচ্ছে'। এতে দুটি উদ্দেশ্য থাকতে পারে: ১. নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা ও ২. জরুরি বা কঠোর নিয়ন্ত্রণমূলক পরিস্থিতির যৌক্তিকতা তৈরি করা। অর্থাৎ, সহিংসতা দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে।

রাজনীতির কারিগররা

নির্বাচনী সহিংসতার সময়  দ্রুত  গুজব ছড়ায়। 'অমুক দল আক্রমণ করেছে'। 'অমুক ধর্ম/গোষ্ঠী টার্গেট' এসব কথা ইচ্ছাকৃতভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এতে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বাড়ে। সমাজে সৃষ্টি হয় অস্থিরতা। আর যারা বিভাজনের রাজনীতি করে তারা সুযোগ পায় নিজেদের অবস্থান শক্ত করার।

নির্বাচনী সহিংসতায় সাধারণ ভোটার ও সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সাধারণ ভোটার হোক নারী বা পুরুষ তারা চায় শান্তিপূর্ণভাবে ভোট দিতে। কিন্তু সহিংসতার ভয়ে, অনেক সময় দেখা যায়, তারা ভোটকেন্দ্রে যায় না। লাইনে দাঁড়াতে ভয় পায়। নিজের মত প্রকাশ থেকে বিরত থাকে। ফলে তাদের সাংবিধানিক অধিকার কার্যত ছিনিয়ে নেওয়া হয়। গণতন্ত্র তখন শুধু কাগজে লেখা বাংলা বর্ণমালা, বাস্তবে নয়।

নির্বাচনী সহিংসতায় নিহত বা আহত ব্যক্তিদের বড় অংশই হয়তো সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নয়। কেউ দোকানদার, কেউ পথচারী, কেউ কৌতূহলী দর্শক। অথচ মৃত্যু বা পঙ্গুত্ব মানে একটি পরিবার আর্থিক ও মানসিকভাবে নিঃশেষ হয়ে যাওয়া।

শিশুরা বাবাকে হারায়। মা-বাবা সন্তান হারায়। পরিবার ঋণের বোঝা বইতে থাকে। সহিংসতা শেষ হলেও তাদের কষ্ট শেষ হয় না।

সহিংসতা রাজনীতির মান কমিয়ে দেয়। তখন প্রাধান্য পায়: কে বেশি শক্তিশালী? কার দখল ক্ষমতা বেশি? কে কত ভয় দেখাতে পারে? ইত্যাদি।

আরও পড়ুন

বিএনপি বনাম জামায়াত এবং জনগণের প্রত্যাশা

ফলে নীতিনিষ্ঠ, শিক্ষিত, ভদ্র ও জনবান্ধব মানুষ রাজনীতি থেকে দূরে সরে যায়। এভাবে রাজনীতির মাঠ মার্জিত ও ভদ্রলোকশূন্য হয়ে যায়। পেশিশক্তিনির্ভরদের জন্য দীর্ঘমেয়াদে গণতন্ত্রের ভয়াবহ ক্ষতি হয়।

যখন নির্বাচনে রক্ত ঝরে, মানুষ প্রশ্ন তোলে: প্রশাসন কী করছিল? আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিরপেক্ষ ছিল কি? নির্বাচন কমিশন পরিস্থিতি সামলাতে পেরেছে কি?

এই প্রশ্নগুলো যদি বারবার ওঠে, তাহলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনগণের আস্থা কমে যায়। একবার আস্থা ভেঙে গেলে তা পুনর্গঠন করা খুব কঠিন।

নির্বাচনী সহিংসতায় দোকানপাট বন্ধ থাকে। যানবাহন চলে না। বাজার অচল হয়ে পড়ে। দিনমজুর কাজ হারায়। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী লোকসান গোনে। একটি এলাকায় কয়েক দিনের সহিংসতা মানে কয়েক মাসের আর্থিক ধাক্কা।

বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখে বিনিয়োগে আস্থা হারিয়ে ফেলে। ফলে জাতীয় অর্থনীতিও প্রভাবিত হয় এবং ক্ষেত্রবিশেষে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

Ec2

বিশ্ব এখন তথ্যনির্ভর।কোথাও সহিংস নির্বাচন হলে তা দ্রুত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রচার করা হয়। তখন আমাদের দেশ সম্পর্কে ধারণা তৈরি হয় এই রকম যে, বাংলাদেশ রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল রাষ্ট্র। সেখানে গণতন্ত্র দুর্বল ও ভঙ্গুর। আইনশৃঙ্খলা অনিশ্চিত। এতে কূটনৈতিক সম্পর্ক, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, সবক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। নির্বাচনী সহিংসতায় কোন দলের স্বল্পমেয়াদি লাভ হলেও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হয়। যারা সহিংসতার মাধ্যমে কোনো আসন দখল করে বা প্রভাব বিস্তার করে, তারা হয়তো সাময়িক লাভ পায়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তারাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

আরও পড়ুন

এবারের নির্বাচনের প্রেক্ষাপট

কারণ: সহিংসতার সংস্কৃতি একবার শুরু হলে তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। আজ যে অন্যকে ভয় দেখায়, কাল সে নিজেই টার্গেট হয়। রাজনীতিতে বিশ্বাসের জায়গা নষ্ট হলে শাসন করাও কঠিন হয়ে পড়ে। অর্থাৎ, সহিংসতা বুমেরাং হয়ে ফিরে এসে আঘাত করবেই।

সমাজে মানসিক প্রভাব

নির্বাচনী সহিংসতা মানুষের মনে স্থায়ী ভীতি তৈরি করে। রাজনীতি মানেই মারামারি, এমন ধারণা জন্মায়। তরুণ প্রজন্ম রাজনীতি থেকে বিমুখ হয় বা উল্টোভাবে সহিংস রাজনীতিকেই স্বাভাবিক ভাবতে শুরু করে। এতে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সংস্কৃতিও বিকৃত ও ভীতিকর হয়। নির্বাচনী সহিংসতার লাভ-ক্ষতির হিসাব বুঝে এটাকে বন্ধ করার জন্য কিছু মৌলিক পদক্ষেপ জরুরি

দলগুলোর অভ্যন্তরীণ শুদ্ধি।সন্ত্রাসী নির্ভর রাজনীতি পরিহার। দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার। সহিংসতার দায়ে জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত করা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পেশাদারিত্ব এবং নির্বাচন কমিশনের দৃঢ়তা। সচেতন নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যম। রাজনৈতিক সহনশীলতা ও সংলাপের সংস্কৃতি গড়ে তোলা।

নির্বাচনী সহিংসতায় প্রকৃত অর্থে জনগণের কোনো লাভ নেই। গণতন্ত্রেরও নেই। বরং দেশের ভয়াবহ ক্ষতি। রাজনৈতিক দল ও এর নেতা কর্মী সমর্থকদের মনে রাখতে হবে, সাময়িকভাবে লাভবান হয় কেবল পেশিশক্তিনির্ভর, অগণতান্ত্রিক ও সুযোগসন্ধানী গোষ্ঠী। কিন্তু তাদের এই লাভ দীর্ঘস্থায়ী নয়। বরং তা পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থাকে দুর্বল করে। সমাজে বিভাজন বাড়ায়। এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রেখে যায় ভয় ও অবিশ্বাসের উত্তরাধিকার।

অন্যদিকে ক্ষতির তালিকা বিশাল। সাধারণ মানুষ, পরিবার, অর্থনীতি, গণতন্ত্র, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, সবাই কোন না কোনভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়। তাই নির্বাচনী সহিংসতা আসলে একটি আত্মঘাতী প্রবণতা। এটি প্রতিপক্ষকে যতটা ক্ষতিগ্রস্ত করে, তার চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করে পুরো জাতিকে। সত্যিকারের রাজনৈতিক শক্তি বন্দুক বা লাঠিতে নয়। তা জনসমর্থন, নৈতিকতা ও বিশ্বাসে।   যে রাজনীতি এই সত্য বোঝে, সেই রাজনীতিই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে। সেই রাজনীতিই আদর্শিক রাজনীতি। যে দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। আগামী দিনের রাজনীতি সংঘাত নয়, হোক সম্প্রীতিময়।

লেখক: কলামিস্ট ও রাজনীতি বিশ্লেষক