জোটের পরে ভোটের যুদ্ধ শুরু। ভোটের প্রচার মাঠে জমে উঠেছে। ভোটের লড়াই জমতে আরও কিছুদিন লাগবে। তবে এর-ই মাঝে বিএনপি বনাম জামায়াতের ভোটের খেলা বেশ জমে উঠেছে। বিএনপি বলতে এখন তারেক রহমানকে বোঝালেও জামায়াত বলতে শুধু শফিকুর রহমান নয়। যদিও দুইজনই দুই জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। বিএনপি অনেক চেষ্টা করেও এনসিপিকে জোটে ভেড়াতে না পারায় বিএনপি জোট বলতে বস্তুত বিএনপি-কেই বোঝালেও জামায়াত জোট বলতে শুধু জামায়াতকে বোঝায় না। জামায়াত জোট বলতে এখন এনসিপি ও মাওলানা মামুনুল হককেও দারুণভাবে বোঝাচ্ছে। তবে এসব হিসাব নিকাশ ভোটের মাঠে কতোটা প্রভাব ফেলবে তা সময়-ই বলে দেবে।
বিএনপির রয়েছে ব্যাপক জনসমর্থন। সাথে ৫ আগস্টের পর নানাবিধ বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অপরাধ ও অপবাদ। পক্ষান্তরে জামায়াতের রয়েছে ভুক্তভোগীদের পাশে থাকার নজির ও ক্ষেত্রবিশেষে প্রবল আশ্বাস। যে কারণে জামায়াত জোট বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। তবে তা ভোটে জয়লাভ করে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়।
বিজ্ঞাপন
গণঅভ্যুত্থানের পর মানুষ বদলে গেছে এই ধারণা বহুলাংশে ভুল। ক্ষেত্রবিশেষে তা মহা-ভুল। কারণ, যারা গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্বস্থানীয় ভূমিকা পালন করেছিলেন তারাও নানাভাবে বিতর্কিত হয়েছেন। মানুষের মনে ব্যাপক নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি সৃষ্টি হয়েছে তাদের ব্যাপারে। এটি বিএনপির জন্য প্লাস পয়েন্ট। আবার আলেম-ওলামা বর্তমানে ওয়াজের ময়দানে যেভাবে প্রচার চালাচ্ছেন, তাতে জামায়াত জোট উপকৃত হচ্ছে। পক্ষান্তরে বিএনপির প্রচার তারেক রহমানকেন্দ্রিক। অন্যরা কথা বললেই তা এলোমেলো হচ্ছে। দলের মূলনীতির বাইরে তারা অনেক সময় ভুলনীতি প্রচার করছে। এতে জনসাধারণ শুধু বিভ্রান্তই হচ্ছে না, সাথে নাথে বিরক্ত-ও হচ্ছে।
বহু বছর পর ভোট হতে যাচ্ছে। দেশে উৎসবমুখর পরিবেশ। তবে আওয়ামী লীগ এখনো অপ্রাসঙ্গিক হয়নি। কারণ আওয়ামী লীগের বড় ভোটব্যাংক বা প্রতিবেশী দেশের প্রভাব শুধু এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ তা নয়, বরং আ.লীগের শোচনীয় বিদায়ের পর বর্তমান সরকারও মূলত তাদের অ্যানেক্সার হিসেবেই রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। গত দেড় বছরে উল্লেখ করার মতো জনহিতকর কোনো সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন দেখা যায়নি। সর্বত্র উন্নয়ন কার্যক্রম স্থবির। বিদেশি বিনিয়োগ নেই বললেই চলে। শিক্ষা-স্বাস্থ্য খাতের অবস্থা রীতিমত ভগ্ন-দশা ও সীমাহীন জরাজীর্ণ। পরিবেশ বিপর্যায়ের দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশ। কিন্তু দায়িত্বপ্রাপ্ত যিনি তিনি নিজের পরিবেশ সুন্দর করা নিয়েই ব্যাপকভাবে ব্যস্ত। আইনশৃঙ্খলার অবস্থা ভয়াবহ খারাপ। নির্বাচনের আগে তা প্রচণ্ডতম খারাপ হওয়ার সাংঘাতিক আশংকা আছে। কিন্তু বরাবরই সেই মহান-দেষ্টা রিঅ্যাকটিভ। প্রো-অ্যাকটিভ হতে পারলেন না। ঘটনার ঘটার পর আড়ষ্ট কণ্ঠে তিনি জাতিকে আশ্বস্ত করেন।
তাই সামনে নির্বাচনি পরিবেশ কেমন হবে তা বলা এখনো মুশকিল। প্রচার জমছে। ভোটযুদ্ধ ও জোটযুদ্ধ সমভাবে চলমান। কিন্তু এটি যে জনযুদ্ধে রূপায়িত হবে না তা বলা যায় না। কারণ দুই জোটের প্রচারের ভাষা এখনই উত্তেজনা সৃষ্টি করছে। মুক্তিযুদ্ধ, যুদ্ধাপরাধের বিচার, ধর্ম বনাম রাষ্ট্র, রাজনীতি বনাম ধর্ম, সংখ্যালঘু ও নারী অধিকার, গণতন্ত্র বনাম আদর্শিক শাসন, এসব নিয়ে অমীমাংসিত বিতর্ক চলমান আছে। এই বক্তব্যগুলো তাদের রাজনৈতিক বিশ্বাসের প্রতিফলন হলেও, বাংলাদেশের ইতিহাস, সংবিধান ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে সংঘর্ষে গিয়ে জাতীয় বিতর্ক ও জনমনে অনাস্থা তৈরি করেছে।
বিজ্ঞাপন
আমরা এখনো দাতানির্ভর রাষ্ট্র। বা আরও স্পষ্ট করে বলা যায় বাংলাদেশ তার অর্থনীতির জন্য উন্নত রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল। উন্নত বিশ্ব রাষ্ট্রক্ষমতায় কাদের চায়: সেটি সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তারা পরিপূর্ণ ইসলামী রাষ্ট্র চায় না। তবে বাস্তবতা হলো-উন্নত বিশ্ব ব্যক্তি বা দলের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব দেয় একটি দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাকে। উন্নত বিশ্ব মূলত রাষ্ট্রকে দেখে স্বার্থ, স্থিতিশীলতা ও লাভালাভের দৃষ্টিকোণ থেকে। তাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো হলো- আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুসরণ, স্থিতিশীল সরকারব্যবস্থা, বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের নিরাপত্তা, মানবাধিকার সংক্রান্ত বিষয়ে বিশেষ সতর্কতা। এই সমস্ত দর্শনকে সামনে রেখেই তারা গণতন্ত্রের কথা বলে। কিন্তু তারা গণতন্ত্রকে দেখে একটি বাস্তবভিত্তিক ও প্রায়োগিক প্রক্রিয়া হিসেবে, কোনো দলের স্লোগান হিসেবে নয়। তাদের প্রত্যাশা- অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। বিরোধী দলের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ সৃষ্টি। মতপ্রকাশ ও গণমাধ্যমের ন্যূনতম স্বাধীনতা প্রদান। গণতন্ত্র না থাকলে তারা অস্বস্তি বোধ করে, কারণ এতে রাষ্ট্র অস্থিতিশীল হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে তাদের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এছাড়াও মানবাধিকার উন্নত বিশ্বের জন্য একদিকে নৈতিক ইস্যু, অন্যদিকে রাজনৈতিক হাতিয়ার। গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, বিরোধী মত প্রকাশ দমন, সংখ্যালঘু নিপীড়নের মতো বিষয় তাদের জন্য সমস্যা সৃষ্টি করে। কারণ, অভ্যন্তরীণ জনমত চাপে পড়ে। আন্তর্জাতিক ফোরামে প্রশ্ন ওঠে। নিষেধাজ্ঞা ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হয়। তাই তারা এমন শাসন ব্যবস্থা চায়, যেখানে মানবাধিকার ইস্যুতে সরকার থাকবে আপসহীন ও কঠোর। বাংলাদেশে কিছু কিছু ছোট গোষ্ঠী চরমপন্থার কথা বলেন। তারা ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব কারো সাথে শত্রুতা নয়’ এই মূলনীতিকে ভুল প্রমাণ করার প্রচেষ্টা চালায়। এতে বিদেশিদের সাথে পারস্পারিক সম্পর্ক বিনষ্ট হয়। তাই উন্নত বিশ্ব চরমপন্থা ভয় পায়। ধর্মীয় উগ্রতা, একদলীয় বা একমাত্রিক সত্যের দাবি বস্তুত আতংকের জায়গা। কারণ এসব রাজনীতি অনিশ্চয়তা তৈরি করে। আঞ্চলিক অস্থিরতা বাড়ায়। মারাত্মক নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করে। তাই তারা মধ্যপন্থী, হিসাবি ও কূটনৈতিক শক্তিকে বেশি গ্রহণযোগ্য মনে করে।
সবশেষে বলা যায়, তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে মানুষের ধ্যান-ধারণা, বিবেক-বুদ্ধি, বিচার-বিশ্লেষণ আর কোনোভাবেই একটি সীমানার মাঝে বদ্ধ নেই। তাই মানুষের মনোভাব গোপন রয়েছে। ভোটের মাঠে একটি নীরব ব্যালট বিপ্লবের সম্ভাবনা আছে। সেই বিপ্লব যে কোন্ পক্ষে সংঘঠিত হবে তা এখনই বলা যাচ্ছে না। একেবারেই শেষ মুহূর্তেও তা জামায়াত জোটের দিকে হেলে পড়তে পারে। বিএনপি জোটকে সে-বিষয়টি অতীব গুরুত্বপূর্ণভাবে গ্রহণ করা উচিত। তবে যারাই নির্বাচিত হোক তারা যেন, কার্যকর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, স্থিতিশীল সরকার, বিনিয়োগবান্ধব অর্থনীতি, মানবাধিকার লংঘন না করে এবং আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য আচরণ করে, জনগণ তাই-ই চায়।
লেখক: কলামিস্ট ও রাজনীতি বিশ্লেষক

