ঢাকা মেইল ডেস্ক
২২ নভেম্বর ২০২৫, ০৭:০৪ পিএম
২১ নভেম্বরে সকালটা ছিল ধোঁয়াচ্ছন্ন। ২২ নভেম্বরের আকাশে ধূসর কুয়াশা, রাস্তায় ক্লান্ত ব্যস্ততা আর শহরটি নিজের মতো করে জেগে উঠছিল। হঠাৎ, পরপর দুই দিনের এক অনাহুত দুলুনি যেন অদৃশ্য হাতে পুরো পরিবেশটাকে আলগা করে দিল। দেয়ালে ফাটল ধরল, জানালা কেঁপে উঠল, পোড়া ইটের পুরনো বাড়িগুলো যেন অতীতের ভয় স্মরণ করে শিউরে উঠল। পুরান ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গার দেওয়াল ধসে পড়া হতাহতের ঘটনা আমাদের কানে আসছে। ঢাকার বাইরে নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, টঙ্গী, নরসিংদী—সব জায়গায় একই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। কেউ বলছে, ‘মনে হলো বিল্ডিংটা যেন দুলছে।’ কেউ বললো, ‘এভাবে কাঁপলে বড় ধস নামতেই পারে।’ এই ক্ষুদ্র কম্পনই মনে করিয়ে দিল প্রকৃতি কখনো সতর্ক না করেই পরীক্ষা নিতে বসে। আর সেই পরীক্ষায় আমরা বারবারই দুর্বল প্রমাণিত হচ্ছি।
প্রতিটি কম্পনই সতর্কতার ডাক। সময় ফুরিয়ে আসছে। ২১ নভেম্বরের ভূমিকম্পটি ছিল প্রকৃতির একটি ছোট্ট টোকা। সেই টোকা আমাদের মনে করিয়ে দিল আমরা সময়ের কাছে পিছিয়ে আছি। প্রস্তুতিহীন মানুষের জীবন বাঁচাতে প্রস্তুত রাষ্ট্র গড়ে তুলতেই হবে। এখনই শুরু করতে হবে না হলে পরের কম্পন হয়তো এত সহজে পার পাওয়া যাবে না।
ভুমিকম্পে প্রস্তুতির বাস্তব পরীক্ষণ: ২১ নভেম্বরের ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্প ছিল একটি সরাসরি সতর্কবার্তা। যদিও এটি বড় মাত্রার কম্পন নয়, কিন্তু ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এটি দৌড়ঝাঁপ, আতঙ্ক ও অবিলম্বে প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছিল। সরকারি বা স্থানীয় উদ্ধার ও প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থাপনায় দেখা গেল ঘোর গ্যাপকতা: অনেক ভবন occupants সিঁড়ি ব্যবহার করছিলেন, লিফট বন্ধ হয়ে গেছে, এবং যোগাযোগ ব্যবস্থায় প্রাথমিক চাপ ছিল। এটি একটি লাইভ “স্ট্রেস টেস্ট” ছিল যেখানে আমাদের অবকাঠামো, জরুরি যোগাযোগ এবং জনসচেতনতা কতটা কার্যকর, তা পরখ করা হলো। যদি বড় ভূমিকম্প আসত, এই পরীক্ষার ফলাফল আরও ভয়ঙ্কর হতে পারত।
ভূমিকম্প ঝুঁকিতে পুরনো ঢাকার দুর্বল অবকাঠামো: পুরনো ঢাকা এমন একটি ভৌগোলিক ও বস্তি-বিস্তৃত এলাকা, যেখানে অনেক বাড়ি ইট এবং সুরকির পুরনো নির্মাণে, এবং প্রায় অনিয়ন্ত্রিতভাবে বিতর্কিত বর্ধিত ফ্লোর রয়েছে। গবেষণা দেখা গেছে যে, ঢাকা শহরে unreinforced brick masonry (URM) ধরণের ভবনগুলোর ভূমিকম্প-সহনশীলতা খুব কম।
ভূমিকম্প হলে এই ধরনের ভবন দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে কারণ তাদের কাঠামোগত গঠন সাধারণত সিল প্ল্যান এবং লোড-ব্যাহার্মূলক ডিজাইনে দুর্বল। পুরনো ঢাকার গলিপথ এবং কম রাস্তার প্রস্থ উদ্ধার কার্যকে অতিরিক্ত জটিল করবে, বিশেষ করে যদি ধ্বংস হয়।
বিল্ডিং কোড ও নির্মাণ গুণমান নিয়ম না মানা, ঝুঁকির বড় কারণ: বাংলাদেশে রয়েছে বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (BNBC), যা ভূমিকম্প-সহনশীল ডিজাইন নির্দেশ করে। তবে অনেক ভবন এই কোড মেনে নির্মিত হচ্ছে না বা কোড প্রয়োগে দুর্বলতা রয়েছে। IPD (Institute for Planning and Development) সতর্ক করে যে ভবন মালিক, ডেভেলপার এবং স্থানীয় প্রশাসন কোড উপেক্ষা করে ভবন তৈরি করছে, বিশেষত উচ্চ-চাপযুক্ত ও সংকীর্ণ রাস্তায়।
আরও একটি চ্যালেঞ্জ: আবাসিক এলাকার গ্যাস ও বিদ্যুৎ লাইনের নিরাপদ ডিজাইন ও ইনফ্রাস্ট্রাকচার নেই। ধ্বংসের মুহূর্তে রান্নাঘরের গ্যাস লাইন ফেটে বড় অগ্নিকাণ্ড হতে পারে। আর্থিক এক্সপ্রেস এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, সরকার বিল্ডিং কোড হালনাগাদ করার চিন্তা করছে, তবে প্রয়োগ থমকে আছে।
ভূ-ভৌগোলিক ঝুঁকি: ফল্ট, মাটি গঠন ও ভূতাত্ত্বিক চাপে ভেঙে পড়ার আশঙ্কা: বাংলাদেশের ভূতাত্ত্বিক মানচিত্রে বেশ কিছু সক্রিয় ফল্ট চিহ্নিত করা হয়েছে, যেমন ডাউকি ফল্ট, মধুপুর ফল্ট এবং প্লেট-বাউন্ডারি ফল্ট। ডাউকি ফল্ট বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি প্রায় ৩০০ কিমি লম্বা এবং রিভার্স ফল্ট হিসেবে কাজ করে, যা বিপুল শক্তি সঞ্চয় করতে পারে।
মীর ফজলুল করিম ও অন্যান্য ভূতত্ত্ববিদগণ উল্লেখ করেছেন যে, বেঙ্গল বেসিনে ভূ-টেকটোনিক গঠন এবং মাটি গঠন এমন, যা ভূকম্পনকে তীব্রভাবে বর্ধিত করতে পারে।
বিশেষত ঢাকার মাটি বেশ নরম ও ভেজা (deltaic sediment), যা কম্পনকে বাড়িয়ে দিতে পারে (যেমন লিকুইফ্যাকশন বা মাটির তরলকরণের ঝুঁকি)।
বড়-মাত্রার ভূমিকম্পের সম্ভাবনা; গজলতে থাকা শক্তি ও গ্যাপ থিওরি: বেশ কিছু গবেষক এবং ন্যাশনাল প্ল্যানিং সংস্থা আশঙ্কা করছেন যে, ৭–৮ মাত্রার ভূমিকম্প ভবিষ্যতে ঘটতে পারে। IPD বলেছে যে, দ্রুত নগরায়ন, ভুল মাটি ব্যবহারের পরিকল্পনা এবং বিল্ডিং কোডের উপেক্ষা combined হলে বড় কম্পনের প্রভাব আরও মারাত্মক হতে পারে। আর্গিয়া প্রটিক চৌধুরীর মতামত অনুসারে, ডাউকি ফল্টে প্রতি বছর প্রায় 1.6 সেমি এনার্জি সঞ্চয় হচ্ছে। যদি এই শক্তি মুক্তি পায়, তাহলে এটি বড় মাত্রার ভূমিকম্পে রূপ নিতে পারে। তবে কিছু সমালোচক যেমন ASM মাসকুদ কামাল বলছেন যে সব ছোট কম্পন বড় কম্পনে রূপ নেবে এমন ধারণা একদম সঠিক নয় কারণ কিছু ছোট ফল্ট কম্পন শুধু নিজস্ব স্ট্রেস রিলিজের জন্যও হতে পারে।
জনসচেতনতা ও আতঙ্ক: অনেক মানুষের মধ্যে ভূমিকম্প সম্পর্কে মৌলিক সচেতনতা নেই, একটি জরুরি একশন পয়েন্ট (যেমন “ডাক-কভার-হোল্ড”) যারা জানে, তাদের সংখ্যাও খুব কম।
সরকারি এবং বেসরকারি মিডিয়া এখনও ভূমিকম্প ঝুঁকি ও প্রতিক্রিয়া বিষয়ে নিয়মিত জনসচেতনতা প্রচার চালায় না। বিশেষত কম-আয়ের এবং ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় যোগাযোগ এবং শিক্ষা খুব সীমিত। জরুরি পরিকল্পনা (evacuation plan, প্রথম-সাহায্য কিট, যোগাযোগ পন্থা ইত্যাদি) প্রতিটি পরিবার বা কমিউনিটি পর্যায়ে আরও বেশি প্রচলন করা দরকার।
সরকারি কর্তৃপক্ষ এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা: যেমন রিপোর্ট করা হয়েছে, অনেক ভবন এখনও BNBC অনুসরণ না করেই নির্মিত হচ্ছে বা পুরনো ভবন নিরাপদ কিনা তা পর্যালোচনা করা হচ্ছে না যথাযথভাবে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রশিক্ষণ এবং উদ্ধার সক্ষমতা বাড়াতে কাজ চলছে, কিন্তু সরকারের সার্বিক প্রাপ্য মানবশক্তি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা পর্যাপ্ত নয়।
বিশেষজ্ঞরা দাবি করছেন, একটি স্পষ্ট এবং শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক সংস্থা থাকা উচিত যার কাজ হবে শক্তভাবে building code enforcement এবং ঝুঁকিপ্রবণ ভবনগুলোর নজরদারি। IPD এই ধরনের একটি building safety authority গঠনের কথা বলেছে।
স্বাস্থ্যখাত ও চিকিৎসা প্রস্তুতি: এক বড় ভূমিকম্পে হাসপাতাল ও জরুরি সেবা কেন্দ্রগুলোর ওপর চাপ অনেক বেশি হবে। কিন্তু রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশের হাসপাতালে জরুরি সেকশন, অ্যাম্বুল্যান্স সেবা এবং উদ্ধার টিম প্রতিক্রিয়া-দ্রুততার ক্ষেত্রে সঙ্কটপূর্ণ সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
বিশেষভাবে, ভবন ধ্বংস বা আংশিক ধ্বংসের ক্ষেত্রে চিকিৎসার জন্য রক্ষাকবচ এবং স্থানান্তর ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনায় ঘাটতি রয়েছে। পুনর্নির্মাণ ও উদ্ধার কার্যক্রমে অর্থায়ন এবং স্টাফ দক্ষতা বৃদ্ধি জরুরি।
মিডিয়া ও জনসংযোগ তথ্যভিত্তিক প্রতিক্রিয়া অপরিহার্য: কিছু ক্ষেত্রে মিডিয়া আতঙ্ক বাড়ায় কিন্তু তথ্যভিত্তিক, প্র্যাকটিক্যাল গাইডলাইন প্রচারের অভাব রয়েছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম এবং সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো জরুরি বার্তা এবং সক্রিয় নিরাপদ অভ্যাস (যেমন “ভূমিকম্প সময় করণীয়”) নিয়মিত প্রচার করুক। তথ্যকরী ভরসাযোগ্য প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে হবে: যেমন সরকারিভাবে অনুমোদিত ভূমিকম্প সচেতনতা ও প্রস্তুতি ওয়েবসাইট, মোবাইল অ্যাপ বা এসএমএস-সেবা, যা কম-আয় ও ঝুঁকিপ্রবণ এলাকার মানুষের কাছে সহজে পৌঁছাবে।
নগর পরিকল্পনা ও অঞ্চলে নিরাপদ জায়গার অভাব: ঢাকা শহরে পরিকল্পনা করার সময়ে ভূ-ঝুঁকি (fault zones, মাটির ধরন, সম্ভাব্য ডেথ রূপ, উদ্ধার পথ) গুরুত্বপূর্ণভাবে বিবেচনায় আনতে হবে। IPD বলেছে যে, DAP (Detailed Area Plan) এবং building zoning-এ ভূতাত্ত্বিক তথ্য উপেক্ষিত হচ্ছে। এছাড়া, জরুরী আশ্রয় কেন্দ্রের জন্য খোলা জায়গা খুব গুরুত্বপূর্ণ, বর্তমানে শহরে বেশিরভাগ জায়গায় পার্ক, খোলা মাঠ বা মুক্ত এলাকা খুব সীমিত। IPD প্রস্তাব দিচ্ছে আরও পার্ক ও উপযোগী ওপেন স্পেস তৈরি করার, যা ভূমিকম্পের সময় জরুরি শরণস্থল হিসেবে কাজ করতে পারে। নগরায়ন নীতিতে ভূমিকম্প সহনশীল ডিজাইন বাধ্যতামূলক করা উচিত, শুধু ভবন উচ্চতা নয়, বরং ভিত্তি, মাটির গঠন এবং ভবন ঘনত্ব মাথায় রেখে পরিকল্পনা করতে হবে।
জনগণের প্রস্তুতি: প্রতিটি পরিবারকে একটি জরুরি “ভূমিকম্প কিট” তৈরি করা উচিত: যাতে থাকতে পারে বোতলজাত পানি, ব্যাটারি-চালিত টর্চ, হুইসেল বা সিগন্যাল যন্ত্র, ফার্স্ট এইড সামগ্রী, মোবাইল ফোন চার্জার বা পোর্টেবল ব্যাটারি, জরুরি যোগাযোগ নম্বরসহ কপি।
‘ডাক–কভার–হোল্ড’ প্রশিক্ষণ ও ড্রিল পরিবার, স্কুল এবং অফিসে নিয়মিত অনুষ্ঠিত করা জরুরি—এটি জীবনের প্রথম প্রতিরক্ষা লাইন। স্থানীয় কমিউনিটি গোষ্ঠী (ওয়ার্ড, অ্যাসোসিয়েশন, স্কুল, মসজিদ) ভূমিকম্প-প্রস্ততি গ্রুপ গঠন করতে পারে, যারা স্থানীয় পরিকল্পনা, রেসকিউ চেইন, সহায়তা কেন্দ্র নির্ধারণ ইত্যাদি পরিচালনায় কাজ করবে।
সরকারের ওপর বড় দায়িত্ব: building code enforcement, ঝুঁকিপ্রবণ ভবন চিহ্নিত করে দ্রুত রেট্রোফিট বা নিরাপদ বিকল্প তৈরি করা, জরুরি সেবা সক্ষমতা শক্তিশালী করা এবং জনগণকে নিয়মিত সচেতন ও প্রশিক্ষিত রাখা। একই সঙ্গে, জনগণও সক্রিয় হতে হবে: সচেতনতা বৃদ্ধি, নিজ নিজ পরিকল্পনা গঠন, কমিউনিটি অংশগ্রহণ বাড়ানো।
উপসংহার: ২১ নভেম্বরের কম্পন আমাদের সাঙ্ঘাতিকভাবে একটি সত্য বলেছে: আমরা ঝুঁকি মানি, কিন্তু প্রস্তুত নই। ভবিষ্যতে বড় ভূমিকম্প হতে পারে, এবং তার প্রভাব নগরায়ন, অবকাঠামো, জনসংখ্যা ঘনত্ব এবং প্রশাসনিক অপ্রস্তুতির সঙ্গে গুণিত হবে। তাই সময় এখনই- প্রতিটি কম্পনই একটি ডাক আমরা যদি এখনই জবাব না দিই, ভবিষ্যতের কম্পন শুধুমাত্র কম্পন থাকবে না, তা হয়ে উঠতে পারে এক ভয়ঙ্কর বিপর্যয়।
লেখক: সাংবাদিক, সমাজ গবেষক, মহাসচিব- কলামিস্ট ফোরাম অব বাংলাদেশ