নিজস্ব প্রতিবেদক
০৭ নভেম্বর ২০২৬, ০১:০১ পিএম
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা এবং ন্যায্য অভিযোজন অর্থায়ন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ, ভুটান ও নেপালকে (BBN) ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশের নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
শনিবার (৭ নভেম্বর) রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ আহ্বান জানানো হয়। আগামী ৯ থেকে ২০ নভেম্বর তুরস্কের আনাতোলিয়ায় অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘের ৩১তম জলবায়ু সম্মেলন (কপ-৩১) সামনে রেখে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
সেন্টার ফর পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (সিপিআরডি), ক্লাইমেট জাস্টিস অ্যালায়েন্স-বাংলাদেশ (সিজেএ-বি), উপকূল ও সুন্দরবন সুরক্ষা আন্দোলন, ক্লাইমেট অ্যাকশন ফোরাম, শরীয়তপুর ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি (এসডিএস), সচেতন সংস্থাসহ কয়েকটি নাগরিক ও উন্নয়ন সহযোগী সংগঠন যৌথভাবে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেছে।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, ভৌগোলিক ও আর্থসামাজিক অবস্থানে বাংলাদেশ, ভুটান ও নেপালের মধ্যে পার্থক্য থাকলেও হিমালয় পর্বতমালা, অভিন্ন নদীব্যবস্থা ও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দেশ তিনটি জলবায়ু পরিবর্তনের অভিন্ন ঝুঁকির মুখে রয়েছে। এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় নীতি গ্রহণ, উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে ন্যায্য জলবায়ু অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহায়তা আদায় এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজেদের বিপন্নতার চিত্র তুলে ধরতে সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
তারা আরও বলেন, ক্রমবর্ধমান জলবায়ু ঝুঁকি এ অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা, অবকাঠামো, জলবায়ু-সংবেদনশীল অর্থনৈতিক খাত এবং সরকারি অর্থব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। ফলে জলবায়ু অভিযোজনকে আন্তর্জাতিক আলোচনায় অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য পর্যাপ্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে সভাপতি সিপিআরডির প্রধান নির্বাহী ও সিজেএ-বির সমন্বয়ক মো. শামসুদ্দোহা বলেন, স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ অর্থনৈতিক অগ্রগতির মূল সূচক হলেও তা কোনো দেশের জলবায়ু ঝুঁকি কমিয়ে দেয় না। একইভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়ন হলেই জলবায়ু অভিঘাত মোকাবিলার সক্ষমতা তৈরি হয় না।
তিনি উল্লেখ করেন, ভুটান ইতোমধ্যে এলডিসি থেকে উত্তরণ করেছে। বাংলাদেশ ও নেপালও নিজ নিজ উত্তরণ প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। তবে তিনটি দেশই এখনো উল্লেখযোগ্য জলবায়ু ঝুঁকির মুখে। এ পরিস্থিতিতে কপ-৩১ এবং পরবর্তী সময়ে BBN দেশগুলোর সরকার ও নাগরিক সমাজের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ এবং যৌথ অভিযোজন কার্যক্রম জোরদার করার আহ্বান জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিআরডির প্রোগ্রাম ম্যানেজার-রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি শেখ নূর আতায়া রাব্বি ও সুমাইয়া বিনতে আনোয়ার। তারা বলেন, প্রচলিত উন্নয়ন কাঠামোর বাইরে দীর্ঘমেয়াদি ও ভবিষ্যৎমুখী জলবায়ু ঝুঁকি বিবেচনায় নিতে হবে। এজন্য আন্তর্জাতিক অভিযোজন ও জলবায়ু অর্থায়ন কাঠামোয় আশু মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন।
শরীয়তপুর ডেভেলপমেন্ট সোসাইটির (এসডিএস) নির্বাহী পরিচালক রাবেয়া বেগম বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণকে কোনোভাবেই জলবায়ু ঝুঁকিপ্রবণতা থেকে উত্তরণ হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। উন্নয়ন অগ্রগতিকে আন্তর্জাতিক অভিযোজন সহায়তা প্রত্যাহারের মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার না করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, উন্নত দেশ এবং বহুপাক্ষিক জলবায়ু অর্থায়ন প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আহ্বান জানাই।
ক্লাইমেট অ্যাকশন ফোরামের সমন্বয়ক আমিনুর রসুল বলেন, জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর অভিযোজনের প্রয়োজনীয়তা ও বেঁচে থাকার অধিকার কোনোভাবেই উন্নত দেশগুলোর অর্থনৈতিক স্বার্থের অধীন হতে পারে না।
উপকূল ও সুন্দরবন সুরক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক নিখিল চন্দ্র বলেন, অভিযোজন ও প্রশমনকে জলবায়ু কার্যক্রমের পরিপূরক দুটি স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় অভিযোজনের জন্য পর্যাপ্ত আন্তর্জাতিক সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এটি উন্নত দেশগুলোর ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতার অংশ।
এ সময় মীর মোহাম্মাদ আলী BBN দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক অ্যাডভোকেসি জোরদার, সরকার ও নাগরিক সমাজের সমন্বয় এবং কপ-৩১ ও পরবর্তী সময়ে ন্যায্য অভিযোজন সহায়তা ও জলবায়ু অর্থায়ন নিশ্চিত করতে ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সংবাদ সম্মেলনে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, জলবায়ু ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ, মানবাধিকারকর্মীসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পর্যায়ের অংশীজন উপস্থিত ছিলেন। তারা BBN দেশগুলোর অভিন্ন জলবায়ু চ্যালেঞ্জ, ঝুঁকি ও তা মোকাবিলায় করণীয় বিষয়ে নিজেদের মতামত ও অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
সংবাদ সম্মেলন থেকে তিনটি প্রধান নীতিগত দাবি উত্থাপন করা হয়। প্রথমত, বৈশ্বিক জলবায়ু আলোচনায় অভিযোজনকে অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। জলবায়ু ঝুঁকিপ্রবণতা, ন্যায্যতা ও মানবাধিকারের ভিত্তিতে সহায়তা নির্ধারণের পাশাপাশি BBN অঞ্চলের আন্তঃসীমান্ত ও ক্রমবর্ধমান ঝুঁকিকে যথাযথ স্বীকৃতি দিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, এলডিসি থেকে উত্তরণের পরও জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য সহজ শর্তে অভিযোজন অর্থায়ন অব্যাহত রাখতে হবে। এ অর্থায়ন যাতে সহজে পাওয়া যায়, সেজন্য টেকসই ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি জানানো হয়।
তৃতীয়ত, বাংলাদেশ, ভুটান ও নেপালের মধ্যে অভিন্ন আঞ্চলিক অ্যাডভোকেসি ও আলোচনাভিত্তিক কর্মসূচি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এর মাধ্যমে অভিন্ন জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলা, অভিযোজন কার্যক্রম বাস্তবায়ন এবং জলবায়ু অর্থায়নের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
এম/এফএ