নিজস্ব প্রতিবেদক
০৫ নভেম্বর ২০২৬, ০৬:২৬ পিএম
সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ডিজিটাল সেবার মান ও সক্ষমতা বাড়াতে না পারলে জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) প্রাসঙ্গিকতা হারানোর শঙ্কা প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেছেন, বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ডিজিটাল গভর্ন্যান্সের কারণে নাগরিক সেবার কাঠামোতে আমূল পরিবর্তন আসবে। তাই এখন থেকেই এনআইডির সেবা ও কাজের মান বাড়িয়ে প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান ধরে রাখতে হবে।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত জাতীয় পরিচয়পত্র, ভোটার তালিকা এবং নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় তথ্য প্রযুক্তির প্রয়োগ কমিটির ষষ্ঠ সভায় কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্য এসব কথা বলেন তিনি।
এ সভার কার্যবিবরণী থেকে জানা যায়, সভায় ইসি আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেছেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের কারণে অন্যান্য সব কার্যক্রমকে গৌণ হিসেবে বিবেচনা করায় সেগুলোতে মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ কম ছিল। এ ছাড়া নির্বাচনের সুবাদে তথ্য-প্রযুক্তি সংক্রান্ত কিছু ইস্যু আমাদের সামনে এসেছে।
এ সময় তিনি সবাইকে সতর্ক করে বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ডিজিটাল গভর্ন্যান্সেরের কারণে নাগরিক সেবার আর্কিটেকচারেও আমূল পরিবর্তন ঘটবে; এখন আমরা যদি প্রস্তুত না হই তাহলে আমরা আমাদের স্বার্থ রক্ষা করতে পারব না এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে যাবে। তাই এখন থেকেই সেবা ও কাজের মান দিয়ে এনআইডিকে ধরে রাখতে হবে। অন্যাথায় নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তা/কর্মচারীদের অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষে তখন রাস্তায় নেমে আন্দোলন করে কোনো লাভ হবে না।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের পূর্বে অন্তর্বর্তী সরকারের ই-গভর্ন্যান্স সংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রমের কারণে এনআইডি’র সঙ্গে সম্পৃক্ত সেবাসমূহের সমন্বয়হীনতা ঘটেছে। পক্ষান্তরে নির্বাচনের পর জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা আইন, ২০২৬ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। উক্ত আইনের সঙ্গে সংগতি রেখে আমাদের কার্যক্রমসমূহ পরিচালনা করতে পারছি কি না; তা নিবিড়ভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা প্রয়োজন।
সভায় এনআইডি কার্যক্রমে ১০টি বড় চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত, সমাধানে জোর
জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় করণীয় নির্ধারণ এবং ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা বের করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
এনআইডি সেবা প্রদানে জবাবদিহিতা ও সমন্বয়ের ঘাটতি
নতুন ভোটার হওয়ার আবেদন জমা দেওয়া থেকে শুরু করে জাতীয় পরিচয়পত্র হাতে পাওয়া পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় কার্যকর জবাবদিহিতার অভাব রয়েছে। ফলে অনেকে দীর্ঘদিন পরও কার্ড পান না, আবার অনেকে কার্ড থেকে বঞ্চিত হন। এ কারণে স্মার্ট কার্ড মুদ্রণের পরও মাঠপর্যায়ে অবিতরণকৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে।
এনআইডি সরবরাহ ও ক্রয় প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা
জাতীয় পরিচয়পত্রের সরবরাহব্যবস্থা ও কেনাকাটার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা রয়েছে। বর্তমানে স্মার্ট এনআইডি কার্ডে ব্যবহৃত নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রায় ১০ বছর আগের প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে তৈরি। বর্তমান সময়ের সঙ্গে এসব নিরাপত্তাব্যবস্থার সামঞ্জস্য কতটুকু, তা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। কার্ডে চিপ ব্যবহারের কারণে উৎপাদন ব্যয়ও বেশি হচ্ছে। ভবিষ্যতে চিপের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে কি না, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে। কম খরচে আরও বেশি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হলে প্রচলিত কার্ডব্যবস্থা তুলে দেওয়ার মতো যুগান্তকারী পরিবর্তনের বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে।
দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বিষয়গুলোর নিষ্পত্তি
এনআইডি কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বেশ কিছু বিষয় দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
এনআইডি পার্সোনালাইজেশন সেন্টারের বকেয়া বিল পরিশোধ, বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি (বিএমটিএফ) ও মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন স্থানে সংরক্ষিত ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের (ইভিএম) ভবিষ্যৎ নির্ধারণ, ইভিএম সংরক্ষণের বকেয়া ভাড়া ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় নিষ্পত্তি, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চলমান তদন্তের স্বার্থে সংশ্লিষ্ট ইভিএমগুলো সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা।
ভোটার তালিকার কার্যকারিতা ও শুদ্ধতা নিশ্চিত করা
ভোটার তালিকায় নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্তি এবং মৃত ভোটার বাদ দেওয়ার হারের মধ্যে অসংগতি রয়েছে। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রমে প্রায় ২১ লাখ মৃত ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হলেও তালিকায় এখনো অনেক মৃত ভোটারের নাম রয়ে গেছে। এ কারণে মৃত ভোটার বাদ দেওয়ার কার্যক্রম আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
এক্ষেত্রে হাসপাতাল থেকে রোগীর ছাড়পত্র, কবরস্থানে দাফন, সমাধিস্থ করা কিংবা শেষকৃত্য সম্পন্ন করার মতো কার্যক্রমে মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করে এনআইডি ব্যবস্থায় তা হালনাগাদের সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে। এ ছাড়া ভূমি নিবন্ধন, বিদেশ গমনসহ গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রেও মৃত ব্যক্তির পরিচয়পত্র বাতিলের বিষয়টি বাধ্যতামূলক করা গেলে মৃত ভোটার বাদ দেওয়ার হার বাড়ানো সম্ভব হবে। এজন্য বিভিন্ন সরকারি দফতরের মধ্যে তথ্যের সমন্বয় ও আন্তঃবিভাগীয় সংযোগ গড়ে তোলা প্রয়োজন।
ডিজিটাল তথ্যভান্ডার ও প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতির অভাব
নির্বাচন কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রম সংরক্ষণের জন্য সমন্বিত ডিজিটাল তথ্যভান্ডার, প্ল্যাটফর্ম কিংবা ডিজিটাল ডায়েরি নেই। একই সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতি সংরক্ষণের ঘাটতি রয়েছে। ফলে অতীতের সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রমের তথ্য না পাওয়ায় নতুন সিদ্ধান্ত গ্রহণে সমস্যা হচ্ছে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচন সংক্রান্ত প্রতিবেদন সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকা
জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি), ভারতের রেজিস্ট্রার অব নিউজপেপারসসহ (আরএনআই) বিভিন্ন দেশি-বিদেশি সংস্থার প্রকাশিত প্রতিবেদন সংগ্রহ ও সংরক্ষণের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। এসব প্রতিবেদন সংরক্ষণের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগে দক্ষতা ও জ্ঞানের সমন্বয়ের ঘাটতি
এনআইডি উইংয়ের তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামোকে সময়োপযোগী ও কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাস দরকার। এক্ষেত্রে বাইরের বিশেষজ্ঞ সহায়তা ও প্রয়োজনীয় দক্ষতার সমন্বয়ে নতুন জ্ঞানভিত্তিক কর্মপরিবেশ গড়ে তোলার ঘাটতি রয়েছে।
রোহিঙ্গা ইস্যুতে কার্যক্রম পুনরায় জোরদার করা
জাতীয় নিরাপত্তা ও ভোটার তালিকার শুদ্ধতার স্বার্থে রোহিঙ্গা ইস্যুতে আগে কিছু কার্যক্রম নেওয়া হলেও বর্তমানে বিষয়টি অনেকটা অমীমাংসিত অবস্থায় রয়েছে। এ বিষয়ে পুনরায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট আধুনিকায়ন
নির্বাচন কমিশনের বিদ্যমান ওয়েবসাইটে প্রয়োজনীয় অনেক তথ্য নেই। এ ছাড়া ওয়েবসাইটটির কাঠামো ও তথ্য বিন্যাসও যৌক্তিক ও ব্যবহারবান্ধব নয়। প্রয়োজনীয় সব তথ্য সংযোজন করে ওয়েবসাইটটিকে পূর্ণাঙ্গ, সুসংগঠিত ও সহজে ব্যবহারযোগ্য করে গড়ে তোলা প্রয়োজন।
এনআইডি উইংয়ের সাংগঠনিক কাঠামোর পুনর্বিন্যাস
এনআইডির উৎপত্তি হয়েছে ভোটার তালিকার কার্যক্রমের অংশ হিসেবে। তাই জাতীয় পরিচয়পত্রের কার্যক্রমের সঙ্গে ভোটার তালিকার বিষয়টিকে আরও কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। এজন্য এনআইডি উইংয়ের বিদ্যমান সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্বিবেচনা ও প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
সবশেষ ভোটার তালিকা অনুযায়ী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দেশে ভোটার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২ কোটি ৮৭ লাখ ৭৭ হাজার ৬৪৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৬ কোটি ৫৫ লাখ ১০ হাজার ৬৬৫, নারী ৬ কোটি ৩২ লাখ ৬৫ হাজার ৭১১ এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ১ হাজার ২৬৭ জন।
এমএইচএইচ/এফএ