নিজস্ব প্রতিবেদক
০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০৪:৫৫ পিএম
আগামী গ্রীষ্ম মৌসুম শুরুর আগেই জাতীয় গ্রিডে তিন থেকে চার হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন ও সম্প্রসারণে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ এগোলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই এ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে দুই দিনব্যাপী ‘বাংলাদেশ সোলার এক্সপো-২০২৬’-এর উদ্বোধনকালে তিনি এ কথা বলেন। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল) যৌথভাবে এ প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে। এবারের প্রতিপাদ্য ‘প্রতি ইঞ্চি ছাদ কাজে লাগাই, সৌরবিদ্যুতের আয় বাড়াই’।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন ও সম্প্রসারণ সহজ করতে সরকার ‘বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন অধ্যাদেশ ২০২৬’ প্রণয়ন করেছে। এ খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে নীতিগত সহায়তা, কর ও শুল্ক সুবিধা এবং আর্থিক প্রণোদনার ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে আগামী গ্রীষ্মের আগেই জাতীয় গ্রিডে ৩ থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত করা সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, সরকারি-বেসরকারি অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, শিল্পকারখানা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও বাসাবাড়ির অব্যবহৃত ছাদ সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে কাজে লাগাতে চায় সরকার। নেট মিটারিং ব্যবস্থায় নিজস্ব ব্যবহারের পর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করলে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা দরে তা কেনা হবে। এক্ষেত্রে বিশেষ প্রণোদনাও দেওয়া হবে।
দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, এই লক্ষ্য অর্জনে সরকার, উদ্যোক্তা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী ও সাধারণ মানুষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
সৌরবিদ্যুৎ খাতে অর্থায়ন সহজ করতে প্রাথমিকভাবে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার তহবিল বরাদ্দের কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পর্যায়ক্রমে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করা হবে। পাশাপাশি সোলার প্যানেল, ইনভার্টার ও ব্যাটারির মতো যন্ত্রপাতির দাম কমাতে আমদানি ও দেশীয় উৎপাদনের ক্ষেত্রে কর ও শুল্ক ছাড় দেওয়া হয়েছে।
কুইক রেন্টালের পরিবর্তে সাশ্রয়ী উপায়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই এক্সপোতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের উদ্যোক্তা ও সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ প্রমাণ করে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন আর শুধু সম্ভাবনার খাত নয়, বরং অনিবার্য বাস্তবতা। অতীতে দেশকে আমদানিনির্ভর করে তোলার ফলে বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট তৈরি হয়।
তিনি জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে সরকার ইতোমধ্যে প্রায় ৪৩ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে। চলতি অর্থবছরেও সমপরিমাণ ভর্তুকির প্রয়োজন রয়েছে। এ ছাড়া জ্বালানি তেল কিনে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য আলাদাভাবে ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ডিজেলের মজুত বাড়ানো, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন নিশ্চিত করা এবং বিকল্প সরবরাহকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
বিদ্যুৎ সংকট সমাধানকে সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, অতীতের সরকারগুলোর ব্যর্থতা নিয়ে আলোচনা করে সময় নষ্ট না করে কীভাবে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়, সেদিকে নজর দেওয়া হচ্ছে। বিদ্যুৎ খাতের চুক্তি পর্যালোচনা, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার, জ্বালানির উৎসে বৈচিত্র্য আনা এবং সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াতে সরকার একযোগে কাজ করছে।
নিজের বাসায় সৌর প্যানেল স্থাপনের কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতিদিন আমার ব্যবহারের পর অতিরিক্ত কিছু বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে। বাসাবাড়ি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপনের আহ্বান জানাই। একই সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের পর সঠিক সেবা ও রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আহ্বান জানাই। বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলোকে উদ্যোক্তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে হবে।
কৃষি খাতে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পর্যায়ক্রমে সব সেচ পাম্প সৌরবিদ্যুতে রূপান্তরের কাজ শুরু হয়েছে। বরেন্দ্র অঞ্চলে ইতোমধ্যে এ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আগামী এক বছরের মধ্যে ১৭ হাজার সেচ পাম্প সৌরবিদ্যুতের আওতায় আনা হবে।
এ ছাড়া দিনের বেলায় প্রাকৃতিক আলো ব্যবহার, অপ্রয়োজনে বৈদ্যুতিক পাখা, বাতি ও বৈদ্যুতিক যন্ত্র বন্ধ রেখে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। উন্নয়ন সহযোগীদের পাশাপাশি স্থানীয় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের সৌরবিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগেরও আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ বিভিন্ন বিষয়ে উদ্ভাবনী ধারণা উপস্থাপন প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, এ প্রতিযোগিতায় অন্তত ৩০০ তরুণ-তরুণী তাদের উদ্ভাবনী ধারণা জমা দিয়েছেন। তরুণদের উদ্ভাবনী উদ্যোগ এগিয়ে নিতে চলতি বাজেটে নতুন উদ্যোগের জন্য ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
এমআর/এফএ