Dhaka Mail Logo

জাতীয়

এনআইডি সংশোধনে বাধ্যতামূলক হচ্ছে আবেদনকারীর নিজস্ব মোবাইল নম্বর

মো. মেহেদী হাসান হাসিব

০২ নভেম্বর ২০২৬, ০৯:০৫ পিএম

জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সংশোধনের আবেদনে জালিয়াতি ঠেকাতে নতুন উদ্যোগ নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এখন থেকে নিজের নামে নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর ছাড়া এনআইডি সংশোধনের আবেদন করা যাবে না। এ ব্যবস্থা চালু করতে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) সঙ্গে আলোচনা করছে সংস্থাটি।

গত ২৫ আগস্ট ঢাকা মেইলে বড় প্রশ্নের মুখে ইসির তথ্যভান্ডারের নিরাপত্তা শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদনে উঠে আসে, ২০২০ সালে মারা যাওয়া এক ব্যক্তি ২০২৬ সালে এসে নিজের জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধনের আবেদন করেছেন। ফেস ভেরিফিকেশন বা মুখমণ্ডল শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেই ওই আবেদন করা হয়েছিল। বিষয়টি ইসির তথ্যভান্ডারের নিরাপত্তা ও আবেদন যাচাইয়ের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।

ওই সময় আলী আকবর নামের এক ব্যক্তির এনআইডি সংশোধনের আবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, তিনি নিজের নাম সংশোধনের আবেদন করেছেন। আবেদনের সঙ্গে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র হিসেবে জমা দিয়েছেন মৃত্যু সনদ, নিজের নামে ওয়ারিশ সনদ, সন্তানের এনআইডি, শিক্ষা সনদের রেজিস্ট্রেশন কার্ড ও পাসপোর্ট। তবে মৃত্যু সনদে দেখা যায়, তিনি ২০২০ সালের ৫ মার্চ মারা গেছেন। অর্থাৎ মৃত্যুর ছয় বছর পর ২০২৬ সালে কীভাবে তিনি মুখমণ্ডল শনাক্তকরণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গিয়ে নিজের এনআইডি সংশোধনের আবেদন করলেন, সেই প্রশ্ন সামনে আসে।

এ ঘটনায় ইসির কারিগরি দুর্বলতার চিত্র উঠে আসে। এতে যেকোনো নাগরিকের এনআইডি সংশোধনের আবেদন অন্য কেউ করতে পারেন বলে আশঙ্কা তৈরি হয়, যা নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তার জন্য হুমকি। এ ছাড়া এনআইডি সংশোধনের আবেদনে ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগ করেও সংযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়নি।

ইসি সূত্র জানায়, ফেস ভেরিফিকেশন বা মুখমণ্ডল শনাক্তকরণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে একজন নাগরিক তার এনআইডি সংশোধনের আবেদন করতে পারেন। কিন্তু প্রযুক্তির এ যুগে প্রতারক চক্র প্রযুক্তির অপব্যবহার করে ব্যক্তির উপস্থিতি ছাড়াই সংশোধনের আবেদন করে দিচ্ছে। সম্প্রতি ঢাকা মেইলে মৃত ব্যক্তির এনআইডি সংশোধনের আবেদনসংক্রান্ত সংবাদ ইসির নজরে এলে বিষয়টি সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ জন্য সিদ্ধান্ত হয়েছে, কোনো ব্যক্তির নিজের নামে মোবাইল নম্বর নিবন্ধিত না থাকলে তিনি এনআইডি সংশোধনের আবেদন করতে পারবেন না। এ বিষয়ে বিটিআরসির সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে, যাতে অ্যাপ্লিকেশন প্রোগ্রামিং ইন্টারফেসের (এপিআই) মাধ্যমে মোবাইল নম্বরগুলো যাচাই করা যায়।

বর্তমানে একটি মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে কতটি আবেদন করা যায়, জানতে চাইলে ইসি সূত্র জানায়, একটি মোবাইল নম্বর দিয়ে বর্তমানে আটটি এনআইডি সংশোধনের আবেদন করা যায়। নিজের নামে নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে আবেদন করার ব্যবস্থা চালু হলে যার এনআইডি, তার নামে নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর ছাড়া আবেদন করা যাবে না। অর্থাৎ একটি নম্বর দিয়ে একজনেরই এনআইডি সংশোধনের আবেদন করা যাবে। আর যারা দেশের বাইরে থেকে এনআইডি সংশোধনসংক্রান্ত সেবা নিতে চান, তাদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা করা যায় কি না, তা-ও ভাবছে ইসি।

image

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইসির এনআইডি অনুবিভাগের সিস্টেম ম্যানেজার মুহাম্মদ আশরাফ হোসেন সোমবার (২ নভেম্বর) ঢাকা মেইলকে বলেন, বিটিআরসির সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা চলছে। আলোচনা শেষ হলেই এনআইডি সংশোধনের আবেদনের ক্ষেত্রে নিজের নামে নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর দিয়ে আবেদন করার পদ্ধতি চালু করে দেওয়া হবে।

এদিকে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নিবন্ধন ও সংশোধন প্রক্রিয়া আরও গতিশীল করতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র স্বয়ংক্রিয়ভাবে যাচাইয়ের ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে ইসি। এ জন্য তথ্য আদান-প্রদানে বিটিআরসিসহ নয়টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এপিআই সংযোগ স্থাপনের বিষয়ে আলোচনা চলছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৈঠকও করেছে কমিশন।

প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি), জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি), ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদফতর, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন শাখা এবং আইন মন্ত্রণালয়ের অধীন নিবন্ধন অধিদফতরের বিবাহ ও তালাক নিবন্ধন বিভাগ।

দেশের সাধারণ নাগরিকদের ভোটার হতে কিংবা জাতীয় পরিচয়পত্র পেতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র হলো—জন্মনিবন্ধন সনদ, এসএসসি বা সমমানের পরীক্ষায় পাসের সনদ (যদি থাকে), ঠিকানা প্রমাণের জন্য ইউটিলিটি বিলের কপি, নাগরিক সনদ, বাবা-মায়ের এবং বিবাহিত হলে স্বামী বা স্ত্রীর এনআইডির ফটোকপি, পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স ও টিআইএন নম্বর (যদি থাকে)।

প্রবাসী নাগরিকরা ভোটার হতে চাইলে প্রয়োজন হবে—অনলাইনে পূরণ করা আবেদনপত্র (ফরম-২(ক)), মেয়াদযুক্ত বা মেয়াদহীন বাংলাদেশি পাসপোর্ট, এনআইডিধারী তিন নাগরিকের প্রত্যয়ন, অনলাইন জন্মনিবন্ধন এবং পাসপোর্ট সাইজের রঙিন ছবি। এসব কাগজ সংশ্লিষ্ট নিবন্ধন কেন্দ্রে (দূতাবাসের ডেস্কে) জমা দিতে হবে।

এ ছাড়া বিশেষ ৫৬টি উপজেলা বা থানার (চট্টগ্রাম অঞ্চল) নাগরিকদের জন্য বিশেষ তথ্য ফরম, শিক্ষা সনদ, পিতা-মাতার এনআইডি, মৃত্যু সনদ (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে), ড্রাইভিং লাইসেন্স বা টিআইএন, দ্বৈত নাগরিকত্ব সনদ, নিকাহনামা, স্বামী-স্ত্রীর এনআইডি, নাগরিকত্ব সনদ, ইউটিলিটি বিলের কপি, ভাড়াটিয়া হলে বাড়িভাড়ার চুক্তিপত্র ও বাড়িওয়ালার অনাপত্তিপত্র জমা দিতে হবে।

বাধ্যতামূলক নয়, এমন তথ্য নিবন্ধন কেন্দ্রে জমা দিতে না পারলে প্রবাসীরা দেশে থাকা আত্মীয়ের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট উপজেলা কর্মকর্তার কাছে তা জমা দিতে পারবেন। সংশ্লিষ্ট দেশে বসে ফরম পূরণ ও তথ্য যাচাই শেষে নির্বাচন কমিশন তদন্ত করে আবেদন অনুমোদন করবে এবং এনআইডি সংশ্লিষ্ট দূতাবাসে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।

ভোটার তালিকা আইনের ১৮ ধারা অনুযায়ী, মিথ্যা তথ্য দেওয়া বা তথ্য গোপন করে কেউ জাতীয় পরিচয়পত্র গ্রহণ করলে তিনি ভোটার তালিকা আইনের অধীনে অপরাধী হবেন। এ ধরনের অপরাধের জন্য এক বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ২০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন।

এনআইডি সংশোধনের জন্য স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) অনুযায়ী, ক, ক-১, খ, খ-১, গ ও ঘ—এই ছয় ক্যাটাগরিতে আবেদন নিষ্পত্তি করে থাকে ইসি। এ ক্ষেত্রে আবেদনের জটিলতা অনুযায়ী ক থেকে ঘ পর্যন্ত ক্যাটাগরি নির্ধারিত হয়। আবেদন জমা পড়ার পর অতিরিক্ত আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তারা ক্যাটাগরি নির্ধারণ করে থাকেন।

সবশেষ ভোটার তালিকা অনুযায়ী, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দেশে ভোটার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২ কোটি ৮৭ লাখ ৭৭ হাজার ৬৪৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৬ কোটি ৫৫ লাখ ১০ হাজার ৬৬৫, নারী ৬ কোটি ৩২ লাখ ৬৫ হাজার ৭১১ এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ১ হাজার ২৬৭ জন।

এমএইচএইচ/এআর