জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) তথ্য সংশোধনে নাগরিকদের ভোগান্তি কমানো এবং জটিল আবেদন নিষ্পত্তির উপায় খোঁজার উদ্যোগ নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এ লক্ষ্যে দেশের ১০টি প্রশাসনিক অঞ্চলের প্রতিটি থেকে ১০০টি করে মোট ১ হাজার সংশোধন আবেদন পর্যালোচনা করে আগামী ১৯ নভেম্বর একটি কর্মশালার আয়োজনের পরিকল্পনা করেছে সংস্থাটি। এতে শিক্ষক, সমাজকর্মী, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিসহ সরকারের উচ্চ পর্যায়ে ব্যক্তিবর্গ এবং সাংবাদিকরা থাকবেন।
ইসির এনআইডি অনুবিভাগের সূত্র জানায়, কর্মশালার মূল উদ্দেশ্য হলো জটিল সংশোধন আবেদন নিষ্পত্তির উপায় খুঁজে বের করা। অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবতা ও মানবিক দিক বিবেচনায় কোনো আবেদন সংশোধনযোগ্য মনে হলেও বিদ্যমান আইনি বিধিবিধানের কারণে তা অনুমোদন করা সম্ভব হয় না। বিশেষ করে প্রবাসীদের এনআইডি সংশোধনের ক্ষেত্রে এ ধরনের জটিলতা বেশি দেখা যাচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে জাতীয় সংসদেও আলোচনা হয়েছে। তবে আইনে মানবিক বিবেচনা কিংবা রেমিট্যান্স যোদ্ধা হিসেবে প্রবাসীদের অবদানের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ার সুযোগ নেই। ফলে ইচ্ছা থাকলেও এসব আবেদন অনুমোদন করতে পারছে না ইসি। এ অবস্থায় এমন সব জটিল ও প্রবাসীদের এনআইডি সংশোধন বিষয়টি কীভাবে সমাধান করা যায় সে বিষয়ে সকলের মতামত ও পরামর্শ নেওয়ার জন্য এই কর্মশালা করবে সংস্থাটি।
জানতে চাইলে জাতীয়পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক এ এইচ এম আনোয়ার পাশা ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আমরা একটি কর্মশালার আয়োজন করব। তবে সিদ্ধান্ত এখনো চূড়ান্ত হয়নি।’
এনআইডি সংশোধনে ভোগান্তি
নির্বাচন ভবনে এনআইডি সংশোধনসংক্রান্ত সেবা নিতে আসা কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের বেশিরভাগই পাসপোর্টের সঙ্গে মিল রেখে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য সংশোধন করতে চান। তারা জানান এনআইডি সংশোধন না হওয়া তারা ই-পাসপোর্ট করতে পারছেন না। এজন্য তাদের বিদেশে যাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। কর্মকর্তা আশ্বাস দিলেও কবে তার নিশ্চয়তা পাচ্ছেন না। আবেদন জমা দেওয়ার সময় কেন জরুরি তা আবেদনের ওপর লিখে দিচ্ছেন তারা।
এমন একজন সেবা গ্রহীতা আব্দুস সাত্তার পাটোয়ারী। ফরিদপুর থেকে সংশোধনের জন্য এসেছেন। দীর্ঘ ১০ বছর সৌদি আরবে কাজ করেন তিনি। ঢাকা মেইলকে সাত্তার পাটোয়ারী বলেন, ‘চলতি মাসের ২৯ তারিখে আমার ছুটি শেষ হয়ে যাবে। এদিকে ই-পাসপোর্ট করার জন্য এনআইডি সংশোধনের আবেদন করেছি গতমাসের শেষের দিকে। এখন এখানে এসেছি। কর্মকর্তা ফাইল দেখে বললেন আবেদন কপিতে জরুরি ও প্রবাসী লিখে জমা দিয়ে চলে যেতে। তাই করলাম। এখন হবে কি হবে তা জানি না। তবে কর্মকর্তা বলেছেন হয়ে যাবে।’
কুমিল্লার বাসিন্দা রকিব বেপারি বলেন, ‘আমার ভাই লিবিয়া দিয়ে ইতালি গিয়েছিল। যাওয়ার আগে এনআইডিতে ভুলবশত বাবা-মায়ের ডাক নাম ব্যবহার করে ভোটার হয়েছিল। আর ওখানে গিয়ে বাবা-মায়ের এনআইডি অনুযায়ী সব কাগজপত্র করে। এখন এনআইডি’র সঙ্গে বাবা-মায়ের নামের মিল না থাকায় নতুন করে পাসপোর্ট করতে পারছেন না। এজন্য সংশোধনের জন্য এসেছেন।’
এনআইডি সংশোধন সেবার ভোগান্তি কমাতে ইসির কর্মশালার উদ্যোগকে কীভাবে দেখছেন-জানতে চাইলে রকিব বেপারি বলেন, ‘কর্মশালা করে যদি ভোগান্তি কমানো যায়, তাহলে ভালোই হবে। আর ভালো কিছু না হলে এসব কর্মশালা করে কোনো লাভ নাই।’
ঝুলে আছে ১ লাখ ২৮ হাজার আবেদন
ইসির এনআইডি অনুবিভাগের কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধনের জন্য প্রায় ৬৫ লাখ ৭১ হাজার আবেদন জমা পড়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৬৪ লাখ ৪৩ হাজার আবেদন নিষ্পত্তি হয়েছে। বর্তমানে পেন্ডিং রয়েছে প্রায় ১ লাখ ২৮ হাজার আবেদন। এসব পেন্ডিং আবেদনের মধ্যে প্রায় ৭০ হাজার রয়েছে ‘ঘ’ ক্যাটাগরিতে। এসব আবেদন নিষ্পত্তি করেন এনআইডি অনুবিভাগের মহাপরিচালক। বাকি প্রায় ৫৮ হাজার আবেদন রয়েছে অন্য ছয়টি ক্যাটাগরিতে, যেগুলো মাঠপর্যায়ে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।
এনআইডি সংশোধনের জন্য স্ট্যান্ডার্ড অপারেশন প্রসিডিউর (এসওপি) অনুযায়ী, ক, ক-১, খ, খ-১, গ ও ঘ; এই ছয় ক্যাটাগরিতে আবেদন নিষ্পত্তি করে থাকে ইসি। এক্ষেত্রে আবেদনের জটিলতা অনুযায়ী ক থেকে ঘ পর্যন্ত ক্যাটাগরি নির্ধারিত হয়। আবেদন জমা পড়ার পর অতিরিক্ত আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তারা ক্যাটাগরি নির্ধারণ করে থাকেন।
সবশেষ ভোটার তালিকা অনুযায়ী, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দেশে ভোটার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২ কোটি ৮৭ লাখ ৭৭ হাজার ৬৪৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৬ কোটি ৫৫ লাখ ১০ হাজার ৬৬৫, নারী ৬ কোটি ৩২ লাখ ৬৫ হাজার ৭১১ এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ১ হাজার ২৬৭ জন।
এমএইচএইচ/এমআর




