নিজস্ব প্রতিবেদক
৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১০:০৮ পিএম
তুরাগ নদ থেকে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মরদেহ উদ্ধারের পরও কাটছে না মৃত্যুরহস্য। বরং তদন্ত যত এগোচ্ছে, সামনে আসছে নতুন নতুন প্রশ্ন। নিখোঁজ হওয়ার আগে শেষবার যার সঙ্গে তাকে দেখা গিয়েছিল, সেই বন্ধুস্থানীয় ছোট ভাই শাহরিয়ার রেজা দ্বীপের বক্তব্য, পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার হওয়া নম্বরপ্লেটবিহীন মোটরসাইকেল, বাসার সিসিটিভি ফুটেজ এবং পুলিশের পোশাকধারী ব্যক্তিদের ধাওয়ার দাবি এসব নিয়ে রহস্য আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
সেদিন রাতে তাহসিফের সঙ্গে ঠিক কী ঘটেছিল, কোথায় কীভাবে তাদের পথ আলাদা হলো এবং কীভাবে শেষ পর্যন্ত তার মৃত্যু হলো-এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বিশেষ করে দ্বীপের বক্তব্যে পুলিশের পোশাক পরা দুই ব্যক্তির ধাওয়ার বিষয়টি তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তবে ওই ব্যক্তিরা কারা, তারা আদৌ পুলিশ সদস্য ছিলেন কি না কিংবা তাহসিফের মৃত্যুর সঙ্গে তাদের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না-এসবের কোনোটিই এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় রাজধানীর উত্তরার বাসা থেকে বের হন বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা তাহসিফ সাউরি। পরিবারকে তিনি জানিয়েছিলেন, দ্বীপ এসেছেন, তার সঙ্গে দেখা করে আসবেন। বাসার সিসিটিভি ফুটেজেও দেখা যায়, সন্ধ্যা ৬টা ২৪ মিনিটের দিকে দ্বীপ একটি মোটরসাইকেল নিয়ে তাদের বাসার গ্যারেজে আসেন। সাত মিনিট পর, সন্ধ্যা ৬টা ৩১ মিনিটে দুজনকে পৃথক মোটরসাইকেল নিয়ে বেরিয়ে যেতে দেখা যায়।
এরপর আর বাসায় ফেরেননি তাহসিফ। পরদিন ২৮ অক্টোবর বিকেলে রাজধানীর উত্তরখান এলাকার রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে টঙ্গী নৌপুলিশ। মরদেহের সঙ্গে পাওয়া মোবাইল ফোনের মাধ্যমে তার পরিচয় শনাক্ত করা হয়। পরে পরিবারের সদস্যরা মরদেহ গ্রহণ করেন এবং জানাজা শেষে উত্তরার ১২ নম্বর সেক্টরের কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
তাহসিফের নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই তাঁর সঙ্গে সর্বশেষ থাকা দ্বীপের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছিল। বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের বি ব্লকের একটি বাসা থেকে তাকে হেফাজতে নেয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেফতার নয়, বরং ঘটনার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানতেই তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নেওয়া হয়েছে।
জিজ্ঞাসাবাদে দ্বীপ জানিয়েছেন, তারা টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় গিয়েছিলেন। তবে সেখানে যাওয়ার উদ্দেশ্য কী ছিল, সে বিষয়ে তার বক্তব্য এখনো তদন্তকারীদের কাছে পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। পিবিআইয়ের ইন্সপেক্টর সৈয়দ সাজেদ রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, দ্বীপ জানিয়েছেন, তাকে ওই এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। কেন তারা সেখানে গিয়েছিলেন, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
পিবিআইয়ের ঢাকা মেট্রো (উত্তর) অতিরিক্ত ডিআইজি এনায়েত হোসেন মান্নান জানিয়েছেন, দ্বীপের দেওয়া তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। তার বক্তব্যের সঙ্গে অন্যান্য আলামত ও তথ্যের মিল রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
তদন্তে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে দ্বীপের দেওয়া আরেকটি তথ্য থেকে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, রাতের কোনো একপর্যায়ে পুলিশের পোশাকধারী দুই ব্যক্তি তাদের ধাওয়া করেছিলেন। তাদের দেখে তারা দৌড় দেন। এ সময় তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দেন বলে দ্বীপ দাবি করেছেন।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) বিকেলে পিবিআই কর্মকর্তা এনায়েত হোসেন মান্নান বিষয়টি গণমাধ্যমকে জানান। তিনি বলেন, দ্বীপের ভাষ্য অনুযায়ী, পুলিশের পোশাকধারী দুই ব্যক্তি তাদের ধাওয়া করেছিলেন। তবে তারা কারা, আদৌ পুলিশ সদস্য ছিলেন কি না, কিংবা কোনো দায়িত্ব পালন করছিলেন কি না-এসব বিষয় যাচাই করা হবে।
আরও পড়ুন
‘কিছু লোকের ধাওয়ায় তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দেয়, আমি পালিয়ে আসি’
ছেলে সাঁতার জানত, ঘটনা ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা চলছে: তাহসিফের বাবা
তদন্তকারীরা বলছেন, রাতের বেলা তাহসিফ ও দ্বীপ কেন ওই এলাকায় গিয়েছিলেন, সেখানে তাদের সঙ্গে কী ঘটেছিল এবং নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার দাবির সত্যতা কতটুকু-এসব বিষয় গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। দ্বীপের বক্তব্যের সঙ্গে ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি, সিসিটিভি ফুটেজ ও অন্যান্য তথ্য মিলিয়ে দেখা হবে।
তাহসিফ নিখোঁজ হওয়ার পর তাঁর ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটিরও কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। বৃহস্পতিবার রাতে দ্বীপকে হেফাজতে নেওয়ার পর তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালায় পিবিআই। পরে টঙ্গী পশ্চিম থানার মাজার বস্তি এলাকা থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় নম্বরপ্লেটবিহীন একটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়।
পিবিআইয়ের ইন্সপেক্টর সৈয়দ সাজেদ রহমান জানান, দ্বীপের দেওয়া তথ্য অনুসারেই মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা হয়েছে। পিবিআইয়ের পক্ষ থেকে এটিকে তাহসিফের ব্যবহৃত মোটরসাইকেল বলে শনাক্ত করার কথাও জানানো হয়েছে।
এদিকে তাহসিফ বাসা থেকে বের হওয়ার পর তার মৃত্যুর আগপর্যন্ত কী ঘটেছিল, তা জানতে শেষ সাড়ে পাঁচ ঘণ্টার গতিবিধি অনুসন্ধান করছে পুলিশ। এ জন্য তাহসিফ ও দ্বীপের মুঠোফোনের কল রেকর্ড, অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন
বিমান বাহিনীর নিহত সাবেক কর্মকর্তা কে এই তাহসিফ সাউরি
তাহসিফ সাউরির মরদেহ উদ্ধার: প্রাণসংশয়ের ব্যাপারে জানতো পরিবার
পুলিশের কাছে থাকা তথ্য অনুযায়ী, ২৭ অক্টোবর রাত ১টা ৩৫ মিনিটের দিকে তাহসিফ তাঁর মাকে একটি ভয়েস বার্তা পাঠিয়ে জানিয়েছিলেন, তিনি বাসায় ফিরছেন। কিন্তু এরপর আর তাঁর সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ হয়নি। ওই বার্তার সময়, অবস্থান এবং এর পরবর্তী সময়ে তাঁর মুঠোফোনের কার্যক্রম তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম জানিয়েছেন, ছেলের বাসায় ফিরতে দেরি হওয়ায় পরিবারের সদস্যরা একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। কিন্তু তাকে পাওয়া যায়নি। পরে মায়ের মুঠোফোনে পাঠানো ভয়েস বার্তায় তাকে বাসায় ফেরার কথা বলতে শোনা যায়। তবে বার্তাটি শুনে তাঁর ছেলেকে ব্যস্ত মনে হয়েছিল বলে জানান বাবা।
তদন্তকারীরা দ্বীপের বক্তব্যের সঙ্গে এই ভয়েস বার্তা, কল রেকর্ড, লোকেশন ডেটা এবং সিসিটিভি ফুটেজ মিলিয়ে দেখছেন। কখন দুজন আলাদা হয়েছিলেন, তাহসিফ কীভাবে নদীর কাছে গেলেন এবং দ্বীপ কেন দ্রুত পরিবার বা পুলিশকে বিষয়টি জানাননি-এসব প্রশ্নের উত্তরও খুঁজছেন তারা।
মরদেহ উদ্ধারের পর শুক্রবার পর্যন্ত এ ঘটনায় কোনো মামলা দায়েরের খবর পাওয়া যায়নি। পিবিআই জানিয়েছে, নৌপুলিশ মরদেহ উদ্ধার করায় তাদের তত্ত্বাবধানেই মামলার কার্যক্রম পরিচালিত হবে। অন্য সংস্থাগুলো তদন্তে সহযোগিতা করছে।
পিবিআইয়ের ঢাকা মেট্রো (উত্তর) পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, নিহতের পরিবার শোকের মধ্যে থাকায় মামলা দায়েরের বিষয়ে তাদের কিছুটা সময় দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হচ্ছে।
জেবি