আব্দুল হাকিম
৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০৫ পিএম
- ৩১টি সড়ক রুট সংস্কারের পরিকল্পনা
- পুরোনো বাস সড়ক থেকে সরানোর উদ্যোগ
- ১২০টি ট্রাফিক সিগন্যাল স্বয়ংক্রিয় করবে
- নতুন ৩০টি ফুটওভারব্রিজ নির্মাণ
- সিটি বাসে জিপিএসভিত্তিক নজরদারি করা হবে
- মানসম্মত বাসসেবা নিশ্চিত করার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের
রাজধানী ঢাকার যানজট নিরসনে একাধিক উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। গণপরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, ট্রাফিক সিগন্যাল স্বয়ংক্রিয় করা, বাস রুট পুনর্বিন্যাস, পুরোনো বাস অপসারণ, বাস টার্মিনাল স্থানান্তর এবং নতুন সড়ক অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মেট্রোরেল, উড়ালসড়ক ও দ্রুতগতির গণপরিবহন ব্যবস্থার মাধ্যমে সড়কের ওপর চাপ কমানোর উদ্যোগও রয়েছে। তবে এসব উদ্যোগের কিছু ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে, কিছু চলমান এবং কয়েকটি এখনো পরিকল্পনা বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে রয়েছে।
চলতি বছরের ২৪ মার্চ রাজধানীর যানজট কমানো ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়নে বিশেষ সভা করে সরকার। প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সভায় রাজধানীর ১২০টি ট্রাফিক সিগন্যাল পর্যায়ক্রমে স্বয়ংক্রিয় করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পাশাপাশি নতুন বাইপাস সড়ক নির্মাণ, উড়ালসড়ক ও আন্ডারপাস তৈরি, আন্তজেলা বাস টার্মিনাল স্থানান্তর, শহরের ভেতরে অবৈধ বাস কাউন্টার উচ্ছেদ এবং নগরবাসীর যাতায়াত ব্যবস্থায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়।

ট্রাফিক সিগন্যাল স্বয়ংক্রিয় করার উদ্যোগ
ঢাকার যানজটের অন্যতম কারণ বিভিন্ন মোড়ে যানবাহনের চাপ অনুযায়ী চলাচল নিয়ন্ত্রণে সীমাবদ্ধতা। এ সমস্যা মোকাবিলায় ১২০টি ট্রাফিক সিগন্যাল স্বয়ংক্রিয় করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে যানবাহনের চাপ অনুযায়ী সিগন্যালের সময় নিয়ন্ত্রণ এবং মোড়গুলোতে যান চলাচল ব্যবস্থাপনা উন্নত করার লক্ষ্য রয়েছে।
একই সঙ্গে স্থানীয় প্রযুক্তি ব্যবহার করে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আধুনিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে ১২০টি সিগন্যালের কতটি ইতোমধ্যে স্বয়ংক্রিয় হয়েছে এবং কতটি স্থাপনের কাজ বাকি রয়েছে, সে বিষয়ে হালনাগাদ বাস্তবায়ন তথ্য ছাড়া উদ্যোগটির অগ্রগতি নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না।
এদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ২৮টি স্থানে সংকেতবাতি স্থাপনে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৫৫ কোটি টাকা। অন্যদিকে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ২২টি স্থানে ব্যয় হবে প্রায় ৪৪ কোটি টাকা। দুই সিটি করপোরেশনের জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ৫০ কোটি টাকা করে মোট ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

মেট্রোরেল সম্প্রসারণ
রাজধানীর যানজট কমাতে বড় অবকাঠামোগত উদ্যোগগুলোর মধ্যে রয়েছে মেট্রোরেল। এমআরটি লাইন-৬-এর মাধ্যমে উত্তরা থেকে আগারগাঁও হয়ে মতিঝিল পর্যন্ত যাত্রী পরিবহন করা হচ্ছে। সড়কের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দ্রুত ও নির্ধারিত সময়ে যাত্রী পরিবহনের সুযোগ তৈরি করেছে এই ব্যবস্থা।
মেট্রোরেল সম্প্রসারণ ও অন্যান্য গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন রাজধানীর দীর্ঘমেয়াদি পরিবহন পরিকল্পনার অংশ। তবে যানজট কমাতে শুধু মেট্রোরেল নির্মাণ যথেষ্ট নয়। স্টেশন থেকে কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসিক এলাকায় যাতায়াতের জন্য সংযোগকারী বাস, পথচারীবান্ধব ফুটপাত এবং অন্যান্য পরিবহনের সঙ্গে সমন্বয় প্রয়োজন।
রাজধানীর যানজট কমাতে ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় ছয়টি মেট্রোরেল লাইন গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প এমআরটি লাইন-১। এ লাইনের বিমানবন্দর অংশ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত এবং পূর্বাচল অংশ নতুন বাজার থেকে পূর্বাচল পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়ার কথা। এতে বিমানবন্দর, খিলক্ষেত, বাড্ডা, রামপুরা, মালিবাগ ও কমলাপুরের সঙ্গে পূর্বাচলের যোগাযোগ বাড়বে। প্রকল্পটির সংশোধিত উন্নয়ন প্রস্তাব অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
এমআরটি লাইন-৫-এর উত্তর অংশ হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত বিস্তৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ পথে আমিনবাজার, গাবতলী, মিরপুর, কচুক্ষেত, বনানী ও গুলশানের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকা যুক্ত হবে। আর দক্ষিণ অংশ গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত যাওয়ার কথা। এতে মিরপুর, শ্যামলী, আসাদগেট, কারওয়ান বাজার, তেজগাঁও, আফতাবনগর ও দাশেরকান্দির মধ্যে যোগাযোগ তৈরি হবে।
এ ছাড়া এমআরটি লাইন-২-এর প্রস্তাবিত পথে গাবতলী থেকে মোহাম্মদপুর, নিউমার্কেট, গুলিস্তান, মতিঝিল হয়ে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত যোগাযোগের পরিকল্পনা রয়েছে। এর একটি শাখা সদরঘাট পর্যন্ত যাওয়ার কথা। এমআরটি লাইন-৪-এর পরিকল্পিত পথ কমলাপুর থেকে সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী, সাইনবোর্ড ও কাঁচপুর হয়ে মদনপুর পর্যন্ত বিস্তৃত।

পুরোনো বাস অপসারণ ও ৩১টি সড়ক রুট সংস্কার
রাজধানীর যানজট কমানো, গণপরিবহণে শৃঙ্খলা ফেরানো ও যাত্রীসেবার মান উন্নত করতে চারটি উদ্যোগ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছে সরকার। উদ্যোগগুলোর মধ্যে রয়েছে ২০ বছরের বেশি পুরোনো বাস সড়ক থেকে সরিয়ে নেওয়া, গুরুত্বপূর্ণ এলাকার বাস টার্মিনাল স্থানান্তর, পুরোনো ৩১টি সড়ক রুট সংস্কার এবং অটোরিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণে নীতিমালা প্রণয়ন।
পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হলে রাজধানীর সড়কে যানবাহনের চাপ কমানো, গণপরিবহণের চলাচল ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং সড়ক নিরাপত্তা জোরদারের সুযোগ তৈরি হবে। তবে এসব উদ্যোগের সুফল পেতে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা, বাস্তবায়নের সময়সীমা, বিকল্প পরিবহণের ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সড়ক পরিবহণ ও সেতু এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব বলেন, রাজধানীর যানজট নিরসনে বিচ্ছিন্নভাবে পদক্ষেপ নিলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। পুরোনো বাস অপসারণ, টার্মিনাল ব্যবস্থাপনা, সড়ক রুট সংস্কার ও অটোরিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগগুলো সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় বাস্তবায়নের বিষয়টি সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।
>> আরও পড়ুন
দুই মাস না পেরোতেই মুখ থুবড়ে পড়েছে ‘পিংক বাস’
সড়ক পরিবহণ ও সেতু বিভাগের সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হক বলেন, পরিবহণ ব্যবস্থার উন্নয়নে পরিকল্পনা গ্রহণের পাশাপাশি বাস্তবায়নযোগ্য কর্মপরিকল্পনা তৈরি, দায়িত্ব বণ্টন এবং নিয়মিত অগ্রগতি মূল্যায়ন করা হবে। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় রেখে উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে রাজধানীর সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা ও যাত্রীসেবার মান উন্নয়নে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে। এ ক্ষেত্রে জনস্বার্থ, সড়ক নিরাপত্তা ও গণপরিবহণের সহজলভ্যতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

বাস টার্মিনাল স্থানান্তরের পরিকল্পনা
রাজধানীর ভেতরে আন্তজেলা বাস চলাচল ও টার্মিনালকেন্দ্রিক যানজট কমাতে বাস টার্মিনাল স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গাবতলী, মহাখালী, সায়েদাবাদ ও গুলিস্তান এলাকার টার্মিনাল ও ডিপোর ব্যবহার নিয়েও পরিকল্পনা রয়েছে।
গত ৬ সেপ্টেম্বর বাসসের এক প্রতিবেদনে সড়ক পরিবহন ও রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদের বরাতে জানানো হয়, রাজধানীর যানজট নিরসনে চারটি বাস টার্মিনাল ও ডিপো পরিপূর্ণভাবে ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে টার্মিনাল স্থানান্তর, বিকল্প ডিপো ব্যবহার, গাবতলী টার্মিনাল সম্প্রসারণ, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং সিটি করপোরেশনের টার্মিনাল উন্নয়নের কাজ সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ বলেন, রাজধানীর যানজট নিরসনে নেওয়া নীতিমালা ও কর্মপরিকল্পনার বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়েছে সভায়। যেসব উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন, সেগুলো চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।ঢাকার যানজটের অন্যতম কারণ শহরের ভেতরে বাস ও গণপরিবহনের অতিরিক্ত চাপ। এ চাপ কমাতে বিদ্যমান টার্মিনালের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প স্থান ও ডিপো ব্যবহারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
এদিকে রাজধানীর যানজট নিরসনে আন্তজেলা বাস টার্মিনালগুলো দ্রুত শহরের বাইরে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপপ্রেস সচিব হাসান শিপলু জানান, রাজধানীর যানজট নিরসন ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন নিয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ফুলবাড়িয়া-গুলিস্তান, গাবতলী, মহাখালী ও সায়েদাবাদ-যাত্রাবাড়ী বাস টার্মিনাল স্থানান্তর করা হবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ফুলবাড়িয়া-গুলিস্তান বাস টার্মিনাল কেরানীগঞ্জে স্থানান্তর করা হবে। মহাখালী বাস টার্মিনাল প্রথমে অস্থায়ীভাবে পূর্বাঞ্চলে নেওয়া হবে। পরে এটি স্থায়ীভাবে টঙ্গীর কাছে স্থানান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। অন্যদিকে, গাবতলী আন্তজেলা বাস টার্মিনাল হেমায়েতপুরে এবং সায়েদাবাদ-যাত্রাবাড়ী বাস টার্মিনাল কাঁচপুরে স্থানান্তর করা হবে।

বাইপাস সড়ক, উড়ালসড়ক ও আন্ডারপাস নির্মাণ
রাজধানীর যানজট নিরসনে নতুন বাইপাস সড়ক, উড়ালসড়ক ও আন্ডারপাস নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এসব অবকাঠামোর মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে যানবাহনের চাপ কমানো এবং এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় চলাচল সহজ করার লক্ষ্য রয়েছে।
ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এ ধরনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের ২০২৬ সালের মে মাসের অগ্রগতি তথ্যে বলা হয়েছে, বিমানবন্দর থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুতুবখালী পর্যন্ত র্যাম্পসহ প্রকল্পটির দৈর্ঘ্য ৪৬ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার। এর মধ্যে মূল উড়ালসড়ক ১৯ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার এবং র্যাম্প ২৭ কিলোমিটার। প্রকল্পটির নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে এবং নির্মিত অংশের কিছু অংশ যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে।
রাজধানীর যানজট নিরসনে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন এবং ঢাকার চারপাশে নতুন বাইপাস সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পাশাপাশি শহরের ভেতরে ওভারপাস ও আন্ডারপাস নির্মাণ, ট্রাফিক সিগন্যাল স্বয়ংক্রিয় করা এবং গণপরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজধানীর যানজট নিরসন ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন নিয়ে অনুষ্ঠিত বিশেষ সভায় সংশ্লিষ্টদের এসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা দেন।
প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন জানান, সভায় যানজট কমাতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এর মধ্যে দেশীয় প্রযুক্তি ব্যবহার করে পর্যায়ক্রমে ঢাকার ১২০টি ট্রাফিক সিগন্যাল স্বয়ংক্রিয় করার উদ্যোগ রয়েছে। এ ছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে থাকা অনিয়ন্ত্রিত বাস কাউন্টার অপসারণ এবং মহানগরের ভেতরে থাকা পাঁচটি আন্তজেলা বাস টার্মিনাল শহরের বাইরে স্থানান্তরের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। স্থানান্তরিত টার্মিনালগুলো নগর পরিবহনের সিটি সার্ভিস পরিচালনায় ব্যবহারের কথাও বলা হয়েছে।
তিনি বলেন, সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ফুটপাত ও রাস্তার দুই পাশ দখলমুক্ত করা এবং সড়কের মাঝখানে থাকা বিদ্যুতের খুঁটি সরানোর উদ্যোগ রয়েছে। শহরের ভেতরে রেলক্রসিংগুলোতে স্বয়ংক্রিয় সংকেতবাতি স্থাপন এবং সিটি বাসগুলোকে জিপিএসভিত্তিক নজরদারির আওতায় আনার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অধিকাংশ ফুটওভারব্রিজে চলন্ত সিঁড়ি স্থাপন এবং হাসপাতাল এলাকার ফুটওভারব্রিজে দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি লিফট বসানোর উদ্যোগ রয়েছে।

‘জিরো সিগন্যাল’ ব্যবস্থার পরিকল্পনা
পরিকল্পনা অনুযায়ী, রাজধানীর উত্তর-দক্ষিণ ও পূর্ব-পশ্চিম প্রান্তকে যুক্ত করে ১০৫ কিলোমিটার সড়ক সিগন্যালমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ‘জিরো সিগন্যাল ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট’ নামের এই ব্যবস্থার আওতায় যানবাহনকে ট্রাফিক বাতির অপেক্ষায় না রেখে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে চলাচলের সুযোগ তৈরি করা হবে। এ জন্য গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও সংযোগস্থলে উড়ালসড়ক, আন্ডারপাস, ইউ-লুপ ও ইন্টারচেঞ্জ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রস্তাবিত ১০৫ কিলোমিটার সড়কে মোট ৮০টি সংযোগস্থল থাকবে। এসব স্থানে যানবাহনের চলাচল নির্বিঘ্ন রাখতে বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। পরিকল্পনায় নতুন করে ৩৭টি অবকাঠামো নির্মাণের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে ১৬টি ওভারপাস বা আন্ডারপাস, ১৩টি ওভারপাস বা আন্ডারপাসের সঙ্গে ইউ-লুপ, সাতটি ইন্টারচেঞ্জ সার্কেল এবং একটি ইউ-লুপসহ ইন্টারচেঞ্জ রয়েছে।
এ ছাড়া পথচারীদের নিরাপদে রাস্তা পারাপারের জন্য নতুন করে ৩০টি ফুটওভারব্রিজ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। রিকশাসহ অন্যান্য ধীরগতির যানবাহনের জন্য আলাদা লেন রাখা হবে। এতে দ্রুতগতির যানবাহনের সঙ্গে ধীরগতির যানবাহনের সংঘাত কমানো এবং সড়কে চলাচলের গতি বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে। এসব অবকাঠামো নির্মাণে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৬৭২ কোটি ১৬ লাখ টাকা।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রস্তাবিত নেটওয়ার্কে বর্তমানে ছয়টি অবকাঠামো রয়েছে। বাকি অবকাঠামোগুলোর মধ্যে নতুন করে অন্তত ৩০টি নির্মাণ করা গেলে এই ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ১০৫ কিলোমিটার সিগন্যালমুক্ত সড়কের বাইরে রাজধানীর অন্যান্য সড়কে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক বাতি ও সিগন্যালের মাধ্যমে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হবে।

অটোরিকশা চলাচল নিয়ন্ত্রণ ও অবৈধ দখল উচ্ছেদ
রাজধানীর সড়কে অটোরিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণে নীতিমালা প্রণয়ন করেছে সরকার। একই সঙ্গে সড়কের পাশে অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং রাস্তার মাঝখানে থাকা বৈদ্যুতিক খুঁটি অপসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে কোন সড়কে কোন ধরনের যান চলবে, কোথায় যাত্রী ওঠানামা করবে এবং কোথায় যানবাহন দাঁড়াতে পারবে, তা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। বিকল্প পরিবহনের ব্যবস্থা না করে হঠাৎ চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হলে নিম্ন আয়ের যাত্রী ও চালকদের ওপর প্রভাব পড়তে পারে।
এ ছাড়া শহরের ভেতরের রেলক্রসিংয়ে স্বয়ংক্রিয় সংকেতবাতি স্থাপন, বাসে জিপিএসভিত্তিক নজরদারি এবং পথচারীদের জন্য ফুটওভারব্রিজে এসকেলেটর ও হাসপাতালসংলগ্ন কিছু সেতুতে স্থানীয় প্রযুক্তিতে তৈরি লিফট স্থাপনের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগের লক্ষ্য যানবাহন ও পথচারীদের চলাচল আরও সুশৃঙ্খল করা।
যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার যানজট নিরসনে সরকারের উদ্যোগগুলো অবকাঠামো নির্মাণ থেকে শুরু করে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও গণপরিবহন সংস্কার পর্যন্ত বিস্তৃত। তবে এসব উদ্যোগের সুফল নির্ভর করবে বাস্তবায়নের অগ্রগতি, সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং নিয়মিত তদারকির ওপর।
রাজধানীর সড়কে যানবাহনের চাপ কমাতে শুধু নতুন সড়ক নির্মাণ যথেষ্ট নয়। বাসের রুট ও সময়সূচি সমন্বয়, নির্ধারিত স্থানে যাত্রী ওঠানামা, অবৈধ পার্কিং নিয়ন্ত্রণ, ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা এবং ট্রাফিক আইন কার্যকর করাও জরুরি।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী ঢাকা মেইলকে বলেন, উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০ লাখের বেশি মানুষের বসবাস রয়েছে এমন শহরগুলোতে গণপরিবহণের সমন্বিত ব্যবস্থা বা ট্রানজিট রয়েছে। ঢাকায় দিনের বেলায় জনসংখ্যা প্রায় আড়াই কোটিতে পৌঁছালেও এখানে কার্যকর ট্রানজিট ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। একটি মেট্রোরেল চালু থাকলেও সেটিকে পূর্ণাঙ্গ গণপরিবহণব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, রাজধানীতে ছোট যানবাহনের সংখ্যা ও চলাচল বেড়েছে। এসব যানবাহন নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে যানজট থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন। যানজট কমাতে সবার আগে বাসভিত্তিক গণপরিবহণব্যবস্থা পুনর্বিন্যাস বা বাস রুট রেশনালাইজেশন কার্যকর করা জরুরি। সরকার আগামী ১ নভেম্বর থেকে এটি চালুর কথা বলছে। উদ্যোগটি জরুরি ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।
মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, সরকার ইতোমধ্যে যেসব উদ্যোগ নিয়েছে, সেগুলোকে সরাসরি যানজট কমানোর কার্যকর উদ্যোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। দীর্ঘমেয়াদে যানজট কমাতে সমন্বিত গণপরিবহণব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং ছোট যানবাহনের চলাচল নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান ঢাকা মেইলকে বলেন, যানজট নিয়ন্ত্রণে দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, কোনো শহরের জনসংখ্যা, জনঘনত্ব ও কর্মকাণ্ডের বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে শুধু পরিবহণ অবকাঠামো নির্মাণ করে যানজট নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। দ্বিতীয়ত, যেসব সমাধানের কথা ভাবা হচ্ছে, সেগুলো কতটা ব্যয়সাশ্রয়ী, বাস্তবায়নযোগ্য এবং কত দ্রুত কার্যকর করা যাবে, তা বিবেচনায় নিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, মেট্রোরেল, উড়ালসড়ক ও এক্সপ্রেসওয়ের মতো বড় প্রকল্পে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে। অথচ একজন যাত্রী আজিমপুর থেকে বিমানবন্দরে যাওয়ার জন্য সহজে একটি মানসম্মত বাস পান না। একের পর এক সরকার পরিবর্তন হলেও রাজধানীর মানুষের জন্য আরামদায়ক ও নির্ভরযোগ্য বাসসেবা নিশ্চিত করা যায়নি। যে শহরে সাধারণ মানুষের জন্য একটি ভালো বাসের ব্যবস্থা করা যায় না, সেখানে ব্যয়বহুল অবকাঠামো প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
এই পরিকল্পনাবিদ বলেন, বড় প্রকল্পের পাশাপাশি সহজ ও স্বল্প ব্যয়ের সমাধানে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। মানসম্মত বাসসেবা চালু করা, ভালো ফুটপাত নির্মাণ এবং গণপরিবহণের ব্যবস্থাপনা উন্নত করার মতো উদ্যোগ তুলনামূলক কম সময়ে বাস্তবায়ন করা সম্ভব। অথচ এসব মৌলিক সেবার ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে।
এএইচ/এএস