নিজস্ব প্রতিবেদক
২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০১:২০ পিএম
২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। এ লক্ষ্য অর্জনে সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা চেয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। তবে দেশের বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থা আধুনিক না হওয়ায় এ লক্ষ্য অর্জনে চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) রাজধানীর বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে তিন দিনব্যাপী ‘রিনিউয়েবল এনার্জি ফেস্ট ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সংকট তুলে ধরে তিনি বলেন, বেশি দামে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি কিনে কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে সরকারকে। এতে এ খাতে বড় ধরনের আর্থিক ঘাটতি তৈরি হয়েছে। কিন্তু জনগণ সরকারের সমস্যাগুলো বুঝতে চাইছে না।
তিনি আরও বলেন, ‘কেউ বুঝতে চায় না আমাদের সমস্যা। আমরা এখনো সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। বেশি দামে কিনে কম দামে বিক্রি করছি। জনগণ সেই দাম দিতে রাজি নয়।’
বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক সংকট তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা বাবদ নির্ধারিত অর্থ বা ক্যাপাসিটি চার্জে হাত দেওয়ার মতো পরিস্থিতি নেই। এতে হাত দিলেই ব্যাংকগুলো সামনে চলে আসবে। বিদ্যুৎকেন্দ্র বসে থাকলেও সেগুলোর জন্য অর্থ দিতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ কেনা ও জ্বালানি সরবরাহ, কোনোটিই ঠিকমতো করা যাচ্ছে না।
এলএনজি আমদানির সংকটের কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, ‘এলএনজির জন্য কাতারের ওপর নির্ভরশীল ছিলাম। বোমা হামলার কারণে কাতার সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে। ১০ থেকে ১২ ডলারের এলএনজি ৩০ ডলার দিয়ে কিনেছি। সরকার চারদিক দিয়ে বাঁচতে পারে না।’
তিনি আরও বলেন, বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে বিদ্যুৎ খাতে ভালো সেবা দেওয়া যাচ্ছে, এমন দাবি তিনি করবেন না। এ খাতে বিশাল ঘাটতি রয়েছে এবং প্রতিনিয়ত রক্তক্ষরণ হচ্ছে।
গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহের সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, অনেক গ্রামে যাতায়াতের রাস্তা নেই। কোথাও বিদ্যুতের ত্রুটি দেখা দিলে তা শনাক্ত করতেই দুই থেকে তিন দিন লেগে যায়। এ সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকলে লোডশেডিং হয়। কিন্তু মানুষ এসব বাস্তবতা বুঝতে চায় না। এমনকি ডেপুটি স্পিকারও বিষয়টি নিয়ে ছাড় দেননি।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে সরকারের উদ্যোগ তুলে ধরে তিনি বলেন, এ বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা হলেও কোনো সরকার কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই এ বিষয়ে উদ্যোগ নিয়েছে। এ লক্ষ্যে রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করেছেন। বিশেষ জ্বালানি আইন পরবর্তী সংসদে উত্থাপন করা হবে।
আগের সরকারের সময় বিশেষ আইন নিয়ে সমালোচনা করে বিদ্যুৎমন্ত্রী বলেন, আগের সরকার চুরির উদ্দেশ্যে এ ধরনের আইন করেছিল। তবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে সৌরবিদ্যুৎ সংশ্লিষ্ট সবকিছু শুল্কমুক্ত করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। তিনি বলেন, দেশের বিদ্যুৎ গ্রিড আধুনিক নয়। এ গ্রিডে পারমাণবিক, জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক ও নবায়নযোগ্য উৎসের বিদ্যুৎ যুক্ত হবে। কিন্তু পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি) এখনো এ জন্য প্রস্তুত নয়। পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল।
তিনি বলেন, ‘আপনারা সহযোগিতা করলে ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারব।’
দেশের ভূগর্ভস্থ জ্বালানি সম্পদ অনুসন্ধানে আগের সরকারের সমালোচনা করে মন্ত্রী বলেন, দেশের ভূগর্ভে বিপুল সম্পদ রয়েছে। কিন্তু বিগত ১৭ বছরে একটি কূপও খনন করা হয়নি। ওই সময়ে অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার কারণে দেশকে আরও ৫০ থেকে ৬০ বছর ভুগতে হতে পারে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনে সরকারি ও বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৬৫ শতাংশ সরকারি খাতে রাখার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু অর্থ উপার্জনের উদ্দেশ্যে গত ১৭ বছরে সেই পরিকল্পনা পরিবর্তন করা হয়েছে। বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৭০ শতাংশ বেসরকারি খাতে। সরকারি উদ্যোগে বিদ্যুৎকেন্দ্র করা হলেও সেগুলোর কয়েকটি যৌথভাবে করা হয়েছে।
নিজেদের সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, তার দল জোর করে ক্ষমতায় থাকেনি এবং ১৭ বছর ক্ষমতায় থাকার উদ্দেশ্যেও আসেনি। প্রধানমন্ত্রী প্রতিটি ছোট বিষয় সরাসরি পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন না। এ কারণে প্রতিদিন ব্যবস্থাপনা তথ্য ব্যবস্থা (এমআইএস) প্রতিবেদন পাঠানো হয়।
তিনি বলেন, একবার প্রধানমন্ত্রী বিদ্যুৎ সরবরাহের একটি সমস্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলার পর পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডকে (আরইবি) ডেকে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হয়। পরে জানা যায়, কারিগরি কারণে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ ছিল।
অনুষ্ঠানে বুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক একরামুল হক বলেন, দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত বর্তমানে একটি সন্ধিক্ষণে রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি দেশের অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করেছে। এ পরিস্থিতিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
একশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির বলেন, বিশ্বের সব দেশই জ্বালানি নিয়ে নতুন গবেষণার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৯৬ শতাংশ জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর এবং এর বেশির ভাগই আমদানিনির্ভর। ফলে এ খাত নানা ধরনের ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
‘একটি ন্যায্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সবুজ জ্বালানি রূপান্তর’ প্রতিপাদ্য সামনে রেখে আয়োজিত তিন দিনব্যাপী এ উৎসবের যৌথ আয়োজক একশনএইড বাংলাদেশ, বুয়েট, জাস্ট এনার্জি ট্রানজিশন নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ (জেটনেট-বিডি) এবং বুয়েটের ইনস্টিটিউট অব এনার্জি অ্যান্ড সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট (আইইএসডি)।
এ আয়োজনে সহ-আয়োজক হিসেবে রয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার রিসার্চ কাউন্সিল, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ, বাংলাদেশ সোলার অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন, সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ, গ্রিনারি এনার্জি সল্যুশন লিমিটেড, ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিক্স অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস, অক্সফাম ইন বাংলাদেশ ও দ্য আর্থ সোসাইটি।
আয়োজকেরা জানান, উৎসবে তরুণ, নারী, শ্রমিক, নাগরিক সংগঠন ও জলবায়ু নিয়ে কাজ করা এক হাজারের বেশি প্রতিনিধি অংশ নিচ্ছেন। সরকারি নীতিনির্ধারক, গবেষক, বেসরকারি খাতের প্রতিনিধি, বিনিয়োগকারী, নাগরিক সমাজ ও উন্নয়ন সহযোগীদের একই প্ল্যাটফর্মে এনে জ্বালানি রূপান্তর নিয়ে আলোচনা এবং আয়োজন-পরবর্তী সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করাই এ উৎসবের লক্ষ্য।
এমআর/এসআই