জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:০১ পিএম
#কথিত প্রেমিকাকে প্রধান আসামি করে মামলা, তিনি হাইকোর্ট থেকে জামিনে
#হানি ট্র্যাপে ফেলে শিহাবকে হত্যার অভিযোগ পরিবারের
#মামলাটি পিবিআইয়ে হস্তান্তর করে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
রাজধানীর ভাটারার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার একটি বাসায় যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী ব্যবসায়ী শিহাব উদ্দিন মালেকের (সাগর) মৃত্যুর দুই মাস পেরিয়ে গেছে। এ ঘটনায় কাউকে আটক বা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি বলে অভিযোগ করেছে তার পরিবার।
শিহাবের মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশের তদন্তের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন পরিবারের সদস্যরা। তাদের দাবি, হানি ট্র্যাপে ফেলে শিহাবকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। তবে পুলিশ বলছে, তদন্ত চলছে।
যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী কনস্ট্রাকশন ব্যবসায়ী আবদুল মালেকের ছেলে শিহাব উদ্দিন মালেক সাগরের বয়স ৩৬ বছর। গত ২০ আগস্ট সন্ধ্যায় রাজধানীর ভাটারা থানা এলাকার একটি অ্যাপার্টমেন্টে তার রহস্যজনক মৃত্যু হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ওই রাতেই তার মরদেহ উদ্ধার করে। পরদিন তার যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যাওয়ার কথা ছিল। এর আগে কথিত প্রেমিকার জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গিয়ে ওই বাসায় তার মৃত্যু হয়।
সোমবার দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবের একটি হলরুমে সংবাদ সম্মেলন করে এসব অভিযোগ করেন শিহাবের বাবা আবদুল মালেক ও পরিবারের সদস্যরা।
সংবাদ সম্মেলনে আবদুল মালেক বলেন, ‘আমরা এ ঘটনায় শিহাবের কথিত প্রেমিকাসহ ওই বাসায় যারা ছিলেন, প্রত্যেককে গ্রেপ্তার ও জিজ্ঞাসাবাদের দাবি জানিয়ে আসছি। কিন্তু পুলিশ আমাদের কথা শুনছে না। তারা দাবি করছে, শিহাব ইয়াবা খেয়ে আত্মহত্যা করেছে। বিষয়টি হাস্যকর। কারণ, সে কখনো কোনো মাদকে আসক্ত ছিল না। আমরা মনে করি, ওই বাসায় নিয়ে হানি ট্র্যাপে ফেলে তাকে হত্যা করা হয়েছে। আমরা এ হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার চাই।’
লিখিত বক্তব্যে শিহাবের বাবা বলেন, তাদের বিশ্বাস, সাগরকে পরিকল্পিতভাবে হানি ট্র্যাপে ফেলে হত্যা করা হয়েছে এবং পরে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ঘটনার সময় অ্যাপার্টমেন্টে কারা উপস্থিত ছিলেন, মৃত্যুর আগে ও পরে কারা তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন, মরদেহ উদ্ধারের পরিস্থিতি এবং বিভিন্ন ব্যক্তির বক্তব্যে কথিত অসঙ্গতিসহ একাধিক বিষয় নিয়ে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
আবদুল মালেক বলেন, ঘটনার দুই মাস পেরিয়ে গেলেও মামলার প্রধান আসামি মাহজাবিন ইসলাম রিয়াকে গ্রেফতার করা হয়নি। তিনি হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়ে ঘুরছেন। এতে তারা উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছেন।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, নিহত সাগরের পৈতৃক বাড়ি চট্টগ্রামের সন্দ্বীপে। ২০১৮ সালে তিনি চট্টগ্রামে রেস্তোরাঁ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে ঢাকায় গাড়ির ব্যবসা শুরু করেন। ঢাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরুর আগে তিনি চট্টগ্রামে থাকতেন। ঢাকায় আসার পর মাহজাবিন ইসলাম রিয়া নামের এক নারীর সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পরে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
পরিবারের অভিযোগ, সাগরের অর্থ আত্মসাতের উদ্দেশ্যে রিয়া তাকে হানি ট্র্যাপে ফেলেন। সাগর তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিলে রিয়া বিয়ে করতে গড়িমসি করেন এবং একপর্যায়ে অসম্মতি জানান। এতে তাদের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। পরে সাগর চট্টগ্রামে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। চট্টগ্রামে ফিরে গেলে তার মালপত্র কোথায় রাখবেন, তা নিয়েও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন তিনি।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, সাগর চট্টগ্রামে অবস্থানকালে গত ১৯ আগস্ট রিয়া তাকে জন্মদিন উদ্যাপনের জন্য ঢাকায় আমন্ত্রণ জানান। ২০ আগস্ট ছিল সাগরের জন্মদিন। রিয়ার আমন্ত্রণে ১৯ আগস্ট রাত ১০টা ৫ মিনিটের ফ্লাইটে চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ঢাকায় আসেন তিনি। ২০ আগস্ট চট্টগ্রামে ফিরে যাওয়ার জন্য ২১ আগস্ট বিকেল ৫টা ১৫ মিনিটের ফ্লাইটের একটি টিকিটও কিনেছিলেন সাগর। এর মধ্যে ২০ আগস্ট সন্ধ্যায় ভাটারা থানা এলাকার একটি অ্যাপার্টমেন্টের ফ্লোর থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে ২৫ আগস্ট ভাটারা থানায় হত্যা মামলা করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে আবদুল মালেক আরও বলেন, মামলার প্রধান আসামি মাহজাবিন ইসলাম রিয়া হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে তাকে সাগরকে বটি হাতে হত্যার হুমকি দিতে দেখা গেছে বলে দাবি করেন তিনি।
আবদুল মালেক বলেন, পুলিশের বরাতে ২৩ আগস্ট তারা জানতে পারেন, মরদেহ উদ্ধারের সময় সাগরের অ্যাপার্টমেন্টের কেয়ারটেকার মুসা ও এক অজ্ঞাতপরিচয় নারী সেখানে উপস্থিত ছিলেন। এমন পরিস্থিতিতে মামলার প্রধান আসামি কীভাবে জামিন পেলেন, তা নিয়ে তাঁদের প্রশ্ন রয়েছে। সাগরের ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনেও গরমিল করা হয়েছে বলে তাদের সন্দেহ।
এ অবস্থায় মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনে (পিবিআই) হস্তান্তর করে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে পরিবার। একই সঙ্গে ঘটনার সময় অ্যাপার্টমেন্টে উপস্থিত ব্যক্তিদের ভূমিকা, নিহতের শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল কি না, ফরেনসিক প্রতিবেদন, ঘটনাস্থলের আলামত এবং ঘটনার আগে ও পরে ফোনকল, বার্তা ও অন্যান্য যোগাযোগের তথ্য যথাযথভাবে বিশ্লেষণের দাবি জানানো হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত ছিলেন নিহতের চাচা আনোয়ার হোসেন, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা (এফবিআই)-এর সাবেক এজেন্ট মাইকেল ডোনোহো, নিহতের বড় ভাই সাইফুদ্দিন মালেক ও সালাউদ্দিন মালেকসহ আরও অনেকে।
এ বিষয়ে ভাটারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাজহারুল ইসলাম ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘এ ঘটনায় তদন্ত চলমান আছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন না আসা পর্যন্ত কিছু বলা যাচ্ছে না।’
শিহাবের কথিত প্রেমিকা মাহজাবিন ও ওই বাসার লোকজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল কি না, এমন প্রশ্নে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি। তিনি শুধু বলেন, ‘আমরা ঘটনা তদন্তের জন্য যা যা করা লাগে, তা করেছি।’
এমআইকে/এআরএম