আব্দুল হাকিম
২৩ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৩৮ এএম
- দুই কূপ থেকে দৈনিক ৩ কোটি ঘনফুট গ্যাসের আশা
- ৮ বছরে ১৫০ কূপ খননের লক্ষ্যমাত্রা সরকারের
- আগামী ১০ বছরে ১০০ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদনের লক্ষ্য
- কূপ খনন সফল হলে জ্বালানি সংকট কমবে
- চলতি বছরে ৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনা
দেশে গ্যাসের চাহিদা বাড়লেও কমছে পুরনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন। ফলে শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বিভিন্ন খাতে গ্যাস সরবরাহের চাপ বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে ব্যয়বহুল তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে তিতাস-৩২ ও তিতাস-৩৩ নামে দুটি মূল্যায়ন-কাম-উন্নয়ন কূপ খননের জন্য ৫৯২ কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। নতুন কূপ দুটি থেকে দৈনিক প্রায় তিন কোটি ঘনফুট গ্যাস এবং ১৮ ব্যারেল কনডেনসেট পাওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের উদ্যোগে নেওয়া প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড (বিজিএফসিএল)। পেট্রোবাংলার অধীন প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে নতুন কূপ দুটি খনন, গ্যাস সংগ্রহের পাইপলাইন নির্মাণ এবং উত্তোলিত গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করা হবে। প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৯ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। অর্থাৎ তিন বছরের মধ্যে খননকাজ ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো নির্মাণ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
পেট্রোবাংলার এক কর্মকর্তা জানান, প্রকল্পটি ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৯ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে সরকারি অর্থায়ন থেকে ৪১৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা এবং কোম্পানির নিজস্ব তহবিল থেকে ১৭৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয় করা হবে।
পেট্রোবাংলার এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, নতুন কূপ দুটি থেকে দৈনিক প্রায় ৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদনের প্রত্যাশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি কূপ দুটি থেকে দৈনিক প্রায় ১৮ ব্যারেল কনডেনসেট পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নতুন কূপ দুটি জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে সহায়তা করবে। পাশাপাশি দৈনিক ১৮ ব্যারেল কনডেনসেট পাওয়া যাবে। দেশে গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে ২০৩১ সালের মধ্যে ১৫০টি কূপ খননের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। এরপর ২০৩১ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে আরও ১৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছিল ৬৩২ কোটি টাকা। পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) পর্যালোচনার পর ব্যয় ৪০ কোটি টাকা কমিয়ে ৫৯২ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সংশোধিত প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রকল্পে সরকারি ঋণ হিসেবে ৪১৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা এবং বিজিএফসিএলের নিজস্ব তহবিল থেকে ১৭৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয় করা হবে। প্রস্তাবিত অর্থায়নের প্রায় ৭০ শতাংশ সরকারি ঋণ এবং বাকি ৩০ শতাংশ সংস্থার নিজস্ব অর্থ থেকে আসবে।
প্রকল্পটির গুরুত্ব শুধু নতুন দুটি কূপ খননের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশে গ্যাসের চাহিদা ও উৎপাদনের ব্যবধান বাড়তে থাকায় দেশীয় উৎস থেকে উৎপাদন বাড়ানো এখন জ্বালানি খাতের অন্যতম চ্যালেঞ্জ। নতুন কূপ দুটি থেকে প্রত্যাশিত উৎপাদন পাওয়া গেলে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ বাড়বে। তবে এই উৎপাদন দেশের সামগ্রিক গ্যাসের ঘাটতি কতটা কমাতে পারবে, তা নির্ভর করবে কূপ দুটির প্রকৃত উৎপাদন ক্ষমতা, বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন পরিস্থিতি এবং দেশের মোট চাহিদার ওপর।
প্রকল্পের ব্যয় কমানোর পেছনে পরিকল্পনা কমিশনের পর্যালোচনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। প্রকল্পের বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত ব্যয়, পরামর্শক নিয়োগ, যানবাহন ভাড়া এবং অবকাঠামো নির্মাণের প্রস্তাব পর্যালোচনা করে কয়েকটি খাতে ব্যয় কমানো হয়েছে।
প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, গত ১৮ জুন অনুষ্ঠিত পিইসির সভায় ব্যয় কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে ৬ সেপ্টেম্বর বিজিএফসিএল সংশোধিত প্রকল্প প্রস্তাব জমা দেয়। সংশোধিত প্রস্তাবে বিস্তারিত নকশা, ব্যয়ের বিভাজন ও পরিবেশগত ছাড়পত্র অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ২০ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে সংশোধিত প্রস্তাবটি একনেকের অনুমোদনের জন্য উপস্থাপনের প্রস্তুতির কথা জানানো হয়।
প্রকল্পের ব্যয় পর্যালোচনায় আপৎকালীন বরাদ্দ কমানো হয়েছে। ভৌত আপৎকালীন ব্যয় থেকে পাঁচ কোটি ৬৯ লাখ টাকা এবং মূল্যজনিত আপৎকালীন ব্যয় থেকে ২২ কোটি ১১ লাখ টাকা কমানো হয়েছে। এ ছাড়া পরামর্শক নিয়োগ, যানবাহন ভাড়া, বীমা, টেলিফোন, ভ্রমণ ও গুদাম মেরামতের মতো খাতেও ব্যয় পুনর্বিবেচনা করা হয়েছে। প্রাথমিক প্রস্তাবে তিন শ্রেণির বিদেশি পরামর্শক নিয়োগের পরিকল্পনা থাকলেও পর্যালোচনায় দুটি বিদেশি ও একটি দেশি পরামর্শক নিয়োগের ব্যবস্থা রাখা হয়। দুটি যানবাহন ভাড়ার পরিবর্তে একটি যানবাহনের সংস্থান রাখা হয়েছে।
একই সঙ্গে রাসায়নিক দ্রব্যের গুদাম, নিরাপত্তাচৌকি ও আনসার ক্যাম্প নির্মাণের মতো কয়েকটি কাজ প্রকল্পের ব্যয় থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কিছু স্থাপনা পরে বিজিএফসিএলের নিজস্ব উন্নয়ন বাজেট থেকে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময়মূল্য পরিবর্তনের কারণে কিছু খাতে ব্যয় বেড়েছে। ডলারপ্রতি টাকার বিনিময়মূল্য ১২২ টাকা ৭৫ পয়সার পরিবর্তে ১২৩ টাকা ৭৫ পয়সা ধরে হিসাব করায় খনন সরঞ্জাম ভাড়ার ব্যয় তিন কোটি ৫০ লাখ টাকা বেড়েছে। অর্থাৎ কিছু খাতে ব্যয় কমলেও বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময়মূল্যজনিত বাড়তি ব্যয় প্রকল্পের হিসাবে যুক্ত হয়েছে।
প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে খনন করা ২৮টি কূপের মধ্যে ২৩টি থেকে দৈনিক প্রায় ৩৩ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হচ্ছে। নতুন দুটি কূপ থেকে দৈনিক আরও প্রায় তিন কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া গেলে এবং বিদ্যমান কূপগুলোর উৎপাদন অপরিবর্তিত থাকলে তিতাসের মোট দৈনিক উৎপাদন প্রায় ৩৬ কোটি ঘনফুটে পৌঁছাতে পারে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তিতাস ও বাখরাবাদ গ্যাসক্ষেত্রে ২০১০ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে পরিচালিত ত্রিমাত্রিক ভূকম্পন জরিপের তথ্য পর্যালোচনার ভিত্তিতে তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে ১৬টি ইনফিল কূপ এবং একটি গভীর কূপ খননের সুপারিশ করা হয়েছিল। এর ধারাবাহিকতায় তিতাস-৩২ ও তিতাস-৩৩ কূপকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। সরকারের ১৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনার সঙ্গেও প্রকল্পটির সম্পর্ক রয়েছে। নতুন অনুসন্ধান ও উন্নয়ন কূপ খননের পাশাপাশি পুরনো কূপগুলোর উৎপাদনক্ষমতা ধরে রাখা গেলে দেশীয় গ্যাস সরবরাহের ঘাটতি কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
প্রকল্পের আওতায় কূপ খননের পাশাপাশি প্রায় দুই কিলোমিটার গ্যাস সংগ্রহের পাইপলাইন নির্মাণ করা হবে। নতুন কূপ থেকে উত্তোলিত গ্যাস বিদ্যমান সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করতে এই পাইপলাইন প্রয়োজন হবে। এ ছাড়া খনন সরঞ্জাম ও উপকরণ সরবরাহ, রিগ স্থাপনের স্থান প্রস্তুত এবং প্রয়োজনীয় প্রকৌশলসেবা গ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব কাজের জন্য বিদেশি ঠিকাদার নিয়োগের প্রস্তাব করা হয়েছে।
কূপ খনন সম্পন্ন হলেও গ্যাস সংগ্রহের পাইপলাইন ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো প্রস্তুত না থাকলে উৎপাদিত গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে না। ফলে খননকাজ, সরঞ্জাম সংগ্রহ, পাইপলাইন নির্মাণ ও অন্যান্য অবকাঠামো তৈরির কাজ সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়া জরুরি। কোনো একটি ধাপে বিলম্ব হলে পুরো প্রকল্পের কার্যক্রম পিছিয়ে যেতে পারে। এতে গ্যাস উৎপাদন শুরু হতে দেরি হওয়ার পাশাপাশি প্রকল্পের প্রত্যাশিত আর্থিক সুফল অর্জনেও বিলম্ব ঘটতে পারে।
প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, আগামী ১০ বছরে প্রায় ১০০ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস এবং ৬০ হাজার ৮৮৪ ব্যারেল কনডেনসেট উৎপাদনের প্রাক্কলন করা হয়েছে। কূপমুখের মূল্য বিবেচনায় গ্যাস ও কনডেনসেটের সম্মিলিত মূল্য প্রায় ৩৩৯ কোটি সাত লাখ টাকা হতে পারে। অন্যদিকে ভোক্তা পর্যায়ের গ্যাসমূল্য ধরে শুধু গ্যাসের সম্ভাব্য মূল্য প্রায় ছয় হাজার ৫২৩ কোটি ৯৭ লাখ টাকা বলে প্রকল্পের নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর অন্যতম লক্ষ্য হলো আমদানিকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমানো। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে এলএনজি আমদানিতে বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে আমদানি ব্যয়ও বেড়ে যায়। একই সঙ্গে আমদানির পরিমাণ, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময়মূল্য এবং সরবরাহের অনিশ্চয়তা দেশের জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে তিতাসের নতুন দুটি কূপ থেকে দৈনিক প্রায় তিন কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলে শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সার কারখানাসহ বিভিন্ন খাতে সরবরাহ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। বিশেষ করে দেশীয় উৎস থেকে অতিরিক্ত গ্যাস পাওয়া গেলে আমদানিকৃত জ্বালানির প্রয়োজনীয়তা কিছুটা কমতে পারে।
সম্প্রতি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস গ্যাস ফিল্ডে খনন কাজের উদ্বোধনকালে বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেডের (বিজিএফসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. আব্দুল জলিল প্রামাণিক বলেন, ‘তিতাসসহ বিজিএফসিএল পরিচালিত অন্যান্য ফিল্ডগুলো থেকে গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে নতুন কূপ খনন এবং পুরনো কূপের ওয়ার্কওভার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। তিতাস ও বাখরাবাদ ফিল্ডে দুইটি গভীর অনুসন্ধান কূপ সফলভাবে খনন করতে পারলে এ জ্বালানি খাতের জন্য মাইলফলক হবে। জ্বালানি সংকট অনেকটা কেটে যাবে।’
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অর্থ) এ. কে. এম. মিজানুর রহমান বলেন, ‘দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে চলতি বছরের মধ্যে ৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ প্রেক্ষাপটে দেশিয় জ্বালানির উৎস অনুসন্ধান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ অবস্থায় তিতাসের এ গভীর অনুসন্ধান কূপ খননের উদ্দেশ্য সফল হলে জ্বালানি সংকট অনেকটাই কেটে যাবে।’
এএইচ/এএস