বোরহান উদ্দিন
২১ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৪৮ পিএম
রাজধানীর গুলিস্তান ও আশপাশের এলাকায় ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত করতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) সাঁড়াশি অভিযান চলছে। দফায় দফায় অভিযানে হকারদের উচ্ছেদ করা হলেও অভিযান শেষ হতেই তাঁরা আবার ফুটপাত দখল করছেন। এর মধ্যেই একই এলাকায় ফুটপাতে টিকে আছে রাজনৈতিক দলের ব্যানার টাঙানো কয়েকটি অস্থায়ী কার্যালয়। হকারদের বারবার উচ্ছেদ করা হলেও বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নামে গড়ে ওঠা এসব কার্যালয় অক্ষত থাকায় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সাধারণ মানুষ।
গত রোববার ডিএসসিসির প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুস সালাম গুলিস্তান জিরো পয়েন্ট থেকে গোলাপশাহ মাজার পর্যন্ত হকার উচ্ছেদ অভিযান চালান। এরপর সাংবাদিকদের তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, কাকরাইল মোড় থেকে সদরঘাট এবং মিরপুর রোড থেকে নিউমার্কেট হয়ে আজিমপুর পর্যন্ত কোনো সড়কে হকার বসতে দেওয়া হবে না।
এদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সচিবালয়ের মতো সংবেদনশীল এলাকার আশপাশেও হকার বসা নিষিদ্ধ। পূজা শেষ হলে কেবল সিটি করপোরেশনের লাইসেন্স ও নিবন্ধনধারী হকাররা নির্দিষ্ট ফুটপাতে বসার সুযোগ পাবেন। তবে এ ক্ষেত্রে পরিচ্ছন্নতা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে। নির্দেশ অমান্য করলে মালামাল জব্দসহ কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে।
ফুটপাতে বারবার অভিযান, রাজনৈতিক কার্যালয়ে নয়
সিটি করপোরেশনের বুলডোজার ও উচ্ছেদ অভিযানে প্রধান সড়ক ও ফুটপাতগুলো অল্প সময়ের জন্য হলেও হকারমুক্ত হচ্ছে। কিন্তু অভিযানের এই কঠোরতার মধ্যেই গুলিস্তানের গোলাপশাহ মাজারের পশ্চিম পাশের ফুটপাতে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র।
সরেজমিনে দেখা যায়, ফুটপাতের যে অংশ থেকে দফায় দফায় হকার ও অস্থায়ী দোকানপাট উচ্ছেদ করা হয়েছে, ঠিক তার পাশেই টিকে আছে শ্রমিক দল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের ব্যানার টাঙানো একাধিক অস্থায়ী কার্যালয়। গত বুধবারও কার্যালয়গুলো সচল ও অক্ষত অবস্থায় দেখা গেছে।
অথচ এর পাশের অন্যান্য স্থাপনা গত কয়েক দিনের অভিযানে বারবার উচ্ছেদ করা হয়েছে।

সেখানে ২০ নম্বর ওয়ার্ড শ্রমিক দলের তিনটি কার্যালয় এবং ২০ নম্বর ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক দলের একটি কার্যালয় রয়েছে। পাশে মুক্তিযোদ্ধা দলের একটি কার্যালয় করা হলেও সেটি কিছুদিন আগে ভেঙে ফেলা হয়েছে।
এসব কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রীসহ জিয়া পরিবারের সদস্যদের ছবি দিয়ে ব্যানার তৈরি করা হয়েছে। কার্যালয়গুলোর সামনে ও পাশে ছবি-সংবলিত একাধিক ব্যানার টাঙানো রয়েছে।
কার ইশারায় টিকে আছে এসব কার্যালয়?
নগরবিদ ও সাধারণ পথচারীদের প্রশ্ন, আইন যদি সবার জন্য সমান হয়, তবে হকারদের জন্য এক নিয়ম আর রাজনৈতিক দলের সাইনবোর্ডধারীদের জন্য অন্য নিয়ম কেন? হকারদের উচ্ছেদ করার সময় এসব অস্থায়ী রাজনৈতিক স্থাপনা কেন প্রশাসনের নজর এড়িয়ে যায়, কিংবা এগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় না কেন—তা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
শ্রমিক দল, মুক্তিযোদ্ধা দল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের নাম ব্যবহার করে ফুটপাতের অংশ দখল করে গড়ে ওঠা এসব কার্যালয়ের বিষয়ে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে এখনো কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখা যায়নি।
বুধবার সকালে দেখা যায়, কার্যালয়গুলোর একটিতে সেলুন খোলা হয়েছে। সেখানে কাজ করছেন কয়েকজন। অন্য দুটি কার্যালয়ে বসে আড্ডা দিচ্ছেন কয়েকজন। গুলিস্তানে অভিযান চালানোর সময় এসব ব্যক্তি কার্যালয়ের ভেতরে ও বাইরে চেয়ার পেতে বসে থাকেন। পরে আর উচ্ছেদ না চালিয়ে সিটি করপোরেশনের কর্মীরা চলে যান।
কার্যালয়ের ভেতরে থাকা একজনের কাছে জানতে চাইলে তিনি ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আমরা সবাই একটু বসে আড্ডা দিই। এ জন্য টিন দিয়ে এটা তৈরি করছি। অভিযানের সময় অনুরোধ করার পর তাঁরা ভাঙেননি। কেন ভাঙেননি, তা আমরা বলতে পারব না।’
এদিকে বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিমকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি।

সিটি করপোরেশনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট (সিনিয়র সহকারী সচিব) মো. আমিনুল ইসলামকে ফোন করা হলে তিনি ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আমি এখন ভ্রমণে আছি। পরে ফ্রি হয়ে আপনাকে ফোন করব।’
পরে বিষয়টি নিয়ে হোয়াটসঅ্যাপে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি।
রাজনৈতিক কার্যালয় উচ্ছেদ না হওয়ায় প্রশ্ন
উচ্ছেদ অভিযান নিয়ে যখন সর্বত্র আলোচনা চলছে, তখন প্রশ্ন উঠেছে, হকারদের পাশাপাশি ফুটপাত থেকে রাজনৈতিক কার্যালয়গুলো উচ্ছেদ করা হচ্ছে না কেন। এতে সরকারের আন্তরিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে বলে মনে করেন নগর পরিকল্পনাবিদেরা।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে যখন ঘোষণা দিয়ে এ ধরনের ভালো কাজ শুরু হলো, তখন হকার উচ্ছেদ করে রাজনৈতিক কার্যালয় অক্ষত রাখা দায়িত্বশীলদের নৈতিক অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থানের পরও যখন এমনটা দেখতে হয়, তখন তা পুরোনো সংস্কৃতির কথা মনে করিয়ে দেয়। এমনটা হলে সবাই মনে করবে, আইন সবার জন্য সমান নয়।’
তিনি বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের প্রশাসক না হয় দলীয়, কিন্তু সরকারি কর্মকর্তারা কেন অর্পিত দায়িত্ব পালন করছেন না? এটা রেড সিগন্যাল। সরকার বলেছে, ফুটপাতে কোনো অবৈধ স্থাপনা থাকবে না। সেখানে শ্রমিক দলের হোক কিংবা অন্য সংগঠনের কার্যালয়—কিছুই থাকার কথা নয়। এমন বিষয় রাষ্ট্রের আমলে নিতে হবে। আমরা বিশ্বাস করতে চাই, যাঁদের গাফিলতিতে এসব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ হয়নি, তাঁদেরও জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।’
বিইউ/এআর