মো. মেহেদী হাসান হাসিব
২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:০৭ পিএম
- ১ কোটি ৩৮ লাখ ৫৭ হাজার স্মার্টকার্ড অবিতরণকৃত
- ২৮৬ উপজেলায় শুরু হয়নি কার্ড সংরক্ষণের কার্যক্রম
- বিতরণ ও সংরক্ষণে নানা জটিলতা
- মৃত, স্থানান্তরিত ও সংশোধিত ভোটারের কার্ড নিয়ে জটিলতা
- রিবক্সিংয়ে জনবল ও বরাদ্দ সংকট
- প্রচারণার অভাবে বিতরণকেন্দ্রে বিশৃঙ্খলা
- অবিতরণকৃত কার্ড সংরক্ষণ ও বিনষ্টের সুপারিশ
- ওয়ার্ডভিত্তিক সময়সূচিতে কার্ড বিতরণের প্রস্তাব
- পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হচ্ছে স্মার্টকার্ড ছাপানোর কেন্দ্র
নাগরিকদের উন্নতমানের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) স্মার্ট কার্ড বিতরণ কার্যক্রম শুরুর প্রায় এক দশক পেরিয়ে গেছে। তবে নানা কারণে এখনো মাঠপর্যায়ে পড়ে রয়েছে প্রায় ১ কোটি ৩৮ লাখ ৫৭ হাজার স্মার্ট কার্ড। দীর্ঘ সময়েও এসব কার্ড সংশ্লিষ্ট নাগরিকদের হাতে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। অবিতরণকৃত এসব কার্ডের মধ্যে যেগুলো আর বিতরণের সম্ভাবনা নেই, সেগুলো ধ্বংস করার পরিকল্পনা করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
ইসি সূত্র জানায়, স্মার্টকার্ড বিতরণ একটি চলমান কার্যক্রম। তবে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও বিভিন্ন কারণে প্রায় দেড় কোটি স্মার্টকার্ড বিতরণ করা সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে কিছু কার্ড ভবিষ্যতে বিতরণের সম্ভাবনা থাকলেও কিছু কার্ড নানা কারণে আর বিতরণ করা যাবে না। ভোটারের মৃত্যু, ভোটার স্থানান্তর ও তথ্য সংশোধন, বিদেশে অবস্থান, কর্মস্থল পরিবর্তন কিংবা সচেতনতার অভাব বা তথ্য না জানা—এসব কারণে এসব স্মার্টকার্ড দীর্ঘদিন অবিতরণকৃত অবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যে যেগুলো আর বিতরণের সম্ভাবনা নেই, সেগুলো একটি নির্দিষ্ট সময় পর ধ্বংস করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এছাড়া কার্ড সংরক্ষণের জন্য মাঠপর্যায়ের অফিসগুলোতে রিবক্সিং কার্যক্রম চালু আছে। তবে ২৮৬টি উপজেলায় কার্ড রিবক্সিং করা এখনো শুরু করা যায়নি। অন্যদিকে, বেশিরভাগ উপজেলা/থানায় রিবক্সিং ও বিতরণ একই সঙ্গে চলমান রয়েছে।
স্মার্টকার্ড কীভাবে বিতরণ করা হয় জানতে চাইলে সূত্র জানায়, আমরা দুটি পর্যায়ে বিতরণ কার্যক্রম সম্পন্ন করে থাকি। মাঠপর্যায়ে এবং সংশ্লিষ্ট নির্বাচন অফিস থেকে। মাঠপর্যায়ে বিতরণের ক্ষেত্রে বিতরণের জন্য আমরা সব প্রস্তুতি শেষ করে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী নাগরিকদের স্মার্টকার্ড সংগ্রহের বিষয়ে অবহিত করার জন্য প্রচার-প্রচারণা করে নির্ধারিত দিন ও সময় অনুযায়ী নাগরিকদের মধ্যে স্মার্টকার্ড বিতরণ করে থাকি। আর নির্বাচন অফিস থেকে বিতরণের ক্ষেত্রে যারা মাঠপর্যায় থেকে স্মার্টকার্ড সংগ্রহ করেননি, সেসব অবিতরণকৃত কার্ড মাঠপর্যায় থেকে সংশ্লিষ্ট উপজেলা/থানা নির্বাচন অফিসে ফেরত পাঠানো হয় এবং পরবর্তীতে রিবক্সিং সফটওয়্যার/স্মার্ট কার্ড রিবক্সিং অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন সফটওয়্যারের মাধ্যমে অবিতরণকৃত কার্ডসমূহ বক্সিং করে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয়। এরপর সংশ্লিষ্ট নাগরিক পরবর্তীতে নির্বাচন অফিসে উপস্থিত হয়ে কার্ড সংগ্রহের জন্য এলে নিয়ম মেনে সংশ্লিষ্ট নাগরিককে স্মার্টকার্ড দেওয়া হয়।
>> আরও পড়ুন
সূত্র জানায়, মাঠপর্যায়ে অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগকৃত জনবলের কারণে বিতরণে সমস্যা হলে অনেক সময় তাৎক্ষণিক সমাধান দেওয়া সম্ভব হয় না। এ ছাড়া যন্ত্রপাতিতে কারিগরি ত্রুটি, বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও জেনারেটরের অপর্যাপ্ত ব্যবস্থা, দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা এবং প্রচারণার অভাবে শিডিউলের বাইরের নাগরিকদের উপস্থিতিতে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। সংশোধনের পরও কার্ডে আগের ভুল তথ্য মুদ্রিত থাকা, হারানো কার্ডের পরিবর্তে স্মার্টকার্ড নিতে আসা কিংবা অন্যের কার্ড নিতে আসার কারণে জটিলতা সৃষ্টি হয়। এসব ঘটনায় নাগরিকদের ক্ষোভ বাড়ে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা থাকে। আর মাঠপর্যায়ে বিতরণ শেষে অবিতরণকৃত কার্ড নির্ধারিত স্মার্ট কার্ড রিবক্সিং অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন সফটওয়্যারের মাধ্যমে রিবক্সিং করে অফিসে সংরক্ষণ করতে হয়। এ কাজে বাইরের জনবল নিয়োজিত না থাকায় অফিসের নিজস্ব জনবলকে অন্যান্য কাজের পাশাপাশি কার্যক্রমটি সম্পন্ন করতে হয়, ফলে গতি ধীর হয়। প্রয়োজনীয় বরাদ্দ না থাকায় আলাদা বক্স কেনা সম্ভব হয় না এবং অধিকাংশ অফিসে গোডাউনে জায়গার সংকটে কার্ডগুলো সুশৃঙ্খলভাবে সংরক্ষণ করা যায় না। এ ছাড়া ২০২৪ সালে নতুন সফটওয়্যার মাঠপর্যায়ে দেওয়ার পর আগের সফটওয়্যারে রিবক্সিং করা অনেক অফিস নতুন সফটওয়্যারে কাজ সম্পন্ন করতে পারেনি। ফলে সারাদেশে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কার্ডের রিবক্সিং এখনো সম্পন্ন হয়নি।

ঢাকা মেইলের হাতে আসা স্মার্টকার্ড বিতরণ সমস্যা ও সমাধান-সংক্রান্ত ইসির তৈরি এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সারাদেশের মোট ৫২২টি উপজেলার মধ্যে এ পর্যন্ত ৪০৭টি উপজেলার ২০১৬ সাল পর্যন্ত হালনাগাদকৃত এবং ২০১৯ সালের হালনাগাদের কিছু ভোটারের স্মার্টকার্ড প্রিন্ট করে মাঠপর্যায়ে বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। এতে মোট ৮ কোটি ৭৫ লাখ ৮৩ হাজার ৫৫৮টি স্মার্টকার্ডের মধ্যে আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত ৭ কোটি ৩৭ লাখ ২৬ হাজার ৪৫৮টি কার্ড বিতরণ সম্পন্ন হয়েছে এবং ১ কোটি ৩৮ লাখ ৫৭ হাজার ১০০টি কার্ড অবিতরণকৃত অবস্থায় আছে, যা প্রেরিত কার্ডের ১৫ দশমিক ৮২ শতাংশ। ২৮৬টি উপজেলায় কার্ড রিবক্সিং করা এখনো শুরু হয়নি।
প্রতিবেদনে স্মার্টকার্ড বিতরণ-সংক্রান্ত সমস্যার সমাধানে রিবক্সিং অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন সফটওয়্যারের মাধ্যমে রিবক্সিং কার্যক্রম সম্পন্ন এবং প্রয়োজনীয় জনবল, যন্ত্রপাতি ও আর্থিক বরাদ্দ নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে। সিএমএস (এনআইডি সেবা-সংক্রান্ত সার্ভার) থেকে অবিতরণকৃত কার্ডের স্ট্যাটাস সংগ্রহ করে মৃত, স্থানান্তরিত ও সংশোধিত ভোটারের কার্ড পৃথক করার পাশাপাশি মৃত ভোটারের কার্ড বৈধ ওয়ারিশদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংগ্রহের সুযোগ এবং অবশিষ্ট কার্ড বিধি অনুযায়ী বিনষ্টের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। স্থানান্তরিত ও সংশোধিত ভোটারের হালনাগাদ তথ্যবিহীন কার্ডও যথাযথ যাচাই ও অনুমোদন সাপেক্ষে বিনষ্ট এবং সফটওয়্যারে এ-সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণের সুপারিশ করা হয়েছে।
এ ছাড়া অবশিষ্ট কার্ড ওয়ার্ডভিত্তিক সময়সূচি অনুযায়ী বিতরণ, এসএমএস, মাইকিং, ফেসবুক ও ইউটিউবসহ বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচারণা এবং ভিড় এড়াতে নারী-পুরুষের জন্য পৃথক টাইম স্লট নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
জাতীয় পরিচয়পত্র হারানো নাগরিকদের ক্ষেত্রে এএফআইএস (অটোমেটেড ফিঙ্গারপ্রিন্ট আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম) যাচাই নিশ্চিত এবং সার্চিং ল্যাপটপে বহুমুখী সার্চিং অপশন চালুর সুপারিশ করা হয়েছে, যাতে আঙুলের ছাপে সমস্যা হলে অন্যান্য তথ্য দিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর শনাক্ত করা যায়।
প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট লিংকটি যথাযথভাবে কার্যকর করার কথাও বলা হয়েছে। কারণ, লিংক থেকে স্মার্টকার্ডের তথ্য পাওয়া গেলেও নাগরিক কার্ড সংগ্রহ করেছেন কি না, তা জানা যায় না। পাশাপাশি কার্ডটি কোন কেন্দ্রে যাবে, সে তথ্যও সবসময় সঠিকভাবে পাওয়া যায় না।

স্মার্টকার্ড বিতরণের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেছেন, স্মার্টকার্ড পারসোনালাইজেশন সেন্টার পূর্ণ সক্ষমতায় চালুর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসি। আগামী মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে কেন্দ্রটিতে পূর্ণ সক্ষমতায় স্মার্টকার্ড ছাপানোর কার্যক্রম চালু করা হবে। স্মার্টকার্ড পারসোনালাইজেশন সেন্টারের চুক্তি, অডিট আপত্তি ও অন্যান্য প্রশাসনিক জটিলতা সমাধানে উদ্যোগ নিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ইসি সূত্র জানায়, ২০০৭ ও ২০০৮ সালে প্রথম ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা প্রণয়নের কার্যক্রম শুরু করা হয়। পরবর্তীতে এ ভোটার কার্ডের তথ্য ব্যবহার করে নাগরিকদের জাতীয় পরিচয়পত্র দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে নাগরিকদের উন্নতমানের জাতীয় পরিচয়পত্র দেওয়ার লক্ষ্যে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ২০১১ সালে আইডিইএ (স্মার্টকার্ড) প্রকল্পের যাত্রা শুরু হয়। নানা জটিলতা কাটিয়ে চার বছর পর, ২০১৫ সালের ১৪ জানুয়ারি ১৮ মাসের মেয়াদে ফ্রান্সের প্রতিষ্ঠান অবার্থার টেকনোলজিসের সঙ্গে ৯ কোটি নাগরিকের জন্য ৯ কোটি স্মার্টকার্ড তৈরির চুক্তি করে ইসি। এরপর ২০১৬ সালের ৩ অক্টোবর স্মার্টকার্ড বিতরণ কার্যক্রম শুরু করে সংস্থাটি। কিন্তু মেয়াদ বৃদ্ধির পরও ২০১৭ সালের জুন পর্যন্ত শর্ত অনুযায়ী কার্ড দিতে না পারায় চুক্তি বাতিল করা হয় এবং ওই বছরের শেষে অবার্থারের কাছ থেকে জরিমানা আদায় করা হয়।
অবার্থারের সঙ্গে চুক্তি শেষ হলে দেশীয় প্রতিষ্ঠান বিএমটিএফের কাছ থেকে এই কার্ড নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ইসি। এদিকে ২০১৮ সালে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গেও স্মার্টকার্ড প্রকল্পের চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়। এরপর রাজস্ব খাত থেকে প্রকল্পের ব্যয় মেটানো হচ্ছে। আইডিইএ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলে ২০২০ সালের ২৪ নভেম্বর আইডিইএ দ্বিতীয় প্রকল্প হাতে নেয় কমিশন। এই প্রকল্পের আওতায় প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বিএমটিএফের কাছ থেকে ৪০৬ কোটি ৫০ লাখ টাকায় তিন কোটি ব্ল্যাংক স্মার্টকার্ড সরবরাহ করার কথা ছিল। কয়েক বছরে ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় চুক্তিতে পরিবর্তন এনে কার্ডপ্রতি ১৩৫ দশমিক ৫০ টাকার পরিবর্তে ৩৬ দশমিক ৫০ টাকা বাড়িয়ে ১৭২ টাকা করে ২ কোটি ৩৬ লাখ কার্ড কেনার সিদ্ধান্ত নেয় কমিশন। বর্তমানে সব নতুন ভোটারকে সাধারণ কার্ড দিচ্ছে নির্বাচন কমিশন।
সর্বশেষ ভোটার তালিকা হালনাগাদের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৮৭ লাখ ৭৭ হাজার ৬৪৩ জন।
এমএইচএইচ/এএস