নিজস্ব প্রতিবেদক
১৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:০৯ পিএম
দেশে অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের ওপর মানুষের নির্ভরশীলতা বাড়ছে। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে সব বয়সী মানুষই ঝুঁকছেন প্যাকেটজাত এসব খাবারের দিকে। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৯৭ শতাংশ মানুষ সপ্তাহে অন্তত একবার অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার খান। অথচ এসব খাবারে থাকা অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও সম্পৃক্ত চর্বি স্বাস্থ্যের জন্য কতটা ক্ষতিকর, সে সম্পর্কে অনেকেরই স্পষ্ট ধারণা নেই।
এ অবস্থায় খাদ্যজনিত অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি কমাতে প্যাকেটের সামনে সতর্কতামূলক লেবেল বাধ্যতামূলক করার দাবি জানিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) বিশ্ব খাদ্য দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক ওয়েবিনারে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।
গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটরের (জিএইচএআই) সহযোগিতায় গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান) ‘অতি-প্রক্রিয়াজাত খাদ্য-প্যাকেটের সামনে সতর্কতামূলক লেবেল: অগ্রগতি, বাধা ও করণীয়’ শীর্ষক এ ওয়েবিনারের আয়োজন করে।
ওয়েবিনারে উপস্থাপিত গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৯৭ শতাংশ মানুষ সপ্তাহে অন্তত একবার অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণ করেন। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের মধ্যে অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও সম্পৃক্ত চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। এ ধরনের খাবার নিয়মিত গ্রহণের ফলে খাদ্যজনিত বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে বলে জানান বক্তারা।
তারা বলেন, বাজারে বিক্রি হওয়া প্যাকেটজাত খাবারের পেছনে সাধারণত পুষ্টিসংক্রান্ত তথ্য দেওয়া থাকে। তবে এসব তথ্য অনেক ক্ষেত্রেই জটিল হওয়ায় সাধারণ ভোক্তারা সহজে বুঝতে পারেন না। ফলে কোন খাবারে অতিরিক্ত চিনি, লবণ কিংবা সম্পৃক্ত চর্বি রয়েছে, তা বুঝে খাবার বেছে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
এ সমস্যা সমাধানে খাদ্য প্যাকেটের সামনের অংশে সহজ ও স্পষ্ট সতর্কতামূলক লেবেল বা ফ্রন্ট-অফ-প্যাকেজ লেবেলিং (এফওপিএল) চালুর ওপর গুরুত্ব দেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। খাবারের প্যাকেটেই স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়ে সতর্কবার্তা থাকলে ভোক্তারা কেনার সময় সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন বলে মনে করেন তারা।
ওয়েবিনারে জানানো হয়, খাদ্য প্যাকেটে সতর্কতামূলক লেবেল বাধ্যতামূলক করতে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে ‘নিরাপদ খাদ্য (মোড়কাবদ্ধ খাদ্য লেবেলিং) প্রবিধানমালা, ২০২৬’-এর খসড়া তৈরি করেছে। তবে খসড়াটি এখনও চূড়ান্ত হয়নি। বর্তমানে এটি খাদ্য মন্ত্রণালয়ে রয়েছে।
বক্তাদের অভিযোগ, খাদ্যশিল্পের দেশি-বিদেশি বিভিন্ন অংশীজনের চাপের কারণে প্রবিধানমালাটি চূড়ান্ত করতে বিলম্ব হচ্ছে। বাধ্যতামূলক লেবেলিংয়ের পরিবর্তে স্বেচ্ছামূলক ব্যবস্থা চালু, বাস্তবায়নের সময় বাড়ানো, ছোট প্যাকেটকে ছাড় দেওয়া এবং সতর্কবার্তার পরিবর্তে কম দৃশ্যমান লেবেল ব্যবহারের মতো দাবি জানানো হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তির বিষয়টিও সামনে আনা হচ্ছে।

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শোয়েব বলেন, ‘খসড়াটি বর্তমানে খাদ্য মন্ত্রণালয়ে রয়েছে। আমরা ইতোমধ্যে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে দিয়েছি এবং ব্যবসায়িক সংগঠনগুলোর সঙ্গেও কাজ করছি। আশা করছি এটি দ্রুত গেজেট আকারে প্রকাশ করা সম্ভব হবে।’
দেশে অসংক্রামক রোগে মৃত্যুর বিষয়টি তুলে ধরে জনস্বাস্থ্যবিদ ও রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘দেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশ ঘটে বিভিন্ন অসংক্রামক রোগে, যার অন্যতম কারণ অনিরাপদ খাদ্য গ্রহণ। বাধ্যতামূলক এফওপিএল খাদ্যজনিত অসংক্রামক রোগ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। তাই কোম্পানির হস্তক্ষেপমুক্ত থেকে খসড়া প্রবিধানমালাটি দ্রুত চূড়ান্ত করতে হবে।’
ব্র্যাক জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথের অ্যাসোসিয়েট সায়েন্টিস্ট আবু আহমেদ শামীম বলেন, ‘প্যাকেটজাত অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের প্রকৃত পুষ্টিমান ও সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে ভোক্তাদের স্পষ্ট ধারণা দিতে সতর্কীকরণভিত্তিক এফওপিএল সবচেয়ে বেশি কার্যকর।’
গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটরের বাংলাদেশ কান্ট্রি লিড মুহাম্মাদ রূহুল কুদ্দুস বলেন, খাদ্য প্যাকেটে সতর্কতামূলক লেবেল চালু করা গেলে স্বাস্থ্য ব্যয় কমবে। পাশাপাশি অসংক্রামক রোগে অকালমৃত্যু কমানোর সঙ্গে সম্পর্কিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ৩.৪ নম্বর লক্ষ্য অর্জনও সহজ হবে।
দৈনিক ইত্তেফাকের চিফ রিপোর্টার এম শামসুদ্দীন আহমেদ বলেন, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় খাদ্য প্যাকেটে সতর্কতামূলক লেবেল চালু করা একটি কার্যকর পদক্ষেপ। এ-সংক্রান্ত খসড়া প্রবিধানমালা দ্রুত চূড়ান্ত করতে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ওয়েবিনারে আরও বক্তব্য দেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রোগ্রাম অফিসার (খাদ্যাভ্যাসজনিত ঝুঁকি) সামিনা ইসরাত এবং ভাইটাল স্ট্র্যাটেজিসের কনসালটেন্ট আমিনুল ইসলাম সুজন।
প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়েরের সভাপতিত্বে এবং কো-অর্ডিনেটর মাশিয়াত আবেদিনের সঞ্চালনায় ওয়েবিনারে বিষয়ভিত্তিক উপস্থাপনা তুলে ধরেন প্রতিষ্ঠানটির প্রোগ্রাম অফিসার শবনম মোস্তফা। এতে নাগরিক সমাজ, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা, যুবসমাজ ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।
উল্লেখ্য, আগামীকাল শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) বিশ্ব খাদ্য দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘ইনোভেট টুডে, নারিশ টুমরো’।
এমএইচ/এসআই