নিজস্ব প্রতিবেদক
০৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৪৫ পিএম
ঢাকার জনসংখ্যা, যোগাযোগ, আবাসন, পয়োনিষ্কাশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবহনসহ বিভিন্ন খাতকে সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় না আনলে রাজধানীকে বাসযোগ্য করা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রিয়াজুল ইসলাম।
তিনি বলেন, কাগজে-কলমে পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবে তার যথাযথ প্রয়োগ না হওয়াই ঢাকার অন্যতম বড় সমস্যা।
বুধবার (৭ অক্টোবর) রাজধানীর বনানীর একটি পাঁচ তারকা হোটেলে আয়োজিত এক সেমিনারে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
রাজউক চেয়ারম্যান বলেন, ‘ঢাকা শহর, নারায়ণগঞ্জ ও আশপাশের এলাকার প্রকৃত জনসংখ্যা কত, সেটিই আমরা সঠিকভাবে জানি না। কেউ বলেন এক কোটি, কেউ বলেন দুই কোটি। কিন্তু পরিকল্পনা করার জন্য প্রকৃত সংখ্যা জানা জরুরি। প্রতিদিন মানুষ ঢাকায় আসছে এবং তাদের একটি বড় অংশ বস্তিতে বসবাস করছে। ঢাকায় মানুষের প্রবেশ ঠেকানো না গেলে শুধু আইন করে বস্তি ঠেকানো সম্ভব নয়।’
তিনি বলেন, বাংলাদেশের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই ঢাকার পরিকল্পনা করতে হবে। ইউরোপ, আমেরিকা বা অস্ট্রেলিয়ার মডেল সরাসরি বাংলাদেশে প্রয়োগ করলে হবে না। কারণ তাদের পর্যাপ্ত জমি, শিক্ষা ও নাগরিক সুবিধা রয়েছে। আমাদের বাস্তবতা ভিন্ন। তাই অন্তত এমন একটি ঢাকা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে মানুষ ন্যূনতম নাগরিক সুবিধা নিয়ে বাস করতে পারে।
রাজউকের দায়িত্ব সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘অনেকে মনে করেন রাজউকই ঢাকার সবকিছুর দায়িত্বে। কিন্তু যোগাযোগ, স্বাস্থ্য, পয়োনিষ্কাশন, শিক্ষা ও গণপরিবহন আলাদা আলাদা কর্তৃপক্ষ ও মন্ত্রণালয়ের অধীনে। তাই শুধু রাজউকের একার পক্ষে স্মার্ট বা বাসযোগ্য ঢাকা তৈরি করা সম্ভব নয়।’
রাজউকের অন্যতম প্রধান কাজ বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা বা ড্যাপ প্রণয়ন উল্লেখ করে রিয়াজুল ইসলাম বলেন, ‘কাগজে-কলমে ড্যাপ অত্যন্ত ভালো একটি পরিকল্পনা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনেক ক্ষেত্রে কাজী সাহেবের গরু কেতাবে আছে, গোয়ালে নেই। ড্যাপে যেসব জায়গাকে জলাশয় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, সেখানেও অবৈধ ভবন গড়ে উঠেছে। এসব সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।’
জাপানের নগর পরিকল্পনার উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, গত বছর মে মাসে রাজউকের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি জাপানে পরিবহনকেন্দ্রিক নগর উন্নয়ন বিষয়ে প্রশিক্ষণে অংশ নেন। জাপান ১৯৫০ সাল থেকে এ ধরনের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করলেও এখনো তাদের কাজ শেষ হয়নি।
তিনি বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে তাদের বড় পার্থক্য হলো, আমরা পাঁচ বছর শিখি, কিন্তু বাস্তবায়ন করতে ২৫ থেকে ৩০ বছর লাগিয়ে দিই। তারা ২০ বছর ধরে শিখে এবং অল্প সময়ের মধ্যে তা বাস্তবায়ন করে। আমরা বর্তমানে গাবতলী ও উত্তরায় পরিবহনকেন্দ্রিক নগর উন্নয়ন নিয়ে কাজ শুরু করেছি।’
ঢাকার বাসযোগ্যতা নিয়ে রাজউক চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমাদের দেশের বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে চিন্তা করতে হবে। বাসযোগ্য শহরের তালিকায় আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো আইন না মানার প্রবণতা। আমরা কেউই আইন মানতে চাই না।’
নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, রাজউকে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বিভিন্ন ধরনের অন্যায় আবদারের মুখোমুখি হতে হয়। এমনকি অনেক শিক্ষিত প্রকৌশলী ও পেশাজীবী নিজেদের ভবনের নকশার বিচ্যুতি মেনে নেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। অথচ অন্যের ক্ষেত্রে তারাই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। তদন্তে গিয়ে অনেক সময় দেখা যায়, অভিযোগকারীর নিজের ভবনেই বেশি বিচ্যুতি রয়েছে।
বর্তমান সরকারের উদ্যোগের কথা তুলে ধরে রিয়াজুল ইসলাম বলেন, গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী নিয়মিতভাবে লেক ব্যবস্থাপনা, বর্জ্য অপসারণ, যানজট নিরসন ও অবৈধ ফুটপাত উচ্ছেদসহ বিভিন্ন বিষয়ে বৈঠক করছেন। এসব সমস্যা সমাধানে সরকার কাজ করছে।
জমির মালিক ও আবাসন ব্যবসায়ীদের অংশীদারিত্বের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘২০-২৫ বছর আগে জমির মালিক ৪০ শতাংশ এবং ডেভেলপার ৬০ শতাংশ পেতেন। পরে তা ৫০-৫০ হয়েছে। একপর্যায়ে সাইনিং মানির মাধ্যমে ডেভেলপাররা ৬০ শতাংশ পর্যন্ত নেওয়া শুরু করেন। আমার মতে, যুক্তিসংগত অনুপাত হওয়া উচিত ডেভেলপার ৬০ শতাংশ এবং জমির মালিক ৪০ শতাংশ। এতে ব্যবসায়িক ভারসাম্য ও সঠিক পরিকল্পনা বজায় রাখা সম্ভব।’
রাজউকের জনবল সংকটের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, রাজউকের মোট কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রায় ১ হাজার ২০০ জন। এর মধ্যে পরিদর্শক রয়েছেন প্রায় ৮০ জন। এই সীমিত জনবল দিয়ে পুরো ঢাকা শহরের বিশাল জনসংখ্যা ও আবাসিক ভবনগুলোর নির্মাণকাজ নিয়মিত তদারকি করা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, ‘পৃথিবীর কোথাও পুলিশিং করে বাড়িঘর নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। রাজউক নকশা অনুমোদন করে। কিন্তু ভবনের মালিক বা ডেভেলপার নকশা অনুযায়ী নির্মাণ করছেন কি না, সেটি নিশ্চিত করার দায়িত্ব তাদের নিজেদেরও নিতে হবে।’
পরিবেশবান্ধব ও টেকসই আবাসন উৎসাহিত করতে বিভিন্ন সুবিধা দেওয়ার কথা জানিয়ে রাজউক চেয়ারম্যান বলেন, সবুজ ভবন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক আবাসনের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত নির্মাণ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। তিন কাঠা জমিতে অতিরিক্ত ১ হাজার বর্গফুট, পাঁচ কাঠায় ১ হাজার ৮০০ বর্গফুট এবং ১০ কাঠায় ৩ হাজার ৬০০ বর্গফুট পর্যন্ত অতিরিক্ত নির্মাণের সুযোগ রাখা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ভবনের নকশায় সৌর প্যানেল স্থাপনের বিষয়টি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এটি না থাকলে নকশা অনুমোদন দেওয়া হবে না। পাশাপাশি ভবনে ১০ শতাংশ সবুজায়নের শর্তও রাখা হয়েছে।
পোড়া ইটের ব্যবহার কমানোর উদ্যোগের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, সরকারি ভবনে পোড়া ইটের ব্যবহার প্রায় শূন্যে নামিয়ে এনে শতভাগ কংক্রিট ব্লক ব্যবহারের দিকে যাওয়া হচ্ছে। সাধারণ আবাসন প্রকল্পেও পোড়া লাল ইটের পরিবর্তে কংক্রিট ব্লকের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ভূমিকম্পের ঝুঁকি মোকাবিলায় নেওয়া উদ্যোগ সম্পর্কে রিয়াজুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ আর্থকোয়েক সেফটি অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের জন্য রাজউক ভবনের পাশের জমি বিনামূল্যে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ৫ কোটি টাকা অনুদান দিয়ে কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। ভবনের বিস্তারিত প্রকৌশলগত মূল্যায়নের ব্যয়ও সাধারণ মানুষের সাধ্যের মধ্যে নিয়ে আসার প্রয়োজন রয়েছে।
ভবন নির্মাণে নকশা অনুমোদন ও তদারকির ক্ষেত্রে নতুন ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, আগে শুধু স্থাপত্য নকশার ভিত্তিতে অনুমোদন নেওয়া যেত। এখন থেকে স্বীকৃত স্থপতি ও নকশা প্রকৌশলীদেরও নির্মাণকাজের দায়িত্ব নিতে হবে। নির্মাণকাজ নকশা অনুযায়ী হয়েছে কি না, তার প্রথম সনদও তাদের দিতে হবে।
তিনি বলেন, ‘নির্মাণকাজে অনিয়ম পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট স্থপতি বা প্রকৌশলীর পেশাগত সনদের ওপরও ঝুঁকি আসবে। একজন স্থপতি বা প্রকৌশলী যাতে মাসে শত শত নকশায় স্বাক্ষর করতে না পারেন, সে বিষয়েও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এ জন্য ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইইবি), ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টস বাংলাদেশ (আইএবি) এবং নগর পরিকল্পনাবিদদের সমন্বয়ে যৌথ কর্মশালা ও সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান রাজউক চেয়ারম্যান।
বণিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি বক্তব্য রাখেন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের।
এমআর/এআরএম