Dhaka Mail Logo

জাতীয়

উচ্ছেদের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ফের দখলে ঢামেকের ফুটপাত

মাহফুজুর রহমান

০১ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৩৫ পিএম

ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বহির্বিভাগ ও জরুরি বিভাগের আশপাশের ফুটপাত এখন হকার ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার দখলে। জানা গেছে, বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) উচ্ছেদ অভিযান শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ফুটপাত ও সড়কে ফের দোকানপাট বসে। ফলে হাসপাতালের গেটে রোগী ও স্বজনদের চলাচলের জায়গা নেই। তৈরি হচ্ছে যানজট ও চরম ভোগান্তি। 

বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) সরেজমিনে দেখা গেছে, ঢামেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগের গেট থেকে নতুন ভবন এবং চানখারপুলমুখী সড়ক ও ফুটপাতের বিভিন্ন অংশে আবারও হকারদের দোকান বসেছে। কোথাও ফল, কোথাও জুস, চা, সিগারেট, সুপ ও পানি বিক্রি হচ্ছে। এর সঙ্গে রয়েছে ভাত-তরকারি, পরোটা, রুটি-কলা, কাপড়, প্রসাধনী ও মোবাইল রিচার্জের দোকান। নতুন ভবনের সামনে ঠেলাগাড়িতে সাজিয়ে রাখা হয়েছে ডাব, কমলালেবু, ডালিম, আপেল, আনারস ও আঙুর।

হাসপাতালে আসা রোগী ও স্বজনদের প্রয়োজনকে কেন্দ্র করেই মূলত এসব দোকান গড়ে উঠেছে। ফলে দোকানগুলোর সামনে সারাক্ষণ ক্রেতাদের ভিড় থাকছে। ফুটপাতের জায়গা দখল হয়ে যাওয়ায় অনেককে বাধ্য হয়ে মূল সড়ক দিয়ে হাঁটতে হচ্ছে। এতে একদিকে পথচারীদের চলাচলে সমস্যা হচ্ছে, অন্যদিকে যানবাহন চলাচলেও তৈরি হচ্ছে বিশৃঙ্খলা।

6

বিশেষ করে হাসপাতালের বহির্বিভাগের গেটের সামনে পরিস্থিতি আরও জটিল। একদিকে ফুটপাতজুড়ে দোকানপাট, অন্যদিকে সড়কের পাশে সারি করে রাখা হয়েছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। মাঝের সরু অংশ দিয়ে রোগী ও স্বজনদের চলাচল করতে হচ্ছে। অনেক সময় রোগী নিয়ে আসা রিকশা বা অ্যাম্বুলেন্সকে ভিড় ঠেলে এগোতে দেখা যায়।

হাসপাতালের জরুরি বিভাগের প্রবেশপথের আশপাশেও রয়েছে চা-সিগারেট, সুপ, কাটা ফল ও ঠান্ডা পানির দোকান। একটু সামনে গরম ভাত-তরকারি ও পরোটার দোকানে বসে খাবার খাচ্ছেন রোগীর স্বজনেরা। কোথাও আবার রাতে হাসপাতালে থাকা স্বজনদের জন্য পাটি ও লুঙ্গি বিক্রি করা হচ্ছে। এসব দোকানের ক্রেতাদের ভিড়েও সংকুচিত হয়ে পড়ছে চলাচলের জায়গা।

হাসপাতালসংলগ্ন সড়কের একটি অংশে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা পার্কিং করে রাখায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে। যাত্রী ওঠানামা ও অপেক্ষার কারণে সড়কের একটি বড় অংশ কার্যত আটকে থাকছে। এর সঙ্গে দোকান ও ক্রেতাদের ভিড় যুক্ত হওয়ায় যানবাহন চলাচলের জায়গা আরও কমে যাচ্ছে।

এলাকাটিতে বিক্রেতাদের হাঁকডাক, রিকশার হর্ন ও মানুষের ভিড়ে সারাক্ষণ ব্যস্ততা দেখা যায়। হাসপাতালের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল এলাকায় এ ধরনের পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছেন গুরুতর অসুস্থ রোগী, বয়স্ক ব্যক্তি ও তাঁদের স্বজনেরা।

হাসপাতালে রোগী নিয়ে আসা এক স্বজন বলেন, রোগী নিয়ে দ্রুত হাসপাতালে ঢুকতে হয়। কিন্তু গেটের সামনে এসে দেখা যায়, হাঁটার জায়গাও নেই। দোকান ও রিকশার কারণে কয়েক মিনিটের পথ যেতে অনেক সময় লাগে।

পথচারী সুজন বলেন, উচ্ছেদ অভিযান হওয়ার পর মনে হয়েছিল এবার হয়তো জায়গাটা খালি থাকবে। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পরই আবার দোকান বসে গেছে। নিয়মিত ব্যবস্থা না নিলে এভাবে উচ্ছেদ করে কোনো লাভ হবে না।

হকার জুবায়ের বলেন, তাঁরা গরিব মানুষ। অভিযান হলে কিছুক্ষণ দোকান সরিয়ে রাখেন। কিন্তু অন্য কোথাও বসার জায়গা নেই। তাই সুযোগ পেলেই আবার এখানে ফিরে আসেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, শুধু উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। অভিযান শেষ হওয়ার পর নিয়মিত তদারকি না থাকায় অল্প সময়ের মধ্যেই হকাররা আবার ফুটপাত দখল করে নিচ্ছেন। একই সঙ্গে সড়কের পাশে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা পার্কিং বন্ধ না করায় উচ্ছেদের সুফলও স্থায়ী হচ্ছে না।

5

তবে উচ্ছেদের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ফের ফুটপাত দখলের ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে, অভিযান শেষে দখল ঠেকাতে নিয়মিত নজরদারি ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা কতটা রয়েছে। হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ ও সড়ক দীর্ঘমেয়াদে দখলমুক্ত রাখতে শুধু অভিযান নয়, হকার ও অটোরিকশা পার্কিং নিয়ন্ত্রণে স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

এ বিষয়ে নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, হাসপাতালের বাইরের এই জায়গাগুলোতে শৃঙ্খলা আনা দরকার। কোথায় কী বসবে, কারা বসতে পারবেন, কোনটি প্রয়োজনীয় আর কোনটি অপ্রয়োজনীয়—এসব বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকা প্রয়োজন। একইভাবে কতসংখ্যক রিকশা বা অন্যান্য যানবাহন সেখানে প্রবেশ করতে পারবে, দোকান থাকলে কোন ধরনের দোকান থাকবে এবং সংখ্যা কত হবে, সেসবও পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে।

তিনি বলেন, যেকোনো জায়গায় পরিকল্পনা ও নিয়মিত নজরদারি না থাকলে সেটি ধীরে ধীরে বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ক্ষেত্রেও একই বিষয় ঘটছে। এ অবস্থার পরিবর্তনে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও সিটি করপোরেশনকে সমন্বিতভাবে পুরো এলাকার জন্য একটি পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে।

আদিল মুহাম্মদ খান আরও বলেন, এই ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনার মাধ্যমে নির্দিষ্ট করতে হবে কোন এলাকা কী ব্যবহারের জন্য উপযুক্ত, কোন জায়গা কার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হবে এবং পুরো ব্যবস্থার নজরদারি কীভাবে হবে। পাশাপাশি নজরদারির দায়িত্বে কারা থাকবেন এবং নীতিমালা লঙ্ঘন হলে কী ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সেটিও স্পষ্ট থাকতে হবে।

তিনি বলেন, এ ধরনের পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা নিয়ে আমরা খুব একটা কাজ করতে দেখি না। যত দিন পর্যন্ত এভাবে কাজ শুরু না হবে, তত দিন ঢাকা মেডিকেলের বহির্বিভাগের মতো জায়গায় সমস্যাটি থেকেই যাবে। এখানে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ রোগী নিয়ে আসেন এবং বের হন। এমন গুরুত্বপূর্ণ ও জনসমাগমপূর্ণ এলাকায় শৃঙ্খলা না থাকলে নাগরিকেরা কাঙ্ক্ষিত সেবা পেতে সমস্যায় পড়বেন।

তিনি আরও বলেন, শুধু উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করলেই হবে না। স্থায়ীভাবে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পুরো এলাকার জন্য একটি পরিপূর্ণ পরিকল্পনা, নির্দিষ্ট ব্যবহারবিধি, ব্যবস্থাপনা ও নিয়মিত নজরদারি ব্যবস্থা প্রয়োজন।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হাসিবা খান বলেন, উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা তাঁদের দায়িত্বের অংশ। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে চিঠি দেওয়া হলে তাঁরা ম্যাজিস্ট্রেট ও সংশ্লিষ্ট জনবল নিয়ে সেখানে গিয়ে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করেন। কিন্তু উচ্ছেদের পর জায়গাটি দখলমুক্ত রাখার দায়িত্ব শুধু সিটি করপোরেশনের নয়।

4

তিনি বলেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ একটি পুরোনো ও বড় প্রতিষ্ঠান। তাদের নিজস্ব জনবল, নিরাপত্তাকর্মী ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী রয়েছে। হাসপাতালের গেট ও নিজস্ব সীমানার আশপাশে নিয়মশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং উচ্ছেদের পর জায়গাটি দখলমুক্ত রাখার ক্ষেত্রে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষেরও দায়িত্ব রয়েছে।

হাসিবা খান আরও বলেন, তাঁরা অভিযান চালিয়ে হকারদের সরিয়ে দেওয়ার পর যদি আবার তাঁরা এসে সেখানে বসেন, তাহলে জায়গাটি দখলমুক্ত রাখার জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকেও কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। কারণ শুধু উচ্ছেদ করে দিলেই হবে না; উচ্ছেদের পর জায়গাটি যাতে পুনরায় দখল না হয়, সে বিষয়েও নজরদারি প্রয়োজন।

তিনি বলেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজের নিজস্ব নিরাপত্তাব্যবস্থা রয়েছে। তাদের নিরাপত্তাকর্মী থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের জনবল আছে। তাই সিটি করপোরেশন যখন তাদের অনুরোধে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে, তখন পরবর্তী সময়ে জায়গাটি দখলমুক্ত রাখা ও নিয়মশৃঙ্খলা বজায় রাখতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষেরও সক্রিয়ভাবে দায়িত্ব পালন করা প্রয়োজন।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম ফরহাদ হোসেন বলেন, এটি একটি বড় ও জটিল বিষয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গেটের বাইরের এই জায়গায় সিটি করপোরেশন, পুলিশসহ একাধিক পক্ষ অংশীজন হিসেবে জড়িত। বিষয়টি নিয়ে বারবার উচ্ছেদ অভিযান চালানো হচ্ছে, কিন্তু অভিযান শেষ হওয়ার পর হকাররা আবার এসে বসছেন।

তিনি বলেন, ফুটপাত দখলের ক্ষেত্রে অন্যান্য জায়গায় যে পরিস্থিতি দেখা যায়, এখানেও অনেকটা একই চিত্র। সংশ্লিষ্টরা চেষ্টা করছেন, পুলিশও বিভিন্ন সময়ে অভিযান পরিচালনা করছে। কিন্তু সকালে উচ্ছেদ করলে বিকেলেই আবার হকাররা এসে বসে পড়ছেন। মিরপুর-১০ নম্বরের মতো জায়গাতেও এ ধরনের সমস্যা দেখা যায়।

ঢামেক পরিচালক আরও বলেন, এখানে অনেক অংশীজন রয়েছেন। জায়গাটি মূলত সিটি করপোরেশনের সড়ক ও ফুটপাতের আওতাভুক্ত। তাই বিষয়টির স্থায়ী সমাধানের জন্য সিটি করপোরেশন, পুলিশ এবং স্থানীয় সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে হবে।

এম/এআর