মোস্তফা ইমরুল কায়েস
২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৪০ এএম
# ব্যয় হয়েছে ২৮ কোটি ২৬ লাখ টাকা
# কাজ পেয়েছিল ভারতীয় প্রতিষ্ঠান আইপিই গ্লোবাল
# যেসব কারণে শেষ হয়নি প্ল্যানের কাজ
# চিহিৃত হয়েছিল ১ হাজার ৪০০ পর্যটন স্পট
# খসড়ায় ছিল পর্যটনের বিকাশের যাবতীয় তথ্য
# প্ল্যানের কাজ প্রকাশিত তথ্য দিয়ে সাজানো হয়েছিল দাবি ট্যুর অপারেটরদের
দেশের পর্যটন খাতকে পরিকল্পিত ও টেকসইভাবে এগিয়ে নিতে জাতীয় পর্যটন মহাপরিকল্পনা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল ২০১৯ সালে। সাত বছর পেরিয়ে গেলেও সেই পরিকল্পনার কাজ শেষ হয়নি। ফলে এখনো চূড়ান্ত করা যায়নি জাতীয় পর্যটন মহাপরিকল্পনা।
বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড (বিটিবি) এ মহাপরিকল্পনা তৈরির উদ্যোগ নেয়। এ কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয় ভারতীয় প্রতিষ্ঠান আইপিই গ্লোবালকে। জরিপ ও পরিকল্পনা তৈরির জন্য ব্যয় ধরা হয় ২৮ কোটি ২৬ লাখ টাকা। প্রতিষ্ঠানটি কাজ শেষে একটি খসড়া জমা দিলেও তা চূড়ান্ত হয়নি।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, ২০১৯ সালে কাজ শুরু হওয়ার পর ২০২০ সালে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হলে মাঠপর্যায়ের জরিপ ও পরামর্শ কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। ২০২৩ সালে তৎকালীন সরকার জানিয়েছিল, খসড়া প্রস্তুত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের অনুমোদনের পর এটি চূড়ান্ত করা হবে। এরপর এ বিষয়ে আর দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর সরকার পরিবর্তনের পরও মাস্টার প্ল্যানটি চূড়ান্ত হয়নি। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড জানায়, আগের তৈরি খসড়াটি পুনর্মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
কী আছে মাস্টার প্ল্যানে
২০১৯ সালে শুরু হওয়া এই পরিকল্পনায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা প্রায় ১ হাজার ৪০০ পর্যটন স্পট চিহ্নিত করা হয়। দেশের পর্যটন খাতকে সমৃদ্ধ করতে ২৫ বছরের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথাও বলা হয়েছে এতে।
খসড়ায় এসব পর্যটন স্পটে পর্যটক আকর্ষণের সম্ভাবনা পর্যালোচনা, পর্যটন এলাকার উন্নয়ন, নতুন পর্যটন পণ্য তৈরি, অবকাঠামো উন্নয়ন, বিনিয়োগ আকর্ষণ, বিপণন ও ব্র্যান্ডিং, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রস্তাব রয়েছে।
পরিকল্পনায় দেশের পর্যটন এলাকাগুলোকে বিভিন্ন পর্যটন ক্লাস্টার বা অঞ্চলে ভাগ করে উন্নয়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। আইপিই গ্লোবালের প্রকল্প-তথ্যে ৫১টি পর্যটন ক্লাস্টারের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে ২১টি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত এবং তিনটি আইকনিক ক্লাস্টার। পাশাপাশি ১০টি সমন্বিত পর্যটন বিনোদন অঞ্চল উন্নয়নের প্রস্তাব রয়েছে।
এসব অঞ্চলে শুধু পর্যটনকেন্দ্র তৈরি নয়, সড়ক যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, পানি, যোগাযোগব্যবস্থা, আবাসন, হোটেল-মোটেল, বিনোদন সুবিধা, নিরাপত্তা ও অন্যান্য পর্যটন-সহায়ক অবকাঠামো গড়ে তোলার প্রস্তাব করা হয়েছে।
দেশের পর্যটনের বিকাশে ২০০টি স্পটে যুক্তরাষ্ট্রের ১০২ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাবও রয়েছে।
বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে নীতিগত সংস্কার, ব্যবসা সহজ করা, পর্যটন বিপণন ও আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিংয়ের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে খসড়ায়। এতে ২০৪০ সালের মধ্যে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা প্রায় ৫৫ হাজার থেকে ৮ লাখে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সময়ে পর্যটন খাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান প্রায় ২ কোটি ১৯ লাখে নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
যে কারণে আটকে আছে
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, করোনাভাইরাস মহামারির কারণে মাঠপর্যায়ের জরিপ ও পরামর্শ কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হওয়া, প্রশাসনিক জটিলতা ও আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতার কারণে পরিকল্পনাটি নির্ধারিত সময়ে অনুমোদন পায়নি। পরে সরকার পরিবর্তনের পর খসড়াটি পুনরায় পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
২০২৫ সালে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড জানায়, আগে তৈরি খসড়াটি পুনর্মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। অংশীজনদের কেউ কেউ পরিকল্পনাটির তথ্যভিত্তি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
ট্যুর অপারেটরদের দাবি, খসড়াটি আগে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছিল। ফলে এতে নতুন পর্যটন স্পট, বিদ্যমান সমস্যা ও সম্ভাবনার অনেক কিছুই উঠে আসেনি। তাঁদের আপত্তির কারণেও খসড়াটি আটকে আছে বলে জানা গেছে।
মন্ত্রী ও পর্যটন বোর্ড যা বলছে
গত আগস্টে সংসদে মাস্টার প্ল্যান নিয়ে তথ্য তুলে ধরেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত। তিনি জানান, প্রায় ১ হাজার ৪৯৮টি পর্যটন কেন্দ্র চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলো নিয়ে একটি সমন্বিত পর্যটন মহাপরিকল্পনা চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। একই সঙ্গে জাতীয় পর্যটন নীতি-২০২৬ প্রণয়নের কাজও শুরু হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শনিবার রাতে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী ঢাকা মেইলকে বলেন, পর্যটন খাতকে সরকার অত্যন্ত অগ্রাধিকার দিচ্ছে। বিভিন্ন সরকারের সময়ে এ নিয়ে কাজ হয়েছে। সেগুলো পর্যটন খাতের ভিত্তি তৈরি করেছে।
তিনি বলেন, গবেষণার মাধ্যমে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ, পর্যটন স্পট চিহ্নিত করা, সেগুলোর সীমাবদ্ধতা ও সম্ভাবনা নির্ধারণ এবং কোথায় কী করা দরকার—এসব কাজ দীর্ঘ সময় ধরে হয়েছে। এখন সেগুলোকে একটি চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার কাজ চলছে। বাস্তবায়নের আগে কোনো পর্যালোচনা প্রয়োজন হলে সেটিও করা হবে। এরপর বিভিন্ন পর্যায়ে অনুমোদনের প্রক্রিয়া রয়েছে।
মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী বলেন, চলতি বছরেই সরকার মাস্টার প্ল্যানের কাজ শেষ করতে চায়। জাতীয় কাউন্সিলে অনুমোদন পাওয়া গেলে আগামী বছরের জানুয়ারি নাগাদ এর বাস্তবায়নের কাজ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, মাস্টার প্ল্যানের কাজ অনেক আগে শুরু হয়ে বিভিন্ন ধাপে সমৃদ্ধ হয়েছে। এখন চূড়ান্ত কাজটি করতে চায় সরকার। দেশের জিডিপিতে পর্যটন খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই অবদান ৬ থেকে ৭ শতাংশে নিয়ে যেতে মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়ন জরুরি।
এমআইকে/এআরএম