নিজস্ব প্রতিবেদক
১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৪২ পিএম
খসড়া সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এ থাকা বিভিন্ন বিধান জনগণের মৌলিক মানবাধিকার, বাক-স্বাধীনতা ও স্বাধীন মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে ব্যাপক ঝুঁকি তৈরি করবে বলে উদ্বেগ জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও অংশীজনদের মতামত এবং আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চার আলোকে খসড়াটি ঢেলে সাজানোর আহ্বানও জানিয়েছে সংস্থাটি।
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এমন প্রতিক্রিয়া জানানো হয়।
বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, খসড়ায় সাইবার অপরাধ, সাইবার সুরক্ষা ও জনগণের মতপ্রকাশের অধিকার সম্পর্কিত তিনটি জটিল বিষয় একটি আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এতে কোনো বিষয়েই যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। বরং বিভিন্ন বিধানের অপব্যাখ্যা ও অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করে মানবাধিকার লঙ্ঘনের আশঙ্কা তৈরি করা হয়েছে।
তিনি বলেন, সাইবার অপরাধের সঙ্গে সাইবার সুরক্ষার মতো বিশেষায়িত ক্ষেত্রকে একাকার করার পাশাপাশি সাইবার জগতে মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণের বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এসব বিষয় পরস্পর থেকে ভিন্ন এবং এ ধরনের আইনের আওতার বাইরে রাখা উচিত।
টিআইবি বলেছে, খসড়া আইন অনুমোদিত হলে বাংলাদেশের সাইবার পরিসর অবারিত নজরদারি ও জবাবদিহিহীনতার সুযোগ তৈরি করতে পারে। খসড়ায় গুজব, অপতথ্য, হেয়প্রতিপন্ন, মানহানিকর ও রাষ্ট্রের জন্য অবমাননাকরসহ বিভিন্ন ধারণার যে সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, সেগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে অপব্যাখ্যা করে প্রয়োগের সুযোগ তৈরি করতে পারে। এতে বিশেষ করে বাক-স্বাধীনতা ও মৌলিক মানবাধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
এ ছাড়া যৌন হয়রানি ও সেক্সটর্শন শব্দবন্ধের সংজ্ঞা যথাযথ ও পূর্ণাঙ্গ নয় বলেও মন্তব্য করেছে টিআইবি। সংস্থাটির মতে, এর ফলে প্রকৃত অপরাধ আড়ালে যাওয়ার পাশাপাশি অভিযুক্তের সুরক্ষা এবং ভুক্তভোগীর অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, খসড়া আইনের ৪৬(২) ধারায় অ-জামিনযোগ্য অপরাধ হিসেবে ২৩ ধারার উল্লেখ রয়েছে। ওই ধারায় দেশের অখণ্ডতা, নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষার পাশাপাশি বৈদেশিক কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এবং বৈদেশিক কোনো রাষ্ট্র বা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সুবিধার্থে বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এসব বিষয়ের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যার ঘাটতি থাকায় প্রয়োগের ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনদের ইচ্ছামতো ব্যাখ্যার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এর মাধ্যমে ভিন্নমত ও বাক্-স্বাধীনতা হুমকির মুখে পড়তে পারে।
জাতীয় সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিলের প্রস্তাব নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে টিআইবি। সংস্থাটি বলেছে, প্রধানমন্ত্রীসহ ২৮ সদস্যের সমন্বয়ে কাউন্সিল গঠনের প্রস্তাব করা হলেও বেসরকারি পর্যায়ের তথ্যপ্রযুক্তি বা মানবাধিকারবিষয়ক বিশেষজ্ঞ হিসেবে মাত্র দুজনকে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। ওই দুজনও সরকার মনোনীত করবে। ফলে কাউন্সিল সরকারের সরাসরি কর্তৃত্বাধীন হয়ে আইনের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ব্যাখ্যা ও যথেচ্ছ প্রয়োগের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে স্বাধীন ও দলনিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনে সক্ষম সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে জাতীয় সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিল গঠন করা প্রয়োজন। স্বাধীন ও নিরপেক্ষ কাউন্সিল গঠন সাপেক্ষে বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা সরকারের পরিবর্তে কাউন্সিলের ওপর ন্যস্ত করারও প্রস্তাব দেন তিনি।
এ ছাড়া কাউন্সিলের সদস্যসহ আইনের অধীনে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সরল বিশ্বাসে করা কাজের জন্য ফৌজদারি ও দেওয়ানি মামলা থেকে দায়মুক্তির প্রস্তাবেরও সমালোচনা করেছে টিআইবি। সংস্থাটির মতে, এ ধরনের দায়মুক্তি আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান এই মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
টিআইবি বলেছে, ক্ষমতাসীন দল বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে সব নাগরিকের সাইবার সুরক্ষার অঙ্গীকার করা হয়েছে। সেই অঙ্গীকারের আলোকে সংশ্লিষ্ট অংশীজন ও বিশেষজ্ঞদের মতামত এবং আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় সংশোধন, সংযোজন ও বিয়োজনের মাধ্যমে খসড়া আইনটি ঢেলে সাজানো প্রয়োজন।
এএইচ/এএম