মো. মেহেদী হাসান হাসিব
০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৪১ পিএম
চলতি মাসেই ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করার মধ্য দিয়ে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচন শুরু করতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ইতোমধ্যে স্থানীয় সরকারের পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের আচরণবিধি চূড়ান্ত করে প্রকাশ করেছে ইসি। যেখানে সব প্রার্থীর জন্য সবকিছু সমান থাকলেও প্রচারণার ক্ষেত্রে বিলবোর্ড ব্যবহারে রয়েছে অসমতা। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের সাধারণ সদস্যরা প্রচারণার ক্ষেত্রে একটির বেশি বিলবোর্ড ব্যবহার করতে পারবেন না।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য তৈরি করা আচরণবিধি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কোনো প্রার্থী ওয়ার্ডপ্রতি একটির বেশি বিলবোর্ড ব্যবহার করতে পারবেন না। পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের ক্ষেত্রেও একই বিধান রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে, উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের জন্য প্রতি ইউনিয়ন বা পৌরসভায় একটি অথবা সমগ্র নির্বাচনি এলাকায় ২০টি— এ দুটির মধ্যে যেটি বেশি হবে, সেই পরিমাণ বিলবোর্ড প্রচারের কাজে ব্যবহার করতে পারবেন প্রার্থীরা। আবার জেলা পরিষদ নির্বাচনে কোনো প্রার্থী প্রতি থানা অথবা উপজেলায় একটির বেশি বিলবোর্ড ব্যবহার করতে পারবেন না।
ইসির প্রকাশ করা সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের আচরণবিধি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রচারণার ক্ষেত্রে একজন প্রার্থী ওয়ার্ডপ্রতি একটির বেশি বিলবোর্ড ব্যবহার করতে পারবেন না। এক্ষেত্রে একজন মেয়র প্রার্থী কিংবা চেয়ারম্যান প্রার্থী প্রতি ওয়ার্ডে একটি করে বিলবোর্ড ব্যবহার করতে পারবেন। কিন্তু যারা সাধারণ সদস্য কিংবা কাউন্সিলর পদপ্রার্থী, তারা নিজ ওয়ার্ডে একটির বেশি বিলবোর্ড ব্যবহার করতে পারবেন না। অন্যদিকে, সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর পদে যারা নির্বাচন করবেন, তারাও একটি ওয়ার্ডে একটির বেশি বিলবোর্ড ব্যবহার করতে পারবেন না।
এ বিষয়ে কথা হলে ইসির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, স্থানীয় নির্বাচনে পরিষদের সদস্য হতে চাইলে তাকে একটি নির্দিষ্ট ওয়ার্ড থেকে নির্বাচন করতে হয়। এখন আচরণবিধি অনুযায়ী, যে ব্যক্তি সাধারণ সদস্য পদে নির্বাচন করছেন, তিনি ওই ওয়ার্ডে একটির বেশি বিলবোর্ড লাগাতে পারবেন না। কিন্তু যিনি মেয়র পদে নির্বাচন করছেন, তিনি যদি প্রতি ওয়ার্ডে একটি করে বিলবোর্ড ব্যবহার করেন, তাহলে তার পুরো নির্বাচনি এলাকা কাভার হয়ে যাবে। এক্ষেত্রে একজন সাধারণ সদস্যের নির্বাচনি এলাকা ছোট হলেও তার পুরো এলাকা কাভার করার জন্য একটি বিলবোর্ড যথেষ্ট নয়। তবে প্রচারণার অন্যান্য সবকিছু একই থাকবে।
তিনি আরও বলেন, এখানে প্রচারণা সীমিত না দেখে আপনি অন্যদিক দেখতে পারেন। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থীর সংখ্যা অনেক থাকে। সবাই যদি একাধিক বিলবোর্ড ব্যবহার করতে থাকেন, তাহলে সাধারণ জনগণের চলাচলে সমস্যা তৈরি হবে। এ ছাড়া বিলবোর্ড লাগানো নিয়ে বিশৃঙ্খলাও সৃষ্টি হতে পারে। এসব কথা চিন্তা করে আমরা ওয়ার্ডপ্রতি একটি করে রেখেছি।
অন্যদিকে, বিলবোর্ড ব্যবহারের ক্ষেত্রে অন্যান্য যেসব বিধিনিষেধ রয়েছে, তা সব ক্ষেত্রেই একই রকম। যেমন: বিলবোর্ডের আকার ১৬ ফুট বাই ৯ ফুট হতে হবে। বিলবোর্ড স্থাপনে কোনোভাবেই জনসাধারণের বা যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করা যাবে না কিংবা পরিবেশের ক্ষতি বা নিরাপত্তা বিঘ্নিত করা যাবে না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ ঢাকা মেইলকে বলেন, বিষয়টি আমি দেখেছি। ইউনিয়ন পরিষদ কিংবা পৌরসভার ওয়ার্ডের চেয়ে সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ডগুলো বড় হয়। এক্ষেত্রে সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ডগুলোতে দুটি করে রাখা গেলে ভালো হতো। কিন্তু আমরা যেহেতু চূড়ান্ত করে ফেলেছি, নতুন করে আচরণবিধিমালা আর পাঠাব না।
কাউন্সিলর কিংবা মেম্বার পদপ্রার্থীদের প্রচারণা সীমিত হলো কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, একটু তো সীমিত হয়েছে। আচরণবিধি চূড়ান্ত হয়ে এসেছে। এখন আমরা আচরণবিধি আর পাঠাব না।
ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আচরণবিধিতে আরও যা আছে—
এনআইডি ও মোবাইল নম্বর সংগ্রহে নিষেধাজ্ঞা
নির্বাচনি আচরণবিধির সংশ্লিষ্ট ধারায় বলা হয়েছে, কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর পক্ষে বা বিপক্ষে ভোটারদের প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে কেউ কোনো ধরনের বলপ্রয়োগ বা অর্থ ব্যয় করতে পারবেন না। একই সঙ্গে ভোটার বা তার পরিবারের সদস্যদের ব্যক্তিগত এনআইডি নম্বর সংগ্রহ করা যাবে না। এমএফএসে লেনদেনের উদ্দেশ্যেও ভোটার কিংবা তার পরিবারের সদস্যদের মোবাইল নম্বর সংগ্রহের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। ফলে ভোটারকে প্রভাবিত করার জন্য অর্থের ব্যবহার কিংবা ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করে আর্থিক লেনদেনের ব্যবস্থা করার সুযোগ থাকছে না। বিধানটিতে ভোটারের পাশাপাশি তার পরিবারের সদস্যদের তথ্য সংগ্রহের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
ধর্মীয় ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রচারণা নয়
আচরণবিধিতে মসজিদ, মন্দির, ক্যায়াং, প্যাগোডা, গির্জা বা অন্য কোনো ধর্মীয় উপাসনালয়ে নির্বাচনি প্রচারণা চালানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একইভাবে কোনো সরকারি অফিস বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোনো ধরনের নির্বাচনি প্রচারণা চালানো যাবে না। তবে শিক্ষা কার্যক্রমে কোনো ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি না করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠ ব্যবহার করা যাবে।
নাগরিক সম্পত্তির ক্ষতি করা যাবে না
নির্বাচন উপলক্ষে কোনো নাগরিকের জমি, ভবন বা অন্য কোনো স্থাবর কিংবা অস্থাবর সম্পত্তির ক্ষতিসাধন করা যাবে না। অনভিপ্রেত গোলযোগ বা উচ্ছৃঙ্খল আচরণের মাধ্যমে কারও শান্তি বিনষ্ট করার ওপরও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
ভোটারকে প্রভাবিত করতে বলপ্রয়োগ ও অর্থ ব্যয় নিষিদ্ধ
কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর পক্ষে বা বিপক্ষে ভোটারদের প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে বলপ্রয়োগ কিংবা অর্থ ব্যয় করা যাবে না। অর্থাৎ ভোট আদায়ের জন্য সরাসরি অর্থের ব্যবহার যেমন নিষিদ্ধ, তেমনি ভয়ভীতি বা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমেও ভোটারকে প্রভাবিত করা যাবে না।
ভোটকেন্দ্রে অস্ত্র ও বিস্ফোরক নিষিদ্ধ
কমিশনের অনুমোদিত ব্যক্তি ছাড়া অন্য কেউ ভোটকেন্দ্রের নির্ধারিত সীমানার মধ্যে বিস্ফোরক, বিস্ফোরক দ্রব্য, অস্ত্র ও গোলাবারুদ বহন করতে পারবেন না। এক্ষেত্রে প্রচলিত বিস্ফোরক ও অস্ত্র সংক্রান্ত আইনে সংজ্ঞায়িত সামগ্রী নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকবে।
মাইক ব্যবহারের সময় ও শব্দসীমা
ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি মাইক ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। জেলা পরিষদ নির্বাচনে কোনো সংখ্যা নির্দিষ্ট করা হয়নি। আর উপজেলা নির্বাচনের ক্ষেত্রে উপজেলার অধীন একটি ইউনিয়ন বা পৌরসভায় একই সময়ে পথসভা বা নির্বাচনি প্রচারণার কাজে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী বা তার পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি, সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান একটির বেশি মাইক বা শব্দের মাত্রা বর্ধনকারী যন্ত্র ব্যবহার করতে পারবেন না।
নির্বাচনি এলাকায় দুপুর ১২টার আগে এবং সূর্যাস্তের পর মাইক বা শব্দের মাত্রা বর্ধনকারী যন্ত্র ব্যবহার করে প্রচারণা চালানো যাবে না। প্রচারে ব্যবহৃত মাইক বা শব্দবর্ধনকারী যন্ত্রের শব্দের মাত্রা ৬০ ডেসিবেলের বেশি হতে পারবে না।
সরকারি কর্মকর্তা ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের প্রচারে নিষেধাজ্ঞা
নির্বাচনপূর্ব সময়ে অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এবং সরকারি বা সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা নির্বাচনি এলাকায় প্রচারণা বা নির্বাচনি কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবেন না। আচরণবিধিতে তাদের নির্বাচনি প্রচারণায় অংশগ্রহণের ওপর সরাসরি নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
সেপ্টেম্বরে তফসিল, ভোট নভেম্বরে
চলতি মাসের শেষের দিকে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে নভেম্বর মাসে ভোটগ্রহণের পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
সম্প্রতি প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেছেন, নির্বাচনের সার্বিক প্রস্তুতি নিয়ে যেতে সচিবকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে তফসিল ঘোষণা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নির্বাচন কমিশন মাঠে নামতে পারে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সমন্বয়ের জন্যও সংশ্লিষ্ট কমিশনারকে কাজ শুরু করতে বলা হয়েছে।
তফসিলের সময় নিয়ে সিইসি বলেন, আমার মনে হয়, আমরা সেপ্টেম্বরের মধ্যে একটা তফসিল দিতে পারব। তবে নির্বাচন আয়োজনের সময় নির্ধারণে দুর্গাপূজা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরীক্ষা, আইনগত সময়সীমাসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করতে হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, এটা নিশ্চিত যে আমাদের এই বছরের মধ্যে শুরু করতে হবে। আইনি বিষয় আছে এখানে। এই বছরের মধ্যে শুরু করতে হবে।
ইউনিয়ন পরিষদের রোডম্যাপে বলা হয়েছে, ২০২১-২২ অর্থবছরের আগে ২৮৯টি ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে তিন হাজার ৯৮১টি, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১১০টি এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৯২টি ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। মামলা, সীমানা-জটিলতাসহ নানা কারণে দীর্ঘদিন ধরে ১০৮টি ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন হয়নি। দেশে মোট ইউনিয়ন পরিষদ চার হাজার ৫৮০টি। এর মধ্যে চলতি বছরেই তিন হাজার ৯৮১টি নির্বাচন উপযোগী হবে। বাকিগুলো ২০২৭ ও ২০২৮ সালের দিকে নির্বাচন উপযোগী হবে।
পৌরসভার রোডম্যাপ অনুযায়ী, দেশের মোট ৩৩০টি পৌরসভার মধ্যে ৩২০টি নির্বাচন উপযোগী। আইনি জটিলতার কারণে ১০টি পৌরসভা এখনো নির্বাচন উপযোগী নয়।
উপজেলা পরিষদের রোডম্যাপ থেকে জানা যায়, নতুন পাঁচটি উপজেলাসহ দেশে মোট উপজেলা ৫০০টি। কোনো উপজেলাতেই নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকায় সব উপজেলাই নির্বাচন উপযোগী।
রোডম্যাপ অনুযায়ী, নতুন সিটি করপোরেশন বগুড়াসহ ১৩টি সিটি করপোরেশনের কোনোটিতেই নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকায় সব সিটিই নির্বাচন উপযোগী।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হলে ৬১টি জেলা পরিষদ ভেঙে দিয়ে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। পরে বিএনপি সরকার গঠনের পর ধাপে ধাপে ৫৬টি জেলা পরিষদে নতুন প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। বর্তমানে পৌরসভাগুলোও প্রশাসকের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। শুধু ইউনিয়ন পরিষদগুলোতেই নির্বাচিত প্রতিনিধিরা দায়িত্ব পালন করছেন।
এমএইচএইচ/এফএ