Dhaka Mail Logo

জাতীয়

জ্বালানি সংকট সমাধানের রূপরেখা তুলে ধরলেন প্রতিমন্ত্রী অমিত

নিজস্ব প্রতিবেদক

০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৫৫ এএম

বিদ্যমান জ্বালানি সংকট ২০৩০ সালের মধ্যে সমাধানে দীর্ঘ, মধ্য ও স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে সরকার কাজ করছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানো, বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু, দেশ-বিদেশে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান, বাপেক্সকে শক্তিশালী করা এবং পরিশোধন সক্ষমতা বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন উদ্যোগের কথা সংসদে তুলে ধরেছেন তিনি।

সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের দেশের জ্বালানি সংকট নিয়ে উত্থাপিত আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রতিমন্ত্রী সরকারের এসব পরিকল্পনার কথা জানান। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় দ্রুত প্রায় ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।

বিদ্যুৎ সংকট কমাতে চলতি সপ্তাহ থেকেই ৬৬০ মেগাওয়াটের রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় পাঁচটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মাধ্যমে এ সপ্তাহ থেকে আরও ৫৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রে কোনো ক্যাপাসিটি চার্জ প্রযোজ্য হবে না বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।

দেশে বর্তমানে গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে বলে সংসদে জানান অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।

তিনি বলেন, দেশে বছরে গ্যাসের চাহিদা ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে বর্তমানে উৎপাদন হচ্ছে ২ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট। প্রতি বছর গ্যাসের চাহিদা প্রায় ১০ শতাংশ হারে বাড়ছে। ফলে বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট ঘাটতি রয়েছে।

সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে ২০৩০ সালের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে প্রায় ২ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

সমুদ্রসীমায় তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোকে যুক্ত করার উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, ২০১২ সালের ১৪ মার্চ মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিজয়ের পরও আগের সরকারগুলো এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারেনি। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ২৪ মে ‘বাংলাদেশ অফশোর বিডিং রাউন্ড ২০২৬’-এর আওতায় ২৬টি অফশোর ব্লকে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে।

এসব ব্লকের মধ্যে ১৫টি গভীর সমুদ্র এবং ১১টি অগভীর সমুদ্রের। আগামী নভেম্বর পর্যন্ত দরপত্র প্রক্রিয়া চলবে। একই সঙ্গে নতুন অনশোর বিডিং রাউন্ড চালুর প্রস্তুতিও চলছে বলে জানান তিনি।

দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়াতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড—বাপেক্সকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

প্রতিমন্ত্রী জানান, বাপেক্সের বিদ্যমান পাঁচটি ড্রিলিং রিগের পাশাপাশি আরও দুটি রিগ সংগ্রহ করা হচ্ছে। অনুসন্ধান সম্প্রসারণ, কূপ খনন, সিসমিক জরিপ ও অফশোর বিডিংয়ের মাধ্যমে গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ জোরদার করা হয়েছে।

২০৩১ সালের মধ্যে ১৫০টি কূপের ড্রিলিং ও ওয়ার্কওভার সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। এরই মধ্যে ২৯টি কূপের কাজ শেষ হয়েছে, আরও আটটিতে ড্রিলিং চলছে। অবশিষ্ট কূপগুলোর প্রস্তুতি ও উন্নয়ন কার্যক্রমও এগিয়ে চলছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।

জ্বালানি তেল পরিশোধন সক্ষমতা বাড়াতেও বড় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি বলেন, পাকিস্তান আমলে প্রতিষ্ঠিত দেশের একমাত্র অপরিশোধিত তেল পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারির সক্ষমতা বাড়াতে আগের সরকারগুলো কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি। বর্তমান সরকারের মেয়াদেই এর দ্বিতীয় ইউনিট চালু করা হবে।

দ্বিতীয় ইউনিট চালু হলে ইস্টার্ন রিফাইনারির বার্ষিক পরিশোধন সক্ষমতা ১৫ লাখ টন থেকে বেড়ে ৪৫ লাখ টনে উন্নীত হবে। এ আধুনিকায়ন প্রকল্পে সৌদি আরবের জেদ্দাভিত্তিক ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি) ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থায়ন করবে।

আরও পড়ুন

জ্বালানি সংকটে জনগণের দুর্ভোগে দুঃখ প্রকাশ প্রধানমন্ত্রীর

সেপ্টেম্বরেই বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতির আশা প্রতিমন্ত্রীর

গত ৩ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সরকার ও আইডিবির মধ্যে ‘মডার্নাইজেশন অ্যান্ড এক্সপ্যানশন অব ইস্টার্ন রিফাইনারি ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক অর্থায়ন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে বলেও সংসদে জানান তিনি।

জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী। ছাদ ও ভূমিভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে টেকসই পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সরকারের শুল্কমুক্ত নীতিগত সহায়তা নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বড় পরিবর্তন আনবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত দেশগুলোতেও এর প্রভাব পড়েছে। তবে প্রতিবেশী দেশগুলোতে চোরাচালান কমাতে বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা হয়েছে।

তিনি জানান, গত ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সমন্বিত জ্বালানি মূল্য ব্যবস্থার আওতায় সরকারকে ২৫ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়েছে।

আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আগের সরকারের আমলে নেওয়া আমদানিনির্ভর নীতির পরিবর্তে জ্বালানি খাতে স্বনির্ভরতা অর্জনের লক্ষ্যে বর্তমান সরকার কাজ করছে।

এর আগে আলোচনায় বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বাস্তবসম্মত ও টেকসই নীতি গ্রহণের আহ্বান জানান। সংকট কার্যকরভাবে মোকাবিলায় একটি শক্তিশালী ও কার্যকর জ্বালানি সেল গঠনেরও প্রস্তাব দেন তিনি।

আলোচনায় পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি এবং পাবনা-১ আসনের বিরোধীদলীয় সদস্য নাজিবুর রহমানও অংশ নেন।

জেবি