দেশজুড়ে চলমান তীব্র বিদ্যুৎ সংকট ও লোডশেডিংয়ের মধ্যে সুখবর শুনিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি জানিয়েছেন, তারা আশা করছেন চলতি সেপ্টেম্বর মাসেই বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হবে।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) বিকেলে জাতীয় সংসদের অধিবেশনে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ নুরুল ইসলামের করা এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন। এ সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীরবিক্রমের সভাপতিত্ব করছিলেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ সারাদেশে বিদ্যুতের চরম দুরবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম। জবাবে প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আমরা লুকোচুরি করতে চাই না। মানুষ বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অভাবে কষ্টে আছে। আমি আমার মন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষ থেকে দেশবাসীর কাছে দুঃখ প্রকাশ করছি। তবে আজকের এই পরিস্থিতি একদিনে তৈরি হয়নি। বিগত দেড় দশক ধরে ফ্যাসিস্ট সরকারের ভুল নীতির অনিবার্য পরিণতি আজ এ দেশের মানুষকে ভোগ করতে হচ্ছে।’
বিদ্যুৎ সংকটের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘গত ৯ আগস্ট দেশে বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট, যা গত ৫৫ বছরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। বিগত সরকার গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরতা তৈরি করেছিল। আমাদের গ্যাসভিত্তিক উৎপাদন সক্ষমতা ১২ হাজার মেগাওয়াট, যার জন্য প্রতিদিন ১৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন। কিন্তু দেশীয় উৎপাদন ও এলএনজি আমদানি মিলিয়ে আমরা পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ করতে পারছি না। ফলে বাধ্য হয়েই বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।’
তিনি জানান, কারিগরি ত্রুটির কারণে পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৬১৬ মেগাওয়াটের একটি ইউনিট বন্ধ রয়েছে। মাতারবাড়ীর অপর একটি ইউনিট রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বন্ধ। এছাড়া আদানি গ্রুপের সঙ্গে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ১৬০০ মেগাওয়াট পাওয়ার কথা থাকলেও দিনের বেলা ৯০০ এবং রাতে ১১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। অন্যদিকে, গত ২১ জুলাই একটি এফএসআরইউ (ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল) নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটে, যা মেরামত করে ১৫ আগস্ট পুনরায় চালু করা হয়।
আরও পড়ুন
জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় সমন্বিত উদ্যোগের কথা তুলে ধরলেন প্রধানমন্ত্রী
বাপেক্সকে পঙ্গু করে রাখার ফলেই জ্বালানি সংকট: প্রধানমন্ত্রী
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা বাধ্য হয়ে অত্যন্ত ব্যয়বহুল ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে সর্বোচ্চ উৎপাদন করার চেষ্টা করছি। বিগত সরকার এসব কেন্দ্রের মালিকদের প্রায় ৪৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বকেয়া রেখে গিয়েছিল। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এই সংকট কাটাতে দ্রুত ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে যাতে তারা জ্বালানি আমদানি করে উৎপাদন অব্যাহত রাখতে পারে। আশা করছি সেপ্টেম্বরের মধ্যেই বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতির অনেকটা উন্নতি হবে।’
বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে রাত ৮টার পর দোকানপাট ও বিপণিবিতান বন্ধ রাখার যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে তা যথাযথভাবে পালনের জন্য সংসদ সদস্যসহ সবার প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
প্রতিমন্ত্রী সংসদে ঘোষণা দেন, ‘গতকাল (১ সেপ্টেম্বর) মহামান্য রাষ্ট্রপতির আদেশে একটি প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছে। এখন থেকে কোনো উদ্যোক্তা বা বাসাবাড়ির মালিক ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করে নিজেদের চাহিদা মেটানোর পর উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে বিক্রি করতে পারবেন। সরকার প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা দরে এই বিদ্যুৎ কিনে নেবে।’
সৌরবিদ্যুতের প্যানেল ও সরঞ্জাম আমদানিতেও বিশাল ছাড়ের ঘোষণা দেন অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি জানান, সোলার প্যানেল, ব্যাটারি, ইনভার্টারসহ আনুষঙ্গিক পণ্য আমদানিতে এখন থেকে মাত্র ১ শতাংশ কাস্টমস ডিউটি দিতে হবে। এর বাইরে ১৫ শতাংশ ভ্যাট এবং ২ শতাংশ অগ্রিম আয়কর (এআইটি) সম্পূর্ণ মওকুফ করা হয়েছে। আগামী ছয় মাসের জন্য বাণিজ্যিক আমদানিকারকরাও এই সুবিধা পাবেন।
প্রতিমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের ফলে আগামী তিন বছরের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগ আসবে এবং আগামী গ্রীষ্ম মৌসুমে দেশের মানুষকে আর বিদ্যুতের কষ্টে ভুগতে হবে না।
এমএইচএইচ/জেবি




